ছেলেরা এবং মেয়েরা মোটামুটি কাছাকাছি সময় যাতে দৌড় শেষ করে, সেজন্য তাদের শুরুর সময়টাকে আগে—পিছে করা হয়েছে। ছেলেদের কুড়ি কিলোমিটার দৌড় শুরু হবে ছ’টায়। তার পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর শুরু হবে মেয়েদের। ভোর ছ’টাতেই ক্লাবঘরের সামনে মাঠে লোক জমে গেছে। লাউডস্পিকারে অবিরাম নির্দেশ দেওয়া চলেছে। স্বেচ্ছাসেবকরা ‘পিকু’ লেখা হলুদ গেঞ্জি আর সাদা কাপড়ের টুপি পরে। রানারদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার ও পাশে পাশে থাকার জন্য সাইকেল নিয়ে তারা তৈরি হয়ে রয়েছে। প্রতি সাইকেলের হ্যান্ডেলে ক্লাবের পতাকার রঙের কাপড় কাঠি দিয়ে আঁটা।
প্রতিযোগিতা উদ্বোধন করার জন্য প্রথমে ঠিক হয়েছিল জেলার মন্ত্রী। কিন্তু সুন্দরবন সফরে যাওয়ায় তাঁর বদলে মনোনীত হন স্থানীয় এম এল এ। কিন্তু তিনি গতকাল একটি জন্মদিনের নিমন্ত্রণে আহারের পরিমাণ ঠিক রাখতে না পেরে ঔদরিক গোলমালে পড়ে গেছেন। সকালে খবর পাঠিয়েছেন, তিনি আসছেন না। অবশেষে মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যানকে প্রায় বিছানা থেকেই তুলে আনা হয়েছে। আসার আগে তিনি অনুরোধ করেছিলেন, অন্তত দাঁত মাজার সুযোগটা তাঁকে দেওয়া হোক। কিন্তু দেওয়া হয়নি।
কাঁটায় কাঁটায় ছ’টায় নলের ডগায় ছিপি আঁটা একটা এয়ারগান আকাশের দিকে তুলে চেয়ারম্যান এগিয়ে এলেন। ছত্রিশজন প্রতিযোগী চুনের দাগ দেওয়া লাইনে হলুদ গেঞ্জি আর সাদা টুপি পরে ঠেলাঠেলি শুরু করল। তাদের অর্ধেকেরই খালি পা। বাকিদের পায়ে কেডস।
”কী বলতে হবে যেন বললে?” চেয়ারম্যান তার পাশে দাঁড়ানো ক্লাব সচিবকে জিজ্ঞেস করলেন।
”আমরা স্যার, বাংলা ভাষাকে মাতৃদুগ্ধ গণ্য করি। তাই আপনি বাংলাতেই বলুন—’নিজের জায়গায় দাঁড়াও’…’তৈরি হও’…এই বলার পর ফায়ার করবেন।”
”গুড, ভেরি গুড। বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে, খেলার মধ্যেও। কিন্তু সকলের আগে একটা স্বাগত বা উদ্বোধনী ভাষণ দেওয়া উচিত নয় কি?”
”স্যার। এখনও আপনার দাঁতমাজা হয়নি!”
