”আমার আবার প্রাইজ কী?” বলরাম অবাক হলেন। ”লাস্টের আবার প্রাইজ হয় নাকি?”
”হয়, হয়, চলুন তো!” মনোজ সামন্ত টান দিলেন বিস্মিত বলরামের হাত ধরে।
ক্লাবঘরের সামনে খোলা জায়গায়, দুটো তক্তপোশ দিয়ে মঞ্চ হয়েছে। মাইক্রোফোন আর টেবিল। নিরাভরণ এই অনুষ্ঠানে পুরস্কার দিলেন ক্লাবের প্রেসিডেন্ট। এখানকারই একজন ডাক্তার। কাপ, মেডেল এবং তোয়ালে যারা পেল, তারা সকলেই নিয়মিত সাঁতার কাটে এবং কুড়ির কম বয়সি।
”এবার পুরস্কার দেওয়া হবে প্রতিযোগিতার কনিষ্ঠতম সাঁতারু উমা পালকে। তার হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন প্রতিযোগিতার সব থেকে বয়স্ক সাঁতারু শ্রীযুক্ত বলরাম গড়গড়ি। প্রসঙ্গত জানাই দু’জনের বয়সের পার্থক্য পঞ্চাশ বছরের, এবং দু’জনেই সফলভাবে প্রতিযোগিতা শেষ করেছেন।” ক্লাব—সচিবের ঘোষণা হওয়ামাত্র তুমুল হাততালি আর চিৎকার উঠল। দু’জনকে কাছ থেকে দেখার জন্য মঞ্চের দিকে এগিয়ে এল জনতা। ঠেলাঠেলি শুরু হল।
বলরাম হকচকিয়ে গেলেন এত লোকের আগ্রহ, ঔৎসুক্য দেখে। তাঁকে দেখার জন্য নয়, আসলে ওই পঞ্চাশ বছরের পার্থক্যটাই যে এদের কৌতূহলী করে তুলেছে, সেটা তিনি বুঝতে পারছেন। তিনি নিজেও কিঞ্চিৎ উত্তেজনা বোধ করলেন। মনোজ সামন্ত প্রায় ঠেলতে ঠেলতে বলরামকে মঞ্চের দিকে নিয়ে গেলেন। টাক মাথা, বেঁটে লোকটিকে দেখে বাচ্চচা দর্শকরা আবার হাততালি দিল। বলরামের চেয়ে উমা পাল উচ্চতায় মাত্র আধফুট ছোট।
প্রতিযোগিতায় ছেলেদের ও মেয়েদের মধ্যে পঞ্চম পর্যন্ত যারা স্থান পেয়েছে তাদের একটি করে তোয়ালে দেওয়া হয়েছে। বাড়তি রয়েছে দুটি তোয়ালে। তারই একটি উমার হাতে দিয়ে বলরাম তাকে কোলে তুলে নিলেন। বাচ্চচা মেয়েটি লজ্জায় তোয়ালেটা দিয়ে মুখ ঢাকল।
আবার ঘোষণা হল, ”এবার উমা পাল পুরস্কার তুলে দেবে বলরাম গড়গড়ির হাতে।”
দু’হাত বাড়িয়ে উমার হাত থেকে একটা তিন হাত লম্বা হ্যান্ডলুম তোয়ালে নিলেন বলরাম। ইতিমধ্যে কেউ বলে দিয়েছিল উমাকে, তোয়ালেটা হাতে দিয়েই সে প্রণাম করল বলরামকে। প্রবল হর্ষধ্বনি আর করতালি বলরামের চোখে বাষ্প ঘনিয়ে তুলল।
সভাপতি ডাক্তারবাবু মাইকের সামনে এসে বললেন, ”এবার বলরামবাবু আপনাদের দু—চার কথা বলবেন।”
বলরামের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। বক্তৃতা! ভাষণ! দু—চার কথা মানে? কিন্তু আমি কেন? তিনি অসহায়ভাবে সভাপতির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
হাসতে হাসতে ডাক্তারবাবু বললেন, ”আজ আপনিই তো বলবেন। আমাদের এই চার মাইল সাঁতারে আজ পর্যন্ত আপনার বয়সি কেউ কম্পিট করেনি। আপনি বলবেন না তো কি, যে জীবনে সাঁতার কাটেনি, সেই আমি এখানে বাণী দেব? আমার কি কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই! আপনার যা মনে আসে তাই বলুন।”
