ক্ষিতীশ কাগজটা মন দিয়ে পড়ে বলল, ”হুঁ, কি জানতে চান?”
”ওই যে লিখেছেন, ‘ট্যালেন্ট ঈশ্বরের দান। সেটা ফুটিয়ে তোলা যায় কিন্তু তার বদলি হিসাবে কোনকিছুই সে জায়গায় বসানো যায় না। যার মধ্যে ট্যালেন্ট আছে, সেটা যদি সে ব্যবহার না করে তাহলে তাকে অপরাধী হিসাবে গণ্য করতে হবে।’ কিন্তু আমার কথা হচ্ছে, আমাদের দেশে বহু ট্যালেন্টওলা লোক আছে, যারা শুধু খাওয়া—পরার ধান্দাতেই হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সব আগে মানুষের দরকার বেঁচে থাকা, এটা তো মানেন?”
ক্ষিতীশ ঘাড় নাড়ল।
”রাশিয়া—টাশিয়ায় বড় বড় খেলোয়াড়দের খাওয়া—পরার চিন্তা করতে হয় না। গভরমেন তাদের গুরুত্ব স্বীকার করে, স্টেটই তাদের সব কিছু দেয়। সেই রকম আমাদের দেশেও গভরমেনকে দেখা উচিত যাতে প্লেয়াররা খাওয়া—পরার চিন্তা থেকে মুক্ত থাকতে পারে। এসব কথা একটু বলা দরকার, বুঝলেন না, পাবলিক এখন লেফটিস্ট ধরনের তো।”
”কিন্তু ভারত বা বাংলা তো কম্যুনিস্ট দেশ নয়, এখানে গণতন্ত্র। এখানে প্লেয়ারকে সব কিছুরই জন্য লড়তে হবে। গণতন্ত্রে এই স্বাধীনতাটা আছে—লড়াইয়ের স্বাধীনতা।”
”আপনি কি সব কিছুরই, মানে খাওয়া—পরার জন্যও জানোয়ারের মতো কামড়াকামড়ি করে বাঁচতে চান?”
”মানুষ হিসেবে নিশ্চয় চাই না, কিন্তু সুইমিং কোচ হিসেবে, হ্যাঁ চাই। আরামে সব জিনিস পাওয়া যায় না, বুঝলেন, আপনার পাবলিককে বলবেন যে, একটা সুইমারকে খেটে, যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে উঠতে হয়। পড়ুন পড়ুন লেখাটা পড়ুন তো।”
ক্ষিতীশ উত্তেজিত হয়ে বারান্দায় পায়চারি শুরু করল। বিষ্টু ধর ভীরুচোখে ক্ষিতীশের দিকে এবং বিশু—খুশির দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে পড়তে লাগল—”বিরাট বিরাট খেলোয়াড়ের গৌরবের ছটায় আলোকিত হয় তার দেশ। যদি প্রশ্ন করি, অসট্রেলিয়ার কথা উঠলে সব আগে কাদের নাম আপনার মনে ভেসে উঠবে? নিশ্চয় ডন ব্র্যাডম্যান, ডন ফ্রেজার,কেন রোজওয়ালের নাম। যদি বলি ব্রাজিলের প্রধানমন্ত্রীর নাম কি? পারবেন কেউ বলতে? কিন্তু পেলের নাম আপনারা সবাই শুনেছেন। ইথিওপিয়া ছোট্ট দেশ, গরীব দেশ, অখ্যাত দেশ। কিন্তু বিকিলা যখন দৌড়ল, দেশটা বিখ্যাত হয়ে গেল।”
বিষ্টু ধর দম নেবার জন্য থামল। ক্ষিতীশ দাঁড়িয়ে পড়ে একমনে শুনছিল। বলল, ”কিন্তু শুধু মেডেল ধোয়া জল খেয়ে আপনার কি আমার চলবে না। মেডেল তুচ্ছ ব্যাপার, কিন্তু একটা দেশ বা জাতির কাছে মেডেলের দাম অনেক, হিরোর দাম অনেক। দেশের ছেলেমেয়েদের কাছে একজন হিরো, সে সাঁতারুই হোক আর সেনাপতিই হোক, আদর্শ স্থাপন করে। তবু ওদের মধ্যে তফাত আছে, বড় সাঁতারু জীবনের ও প্রাণের প্রতীক, সেনাপতি মৃত্যুর ও ধ্বংসের। সাঁতারু অনেক বড় সেনাপতির থেকে। যুদ্ধজয়ী সেনাপতি সমীহ পায়, আবার ঘৃণাও পায়। কিন্তু বিরাট সাঁতারু সারা পৃথিবীকে প্রেরণা দেয়।”
