”একদমই নয়। খুব সিরিয়াস হয়েই বলছি।”
”কেন?”
”তার মানে?”
”কেন এই বয়সে শরীরটাকে মিছিমিছি বেগার খাটাচ্ছেন? সেদিন অফিসে ঘুমোচ্ছিলেন, মনে আছে? আপনি সাঁতার কাটলে কারও কি কোনও উপকার হবে? আপনার কি সেজন্য মাইনে বাড়বে? তা যদি না হয়, তা হলে সাঁতার কেটে লাভ?”
”খাঁটি কথা বলেছ ভাই। এখন তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, সাঁতার ফাঁতার কেটে কোনও লাভ হয় না। তবে কী জানো সামন্ত, মানুষ তো একরকমের হয় না। কেউ কেউ মনে করে, জীবন বলতে যদি বেঁচে থাকা বোঝায়, তা হলে বাঁচার একটা মানে থাকা দরকার। জীবন নানা সময়ে নানা রূপ ধরে। আমি এখন জীবনের যেখানে এসে পৌঁছেছি, সেখানে দেখছি, জীবনটা চেন দিয়ে বাঁধা কুকুরের রূপ ধরেছে। আমি তাই চেনটা ছিঁড়ে ফেলতে চাই।”
মনোজ সামন্ত মন দিয়ে শুনছিলেন। অনেকক্ষণ পর বললেন, ”আপনার নাম আমি দিয়ে দেব।” তারপর হেসে উঠে জুড়ে দিলেন, ”ডুবেটুবে গেলে কিন্তু লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাবে।”
.
বলরাম স্ত্রীকে জানাননি সাঁতার প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছেন। শুধু বলেছিলেন, মনোজ সামন্ত রবিবার অফিসের কয়েকজনকে বাড়িতে খেতে বলেছে, তিনিও তাদের মধ্যে আছেন।
সাঁতার শুরু হবে বেলা তিনটেয়, বৈদ্যপাড়া থেকে। বলরাম প্রথমে এলেন শেয়ালদা স্টেশনে। সেখান থেকে বাসে হাওড়া স্টেশনে এসে গেলেন ব্যান্ডেল লোকাল। বৈদ্যপাড়া স্টেশনে নামলেন বেলা দুটোয়। সাইকেল রিকশায় গঙ্গার ধারে পৌঁছে দেখলেন, অস্থায়ী একটা শামিয়ানা আর পোশাক বদলাবার জন্য ঘেরা জায়গা। একটা টেবিল আর কয়েকটা চেয়ার। জনা—তিরিশ ছেলেমেয়ে আর কিছু ক্লাবকর্তা। এদের সঙ্গে মনোজ তার জন্য অপেক্ষা করছে। ওকে দেখে বলরামের একটা চিন্তা থেকে রেহাই ঘটল। প্রতিযোগী বলে শনাক্ত করার জন্য একটা লোক পাওয়া গেল।
বলরাম একজন প্রতিযোগী শুনে দু—চারজন চোখ কুঁচকে তাকালেন। বলরাম অনুমান করেই ছিলেন, এইরকম দৃষ্টির সামনে তাঁকে পড়তে হবে। তিনি কিছু মনে করলেন না। একজন শুধু তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, ”গঙ্গায় কখনও সাঁতার কেটেছেন?”
”কেটেছি। সাত মাইল কম্পিটিশনের একটা কাপও আছে।” বিনীতভাবে বলরাম জানিয়ে দিলেন।
মনোজ সামন্ত ক্লাবের লোকেদের সঙ্গে বলরামের পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ”এনার্জি আছে বটে গড়গড়িদার! এই সব ইয়ং ছেলেমেয়ের সঙ্গে কম্পিট করতে এই বয়সে জলে নামা, চাট্টিখানি কথা! ওঁকে তো একটা স্পেশাল প্রাইজ দেওয়া উচিত!”
