”আরে ফেলবেন কেন, লোকের কথার কান দিতে নেই। দশ কিলোমিটার দৌড়েছেন, সেটা তো মিথ্যে নয়।” জয়নুলের পাশে—দাঁড়ানো তরুণটি সহানুভূতি জানিয়ে বলল।
”না, আমার ভাল লাগছে না এইসব জিনিস। আপনি এই রেকর্ডার আর জুতোজোড়া নেবেন?”
”আমি! আপনার জিনিস?” জয়নুল আকাশ থেকে পড়ল।
”হ্যাঁ। নিন না। বদলে আমি বরং সাইকেলটা নেব। হরেদরে দাম একই হবে। তা ছাড়া এখান থেকে সাইকেল নিয়ে বারাসাত যাওয়াটাও তো এক ঝামেলার ব্যাপার।” তুলসী বহু আশা নিয়ে অবশেষে ঝুলি থেকে তার বেড়ালটি বের করল।
”কিন্তু দিদি, সাইকেলটা অলরেডি তো বুক হয়ে গেছে। ওটা আমিই নিচ্ছি।” সহানুভূতি জানানো তরুণটি একগাল হাসল, ”ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট টিভি কিনতে জয়নুল দু’ হাজার টাকা ধার নিয়েছিল, শোধ হতে এখনও আটশো টাকা বাকি। দোকানে জিজ্ঞেস করে দেখি সাইকেলটার দাম কত হবে। মনে তো হয় টাকা শোধ হয়ে যাবে।”
তুলসী মিইয়ে গেল শুনতে শুনতে। মুখে হাসি টেনে বলল, ”দেনার টাকা শোধ তো সবার আগে করতে হয়। আচ্ছা, আমি চলি।”
তিক্ত, ক্লান্ত তুলসী সাইকেলে ফিরছিল। রামপ্রসাদ হস্টেল পার হয়েই দেখল বলরাম। হাত তুলে দাঁড়িয়ে।
”কী ব্যাপার মেসোমশাই! আপনি সেই যে হাওয়া হয়ে গেলেন, তারপর তো আর দেখতেই পেলাম না!”
”পথে সন্দেহ করে আমাকে একজন ধরেছিল পেস সেটারের কাজ করছি বলে। তোমাকে ডিসকোয়ালিফাই করে দিতে পারে, এই ভেবে পরে আর মুখ দেখাতে সাহস পাইনি। প্রায় শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছলুম তো।” বলরাম তৃপ্তির হাসি হাসলেন।
আর জ্বলে উঠল তুলসীর মাথা। আর একজন গর্তে পড়ে গেল বলে প্রথম হতে পারল না…সাইকেলে আগে আগে গিয়ে তার দৌড়ের স্পিড বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ইনি…. কোনও কৃতিত্বই নেই আমার, কিছুই নেই, সবই অন্যের দয়ায় পাওয়া।
”আজ আমার বাড়িতে তোমার নেমতন্ন। চলো, অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি।”
”দরকার নেই আপনার নেমন্তন্নের।”
বোকার মতো চেয়ে—থাকা বলরামকে দাঁড় করিয়ে রেখে তুলসী জোরে জোরে প্যাডেল শুরু করল।
.
তুলসীর ওইরকম রুক্ষ প্রত্যাখ্যানে বলরাম মনে খুবই আঘাত পান। সেদিন বাড়ি ফিরে আসতেই বিমলা বলেন, ”কই, মেয়েটি এল না? রান্নাবান্না সব তো হয়ে গেছে, চাটনিটা শুধু বাকি।”
”দেখতে তো পেলাম না। একটা মেয়ে ফিরছিল, তাকে জিজ্ঞেস করলুম, বলল প্রাইজ তো অনেকক্ষণ দেওয়া হয়ে গেছে। তবু কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। আমার মনে হয়, স্টেশনের ওপারে তুলসীর এক কাকা থাকেন, বোধ হয় তাঁর বাড়িতেই ও গেছে।”
”মিছিমিছি তাড়াহুড়ো করে এত রাঁধলুম। তোমার উচিত ছিল ওকে আগেই বলে রাখা। ঘটে এতটুকু যদি বুদ্ধি থাকে!”
