”আমরা কিন্তু মাতৃভাষায় স্টার্ট…।”
”অবশ্যই, অবশ্যই…তুলনা হয় নাকি মাতৃভাষার!” এই বলেই দারোগাবাবু বিশেষ এক পুলিশি কণ্ঠে চিৎকার করে ওঠেন, ”অন ইওর মার্ক……. গেট, সেট…” এবং তারপর ‘ফুট’। সঙ্গে—সঙ্গে লাউড স্পিকারে বেজে উঠল, ”ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল….।”
প্রবল উৎসাহে কিছু মেয়ে ছোটা শুরু করল এমনভাবে, যেন বিদ্যানগর স্টেশনে হুটার শুনেছে, তাদের এখন ট্রেন ধরতে হবে। তুলসী চোখ রেখেছে তিনটি মেয়ের ওপর। ওরা কী করে সেটা তাকে দেখে যেতে হবে।
লেভেল ক্রসিংয়ের ধারে ভিড় জমেছে, তার মধ্যে আছেন বলরামও। মেয়েদের আসতে দেখে ভিড়টা এগিয়ে গেল। হ্রস্বাকৃতি এবং হাতে ধরা সাইকেল এই দুইয়ের কারণে বলরাম সামনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন। দুটি লোকের কাঁধের পাশ দিয়ে কোনওক্রমে মুখটুকু বের করে দেখলেন সাত—আটটি মেয়ে তাড়াহুড়ো করে দৌড়ে গেল। তাদের মধ্যে তুলসী নেই। ওদের দশ—বারো মিটার পেছনে ছ’সাতজন মেয়ের একটি দল। সবার পেছনে একটি জিপ। বলরাম তুলসীকে দেখতে পেলেন। সাদা টুপি, হলুদ গেঞ্জি, কালো শর্টস, নীল কেডস, পায়ে মোজা নেই। চোখের নজর ডানদিকে—বাকি মেয়েদের ওপর।
”গুডলাক তুলসী….গুডলাক।” বলরাম চেঁচিয়ে উঠলেন। তাঁর মনে হল, তুলসী যেন মুখ ফিরিয়ে তাঁকে দেখার চেষ্টা করল।
”পেছনের মেয়েগুলোই ঠিক ছুটছে, সামনের মেয়েগুলো ভুল করছে।” ভিড় ভেঙে যাওয়ার পর স্টেশন রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে এক প্রবীণ বয়স্ক তাঁর পাশের লোককে কথাটা বললেন।
পেছন থেকে সেটা শুনে একজন তরুণ সন্দিগ্ধ গলায় বলল, ”সামনের মেয়েরা ভুল করছে বললেন কেন?”
”দশ কিলোমিটার দৌড়তে হবে, সাতটা প্রায় বাজে, রোদ এবার চড়বড় করবে। দু’দিন হল আবার গরম পড়েছে। শুরুতেই অত জোর দিলে পারবে শেষ করতে? তার ওপর এই জঘন্য ভাঙাচোরা রাস্তা।”
বলরামের কানেও কথাগুলো গেল। লোকটির যুক্তিতে সায় দিয়ে তিনি যোগ করলেন, ”ভাল মাঠে দৌড়তে যে পরিশ্রম হবে, তার ডবল লাগবে এই রাস্তায় দৌড়তে। এগুলো হিসেবের মধ্যে রেখে দৌড়ের স্পিড ঠিক করতে হবে।”
শুনতে শুনতে তরুণটির মুখ বোকার মতো হয়ে গেল। ”আমার বোনকে তো প্রথমেই একটা চার—পাঁচশো মিটারের বড় লিড নিয়ে দৌড়তে বলেছি!”
”ভুল করেছেন।” বলরাম বললেন।
”তা হলে কী হবে? তরুণটি ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে যেন পরামর্শ চাইল। ”বারণ করে দিয়ে আসব?”
কথা না বলে বলরাম সাইকেলে উঠলেন। বাজারটা তাড়াতাড়ি বাড়িতে পৌঁছে দিতে হবে। একটু পরেই তিনি দেখলেন, সেই তরুণটি ঊর্ধ্বশ্বাসে তাঁর পাশ দিয়ে ছুটে গেল।
.