”তা যদি দাও, তা হলে ওকেও দেওয়া উচিত।” এই বলে বলরাম পোশাক বদলাবার জায়গা থেকে এইমাত্র বেরিয়ে আসা ছোট্ট বিনুনি ঝোলানো কস্টিউম পরা একটা সাত—আট বছরের মেয়ের দিকে আঙুল তুললেন। ”ওর সঙ্গে আমার বয়সের ডিফারেন্স অন্তত অর্ধ শতাব্দীর। গঙ্গায় আজ একটা ব্রিজ হবে, পঞ্চাশটা বছর জোড়া লাগবে।”
বলরাম হা হা শব্দে হেসে উঠলেন। তাঁর মনে হচ্ছে এমনভাবে তিনি কলেজে পড়ার দিনগুলোর পর আজই প্রথম হাসলেন। হাসির সঙ্গে যেন শুকনো হয়ে যাওয়া বছরগুলো ঝরে ঝরে যাচ্ছে শরীর থেকে।
”মেয়েটি কি একা জলে নামবে?” বলরাম তারপর কথাটা শুধরে নিয়ে বললেন, ”ওর সঙ্গে সঙ্গে কারও থাকা দরকার।”
”ওর বাবা, দাদা, ওই তো দাঁড়িয়ে….ওরাও নামছে।” মনোজ আঙুল তুলে দেখাল। বছর চল্লিশের একটি লোকের সঙ্গে দশ—বারো বছরের একটি ছেলে। দু’জনে গায়ে সর্ষের তেল ঘষছে। ”ব্যবসা করে, মুদির দোকান আছে। ওর স্ত্রী…মেয়েটার মা, সেও তো এই চার মাইল সাঁতারে নামত বিয়ের আগে পর্যন্ত।”
”আগে কেন, পরেও দু’বার নেমেছে।” মনোজের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুরু চশমা—চোখে লোকটি ভুল শুধরে দিল।
”বুঝলেন গড়গড়িদা, কম্পিটিশনের থেকেও বেশি, এটা একটা উৎসব। ভাটা এই আধঘণ্টা আগে শুরু হয়েছে, টানেই চার মাইল চলে যাবে। এবার আপনি জামা—প্যান্ট ছেড়ে ঝোলাটা আমায় দিন।”
”তুমি নৌকোয় থাকছ তো?”
”আমি বাস কি অটোয় সামন্তপুর চলে যাব…আপনাদের আগেই।”
চৌত্রিশজন সাঁতারু আর চারটে নৌকোয় লাইফ সেভার ও ক্লাবকর্তারা। সাঁতারুদের মাথায় লাল কাপড়ের টুপি। এদের মধ্যে অনেকেই রাজ্য চ্যাম্পিয়ান। বাঁধাঘাটে জলের পারে ভিড় করে দাঁড়িয়ে। প্রতিযোগীরা, কে সামনে থাকবে তাই নিয়ে ঠেলাঠেলি চলছে। নৌকো থেকে হুইসল বাজল। একজন সাদা পতাকা তুলে দাঁড়িয়ে। আবার হুইসল এবং পতাকা ধরা হাতটি নামল। হইহই করে গঙ্গায় ঝাঁপিয়ে পড়ল সাঁতারুরা। সকলের শেষে নামলেন বলরাম।
.
সামন্তপুর কালীতলা ঘাটে সকলের শেষে জল থেকে উঠলেন বলরাম। এবং উঠলেন দু’হাত তুলে বিজয়ীর মতো।
”কই, মনোজ কোথায়?”
মনোজ সামন্ত উত্তেজিতভাবে এগিয়ে এলেন। ”গড়গড়িদা, আপনি যে ফিনিশ করবেন, সত্যি বলছি, ভাবিনি।”
”ভেবেছিলে ডুবে যাব, হাফ ছুটি পাবে? মাথা কাটা যায়নি তো?”
”আজ রাতে গরিবের বাড়ি চাট্টি ডালভাত খেয়ে তবে বাড়ি ফিরবেন। স্কন্ধকাটা হইনি, কম আনন্দ হচ্ছে আমার!”
বলরাম হাসতে গিয়ে একটা কাঁটা ফোটার বেদনা অনুভব করলেন। আর—একদিন তিনি একজনকে অনেকটা এইভাবেই খাওয়ার কথা বলেছিলেন। সে রূঢ়ভাবে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে চলে গেছিল।
”নিশ্চয়ই খাব। পেটপুরে খাব। কাল অফিস যদি না যাই….”
”যেতে হবে না, যেতে হবে না, আমি ম্যানেজ করে দেব। এবার থলেটা নিন। জামাপ্যান্ট পরে তারপর প্রাইজ নেওয়া।”