”তা বটে। আচ্ছা, প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশনের সময় আমাকে ডেকো।”
চেয়ারম্যান এয়ারগান তুললেন, সচিব যা বলতে বলেছিলেন বললেন, ট্রিগার টিপলেন, কিন্তু ছিপিটা বেরোল না। দ্বিতীয়বার টিপলেন, এবং ‘ফুট’ করল।
তাই যথেষ্ট। হইহই করে প্রতিযোগীরা ছোটা শুরু করে দিল আর সঙ্গে সঙ্গে লাউডস্পিকারে বেজে উঠল রেকর্ড : ”চল চল চল। ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল, নিম্নে উতলা ধরণীতল, অরুণ প্রাতের তরুণ দল, চল, চল, চল।”
বলরাম স্টেশনের লেভেল ক্রসিংয়ের পাশে সাইকেলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে গানটা শুনতে শুনতে পায়ে তাল দিচ্ছিলেন। গানটা এখন তাঁর সত্যিই ভাল লাগছে। তিনি অপেক্ষা করছেন মেয়েদের দৌড় শুরু হওয়ার জন্য। লেভেল ক্রসিং খোলা, এখন কোনও ট্রেন আসছে না, বলরামের সামনে দিয়ে ছত্রিশজন দৌড়ে চলে গেল। তাদের পেছনে একটি জিপ। তাতে রয়েছে প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম নিয়ে একজন ডাক্তার। স্টেশান রোড এখনও জমে ওঠেনি ভিড়ে। তবে বাড়ির বারান্দায়, জানলায়, ছাদে লোক।
মেয়েদের দৌড় শুরুর দেরি আছে। বলরাম ঠিক করলেন, এই ফাঁকে বাজারটা সেরে নেবেন। থলি নিয়েই বেরিয়েছেন। তাঁর হাঁটার মতো বাজার করাটাও দ্রুত হয়ে থাকে। এখন হাঁটার বেগ সম্পর্কে সচেতন হওয়ায় তিনি মন্থর হয়েছেন। কিন্তু বাজার করার জন্য সময় তিনি বাড়াননি। ঠিক পনেরো মিনিটে কাজ সেরে, একটা খবরের কাগজ কিনে আবার লেভেল ক্রসিংয়ে ফিরে এসে সেটা পড়তে শুরু করলেন।
তুলসীকে বলা হয়েছিল, দৌড় শুরুর একঘণ্টা আগে হাজির হতে। পৌনে ছ’টায় সাইকেল চালিয়ে এসে পৌঁছে, সে ক্লাবঘরে একটা বেঞ্চে চুপচাপ বসে পড়ে। একে একে পুরুষ ও মেয়ে প্রতিযোগীরা আসতে থাকে।
তার চোখ ছিল মেয়েদের ওপর। অধিকাংশই তারই বয়সি, স্থানীয় মেয়েই সংখ্যায় বেশি। তবে তিনটি অচেনাকে তার মনে হল ঠাকুরপাড়া যুব সম্মিলনীর। ভাল স্বাস্থ্য, পায়ের পেশি সবল। ওদের একই আকাশি রঙের শর্টস, লাল ও নীল পাড় দেওয়া একই মোজা ও কেডস।
ওরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে, হাসাহাসি করছে। এক সময় ওরা নানারকম ব্যায়াম শুরু করল। অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে তুলসীও সমীহ ও কৌতূহলভরে তাই দেখতে দেখতে কিছুটা দমে গেল।
এরা রীতিমতো দু’বেলা ট্রেনিং করে। এরা অ্যাথলিট। কীভাবে পা ফেলে দৌড়তে হয়, সেটা একটা শেখার ব্যাপার। সে শেখেনি। দৌড়ের আগে শরীর গরম করা যে দরকার, এটাও সে জানত না। একবাস সে ভাবল, ওদের মতো শরীরটাকে ঝাঁকিয়ে, লাফিয়ে, দুলিয়ে, বাঁকিয়ে নেবে নাকি। কিন্তু অদ্ভুত একটা লজ্জাবোধ তাকে বাধা দিল। ওরা তা হলে নিশ্চয়ই মুখ টিপে হাসবে। তবে চার মাইল সাইকেল চালিয়ে আসার পর এখন তার শরীরে চনমনে একটা সজীবতা পা থেকে মাথা পর্যন্ত ওঠানামা করছে।
ছ’টা চল্লিশে মেয়েদের ডাকা হল স্টার্টিং লাইনে আসার জন্য। নাম দেওয়া আঠারোজনের মধ্যে চারজন অনুপস্থিত। মেয়েদের দৌড়ের উদ্বোধক স্থানীয় থানার অফিসার ইনচার্জ। ইনি বক্তৃতা দেওয়ার বিরোধী এবং এয়ারগান হাতে নিয়ে ক্লাব সচিবকে জানিয়ে দিলেন, ”জানি মশাই জানি, স্টার্ট দেওয়ার জন্য কী বলতে হবে।”