সামনে থেকে মনোজ সামন্ত চেঁচিয়ে বলল, ”গড়গড়িদা, ঘাবড়াবেন না। যা বলবেন আমরা শুনব।”
বলরাম মাইক্রোফোনের সামনে এলেন।
”একটা সময় ছিল যখন আমার বয়স তোমাদের মতোই ছিল।” বলরামের মুখ থেকে হঠাৎই বাক্যটি বেরিয়ে এল। যেটুকু কথাবার্তা দর্শকদের মধ্যে হচ্ছিল, বন্ধ হয়ে গেল।
”বাড়ির কাছেই ছিল গঙ্গা, সাঁতার কাটতাম। স্বপ্ন দেখতাম, ইংলিশ চ্যানেল পার হচ্ছি। স্বপ্ন দেখতাম, ওলিম্পিকে গোল্ড মেডেল গলায় পরছি। আমার দেশের জাতীয় সঙ্গীতের সুর বাজছে। তারপর যা হয়!” বলরাম থামলেন। একটু হাসলেন, ”আমি সরকারি অফিসের একটা আপার ডিভিশন ক্লার্ক হলাম।”
”আমার বয়স বাড়তে লাগল। বুড়ো বলতে যা বোঝায় কালক্রমে আমি সেই বয়সে প্রবেশ করলাম। কিন্তু বুড়ো তো দু’ভাবে হয়, শরীরে আর মনে। আমার শরীরের ক্ষয় অবশ্যই হয়েছে, কিন্তু যেভাবেই হোক মনের ক্ষয় আটকাবার কথা আমি ভাবলাম। আমি যেখানে থাকি, সেই বিদ্যানগরে একটি মেয়েকে দেখেছি, সে কী প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে পারে! তাকে দেখেছি, শুধুই মনের জোরে দশ কিলোমিটার রোড রেসে প্রথম হতে।
”আমার মন বলল, বলরাম, তুমিই বা পারবে না কেন? বয়স হলেই কি ছোটদের কাছে হটে যেতে হবে? জবুথবু হয়ে সংসারের, সমাজের এককোণে পড়ে থাকবে? যৌবন চলে গেলেই কি জীবন শেষ হয়ে যাবে?”
বলরাম জানেন না, তাঁর গলা চড়ে গেছে, তাঁর চোখের মণি বড় হয়ে উঠেছে। জীবনে এই প্রথম তাঁর কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয়ে তাঁর কানে ফিরে আসছে। এমন অভিজ্ঞতা আগে কখনও তাঁর হয়নি।
”কবে গঙ্গায় সাঁতার কেটে একটা কাপ জিতেছি, তাই ভাঙিয়ে আজীবন চলে না। বয়সকে কমানো যায় না, ধরেও রাখা যায় না, কিন্তু তাকে দিয়ে অনেক কিছু করিয়ে নেওয়া যায়।”
”আমি অতি সাধারণ মানুষ। বৈজ্ঞানিক নই, শিল্পী নই, শিল্পপতিও নই, কিছুই নই। আমি তা হলে বয়স নিয়ে কী করতে পারি? পারি শুধু একটা কাজই—মন থেকে বয়সকে তুলে নিতে। সেই কাজটাই আজ করলাম। এই কাজ আবার করব, যতদিন পারব করে যাব।”
সেদিন রাতে শেয়ালদায়, রাস্তা থেকে ছ’ টাকা দিয়ে বড় একটা ফুলকপি কিনে বলরাম ট্রেনে উঠলেন। বিমলাকে দুটো মিথ্যা কথা বললেন বাড়ি পৌঁছে।
”পনেরো টাকায় বিক্রি হচ্ছে দেখে তোয়ালেটা শেয়ালদায় কিনে ফেললাম। সস্তা হয়নি?… আর এই কপিটা ধরো, মনোজের ক্ষেতের। তোমার জন্য দিল।”
.
”আমায় ডেকেছেন, জগন্নাথকাকা?”
বসার ঘরে খবরের কাগজ পড়ছিলেন জগন্নাথবাবু। কাগজটা নামিয়ে বললেন, ”আয়, বোস।”