হোতর থেকে ডানদিকে একটা রাস্তা বেরিয়ে গেছে জোড়াশোলে। এটা মাটির রাস্তা। গোরুর গাড়ি আর ভ্যানরিকশার চাকা রাস্তার দুই ধারে নালার মতো গর্ত করে রেখেছে। প্রায়ই রাস্তার দুই পাশ ধসে পড়া। পঞ্চায়েত থেকে রাস্তা মেরামতের চেষ্টায় কয়েক বছর আগে সেসব ভাঙা ইট ফেলা হয়েছিল, সেগুলোর উঁচিয়ে থাকা ছুঁচোলো মাথা যুদ্ধক্ষেত্রে পুঁতে রাখা মাইনের মতো আচরণ না করলেও, পদাতিক গ্রামবাসীর কাছে দুঃস্বপ্ন।
হোতর—জোড়াশোল রাস্তার মোড়ে এখন বহু লোক জমা হয়েছে। তার মধ্যেই সাইকেল নিয়ে রয়েছেন বলরামও। মেয়ে প্রতিযোগীদের চোদ্দোজনই জোড়াশোলের দিকে চলে গেছে। সেখানে ঘণ্টার মোড় ঘুরে তারা প্রত্যাবর্তন করবে। সবাই প্রতীক্ষা করছে সেইজন্যই।
এখানকার বহু মানুষই সাইকেল চড়া রমেন স্যারের মেয়েকে চেনে। তারা আশা করে আছে, তাদের পাশের গ্রাম কুলডাঙার মেয়েটিই প্রথম আসবে। বস্তা মাথায় এক চাষি বলরামকে জিজ্ঞেস করল, ”হ্যাঁ বাবু, এখানে হতিসে কী?”
”দৌড় হচ্ছে, দৌড়। মেয়েরা দৌড়চ্ছে।”
”কতডা দৌড়িবে?”
”দশ কিলোমিটার।”
”সেডা কতটা?”
”তিন কোশ।”
”অ।” বলে চাষি চলে যেতে গিয়েও ফিরে এল। ”দেখি যাই ক্যামন দৌড়ায়।” বলরামের পাশে সে দাঁড়িয়ে গেল।
কে একজন কাঁসর এনেছে। সেটা বাজাতে শুরু করতেই ভিড় থেকে রব উঠল, ”আসছে, আসছে।”
প্রথম আসছে ঠাকুরপাড়া যুব সম্মিলনীর দুটি মেয়ে। তাদের পাশে পাশে পতাকা লাগানো সাইকেল নিয়ে এক পথপ্রদর্শক। ভিড়ের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। ”রমেন স্যারের মেয়ে কই?….সে অনেক পেছনে পড়ে।”
তুলসী তিনজনের পর এবং প্রথমজনের থেকে প্রায় তিনশো মিটার পেছনে। বলরাম তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে লক্ষ করলেন প্রথম দুটি মেয়ের মুখ। ছ’ কিলোমিটার দৌড় হয়েছে। ওদের মুখে শ্রান্তির ছাপ, পদক্ষেপে অবসাদ। বলরামের মনে হল, নিজেদের টানতে টানতে যেন ওরা এগোচ্ছে, একে দৌড় বলে না। অসমান, ভাঙাচোরা রাস্তায় দৌড়ের অভ্যাস না থাকায় এবং বারবার গর্ত আর উঠে—থাকা ইট এড়াবার জন্য সোজা পথে দৌড়ের সুযোগ না পাওয়ায়, ওদের বাড়তি পরিশ্রম করতে হচ্ছে। ছোটার ছন্দও নষ্ট হয়ে গেছে। ওদের চোখে বিরক্তি। যুব সম্মিলনীর আর—একটি মেয়ে ছিল, সে গেল কোথায়? বলরাম তাকে দেখতে পেলেন না।
তৃতীয় মেয়েটি ছুটছে মাথাটি একদিকে হেলিয়ে, আপনমনে কী যেন ভাবতে ভাবতে। চোখ দুটি লাল। হাঁ করে শ্বাস নিচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে দূরপাল্লার দৌড়ে অনভ্যস্ত। বলরামের মনে হল, বেশিক্ষণ টিকবে না।
কিন্তু তুলসীর এ কী হল! খোঁড়াতে খোঁড়াতে আসছে কেন! সঙ্গের সাইকেলের লোকটি জলের বোতল দিল ওর হাতে। তুলসী থেমে গিয়ে বোতলের জল তার দু’পায়ের কেডসের ওপর ঢেলে বোতল ফিরিয়ে দিয়ে আবার ছোটা শুরু করল। লোকটি অপেক্ষা করতে লাগল একসঙ্গে আসা পঞ্চম ও ষষ্ঠ মেয়ে দুটির জন্য।