”আপনি খালি সাঁতারু সাঁতারু বলছেন কেন, ফুটবলার ক্রিকেটার এদের নাম করুন। বাঙালিরা যা ভালবাসে মিটিংয়ে তাইতো বলব।”
”যা খুশি বলুন, কিছু যায় আসে না। শুধু বলবেন, যারা আমাদের জন্য প্রাণ নিয়ে আসে, আমরা তাদের অবহেলা করি। ভুলে যাই তাদের খাদ্য দরকার, মাথার উপর ছাদ দরকার, খড়ের চালা যদি হয় তাও। আমরাই বাধ্য করি তাদের উঞ্ছবৃত্তি করতে। আমরাই তাদের শেখাই চালাকি করতে, মিথ্যে বলতে। … এইসব বলার পর আপনার লাইনের কথাবার্তায় চলে আসবেন। খুব কড়া কড়া কথায় গভরমেন্টকে এক হাত নেবেন।”
”তাহলে একটু গুছিয়ে লিখে দিন। আমার যেন কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে মাথার মধ্যে।”
ক্ষিতীশ ভ্রূকুটি করে তাকাল। বিষ্টু ধর তাড়াতাড়ি বলল, ”এজন্য নিশ্চয়ই ফি দোব।”
”ফি চাই না, একটি চাকরি চাই। যে কোনো চাকরি, অন্তত শ’দেড়েক টাকার।”
”চাকরি!” বিষ্টু ধর অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, ”কোথায় পাব?”
”আপনার তো ব্যবসা আছে। আমার এখন নিয়মিত টাকার দরকার। এইভাবে, বক্তৃতা তো সারা জীবন লেখা যাবে না।”
”আচ্ছা আমি দেখব’খন।”
আধঘণ্টার মধ্যেই ক্ষিতীশ লিখে দিল। বিষ্টু ধর চলে যাবার পর রান্না চাপিয়ে দিল। উঠোনের দেয়ালে গাঁথা বড় হুকে রবারের দুটো দড়ির প্রান্ত আংটায় বেঁধে আটকাবার কাজে লেগে পড়ল। রবার দুটোর অপর প্রান্তে দুটো হাতল। এই রবার পুলি টেনে ব্যায়াম করবে কোনি। কাজটা শেষ করে সে ছোট পাশ—বালিশের মতো চটের থলে সের দশেক বালি দিয়ে ভরতে শুরু করল। ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়ামের সময় এই ওজন ঘাড়ে নিয়ে কোনিকে ব্যায়াম করতে হবে।
লীলাবতী বাড়িতে ঢুকে ক্ষিতীশের কাজ দেখে অবাক হয়ে বলল, ”এগুলো আবার যে বার করলে ব্যাপার কি?”
”কোনির জন্য।”
”কে কোনি!”
”একটা মেয়ে। ওকে তৈরী করব, মেয়েটার মধ্যে জিনিস আছে। একেবারে আকাঁড়া মাটি, গড়তে পারলে দারুণ সুইমার হবে। তোমাকে এনে দেখাব। ভীষণ গরীব।”
লীলাবতী ঘরে ঢুকে গেল। ক্ষিতীশ ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল, ”ভীষণ গরীব, খেতে পায় না। ভাবছি এখানেই ওর খাওয়ার ব্যবস্থা করব।”
ঘরের মধ্যে লীলাবতীর শুকনো কঠিনস্বর ভেসে এল, ”ঘরটা নেওয়াই ঠিক করলুম। ওরা রাজী হয়েছে পাঁচ হাজার টাকা সেলামিতে, এখন টেনেটুনে চলতে হবে বাজে খরচ একদম বন্ধ।”