বলরাম সেদিন এইভাবে স্ত্রীর কাছে নিজের মুখরক্ষা করেছিলেন। কিন্তু মনের গভীরে সূক্ষ্ম একটা অপমানের জ্বালা ধরে গেল। নেমন্তন্নটা তো উপলক্ষ, আসলে ওর এই জয়কে মর্যাদা দেওয়ার জন্যই তো তিনি তাড়াতাড়ি মাংস কিনে সঙ্গে দই—রসগোল্লা নিয়ে বাড়ি ফিরে যান। রাস্তায় অপেক্ষা করতে করতে দেখার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন, আচমকা নেমতন্নের কথা শুনে তুলসীর মুখ—চোখের অবস্থাটা কেমন হবে!
রানিসায়রে সকালে সাঁতার কাটতে যাওয়া তিনি বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি চান না তুলসীর সঙ্গে আর দেখা হোক। রাস্তার আলাপ রাস্তাতেই শেষ হোক, এমন এক মনোভাব তাঁর। সাইকেল নিয়ে আর তিনি বেরোন না। অফিস আর বাড়ি ছাড়া আর তাঁর করার কিছু নেই। এমনই এক সময় কাগজে তিনি দেখলেন ছোট্ট একটা খবর, ‘গঙ্গাবক্ষে চার মাইল সাঁতার প্রতিযোগিতা।” সামন্তপুর স্পোর্টিং ক্লাবের উদ্যোগে বৈদ্যপাড়া বাঁধাঘাট থেকে সামন্তপুর কালীতলা ঘাট পর্যন্ত। সাঁতার প্রতিযোগিতায় নাম দেওয়ার শেষ তারিখ ২০ নভেম্বর। অফিসের মনোজ সামন্তর বাড়ি তো সামন্তপুরেই। বলরাম খবরের কাগজ হাতে ভাবতে শুরু করলেন।
পরদিন অফিসে ছুটির কিছু আগে বলরাম মনোজকে প্রশ্ন করলেন নিচুস্বরে, ”আচ্ছা সামন্ত, তোমাদের ওখানে সামন্তপুর স্পোর্টিং ক্লাব বলে একটা ক্লাব আছে না?”
মনোজ সামন্ত ঘাড় বাঁকিয়ে চোখ পিটপিট করে বললেন, ”আপনি জানলেন কী করে?”
”কাগজে দেখলুম গঙ্গায় একটা সাঁতার প্রতিযোগিতা করছে।”
”আমার ঠাকুর্দার বাবা পতিতপাবন সামন্ত ক্লাবটা এসটাব্লিশ করেন সেই বছরেই যে বছরে মোহনবাগান ক্লাব হয়, তার মনে এইটিন এইট্টি—নাইনে। বিদ্যাসাগর মশাইয়ের উদ্বোধন করার কথা ছিল, আসতে পারেননি। দু’মাস পরে অবশ্য এসেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রও এসেছেন।” মনোজ সামন্ত খুবই সাধারণ একটা খবর জানানোর ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে হাই তুললেন। ”বিগ নেম কত আর করব, লাস্ট এসেছিলেন সত্যজিৎ রায়, আমাদের ঠাকুরদালান দেখতে।”
”ক্লাবটা তোমাদের বাড়িতেই কি?”
”ছিল। কিন্তু গণতান্ত্রিক অধিকারের যুগ আসতেই ক্লাবঘরটা বাড়ি থেকে তুলে দিলাম। এখন গঙ্গার ধারে আমাদের দেওয়া জমিতেই নতুন ঘরে ক্লাব।”
”ভাই, আমার একটা উপকার করবে! গঙ্গার যে চার মাইল সাঁতার হবে, তাতে আমার নামটা তুমি এন্ট্রি করে দেবে?” বলরাম লাজুক ফিসফিসে গলায় বললেন। ”তা হলে আমায় আর যেতে হয় না নাম দিতে।”
মনোজ সামন্ত প্রথমে বিশ্বাস করে উঠতে পারেননি। কিছুক্ষণ একদৃষ্টে বলরামের দিকে তাকিয়ে থেকে, গম্ভীরভাবে বললেন, ”ঠাট্টা করছেন?”
