বলরাম লাফিয়ে সাইকেলে উঠলেন। তুলসী হোতরের মোড় থেকে বাঁ দিকে বেঁকে মাজাভাঙার রাস্তা ধরেছে। এই রাস্তাটায় কোনও এক সময় পিচ ও পাথরকুচি ঢালা হয়েছিল তার কিছু কিছু চিহ্ন এখনও ছড়ানো আছে। এই রাস্তাটা তুলসী ও বলরাম দু’জনেই ভালমতো চেনে।
”কী হল পায়ে?” সাইকেলটা তুলসীর পাশে এনে চালাতে চালাতে উদ্বিগ্ন স্বরে বলরাম জিজ্ঞেস করলেন।
”কেডসটা বাবুর।” ছুটতে ছুটতে এককথায় তুলসী জানিয়ে দিল তার সমস্যাটা।
”খুলে ফেলো। এখন তো রাস্তা একটু ভাল।”
”ঠোক্কর লেগে বুড়ো আঙুলে যন্ত্রণা….বোধ হয় নখটা উঠে গেছে…ভীষণ লাগছে।” তুলসীর মুখ কুঁকড়ে গেল কথা বলার সঙ্গে।
”দাঁড়াও।” ধমকে উঠলেন বলরাম। ”খোলো জুতো।”
তুলসী থেমে গলে। নিচু হয়ে জুতো দুটো খুলতেই বলরাম তা হাতে তুলে নিয়ে বললেন, ”ছোটো।” তিনি তুলসীর বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলের নখটায় লাল ছোপ দেখতে পেয়েছেন।
পেছনের মেয়েরা একই দূরত্বে পেছনে রয়েছে। ওদের পক্ষে আর সম্ভব নয় ব্যবধানটা ঘোচানো। তুলসীর সামনের মেয়েটি দাঁড়িয়ে পড়ল কোমরে হাত রেখে। পেছনের জিপ এসে ওকে তুলে নিয়ে যাবে। মেয়েটি ম্লান হাসল, যখন তুলসী তার সামনে দিয়ে দৌড়ে চলে গেল। প্রথমের দুটি মেয়ে জোড়—বেঁধে এতক্ষণ দৌড়ে এসেছে এবার তাদের একজনকে বলরাম দেখলেন সাত—আট মিটার পিছিয়ে পড়েছে।
মাজাভাঙার তেঁতুলতলায় পৌঁছে বলরামের মনে হল, তুলসীকে যদি এই দৌড় জিততে হয়, তা হলে এখনই ওকে গতি বাড়াতে হবে, নইলে ব্যবধান ঘোচাবার জন্য সময় আর পাবে না।
”তুলসী?”
বলরাম ডাকলেন। তুলসী একবার তাকাল তাঁর দিকে।
”সামনের দুজনকে দেখা যাচ্ছে না, অনেক এগিয়ে গেছে। স্পিড বাড়াও।
”আঙুলে লাগছে মেসোমশাই।”
তুলসীর দৌড়ের গতি বাড়ল না। রাস্তার দু’ধারে দর্শকদের সংখ্যা এবার ক্রমশ বাড়ছে। যতই বিদ্যানগরের দিকে এগোবে, সংখ্যাটা ততই বাড়বে। দর্শকদের অনেকেই তুলসীকে সাইকেলে এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতে দেখেছে। এখন তাকে দৌড়তে দেখে তারা অবাক হয়ে যাচ্ছে।
”লাগুক আঙুলে, তুমি শুধু আমাকে তাড়া করো।”
এই বলে বলরাম সাইকেলটা তুলসীর সামনে এনে চালাতে শুরু করলেন। তুলসী দৌড়ের জোর একটু বাড়াল। বলরাম পিছু ফিরে দেখলেন একবার, তারপর আর একটু জোরে সাইকেলে প্যাডেল করলেন। তুলসীও আর একটু গতি বৃদ্ধি করল।
”এই, এই মশাই, এটা কী হচ্ছে?” পতাকা লাগানো সাইকেল নিয়ে হলুদ গেঞ্জি পরা একজন বলরামের পাশে চলে এল। ”আপনি ওকে হেল্প করছেন, পেস সেটারের কাজ করছেন, এটা বে—আইনি জানেন?”
”আরে মশাই, বয়ে গেছে, আমার পেস সেটারের কাজ করতে।” সাইকেলের গতি একটুও না কমিয়ে রাগত স্বরে বলরাম বললেন। ”আমি এখন স্টেশনে যাচ্ছি ট্রেন ধরতে। দেখলুম মেয়েটা খোঁড়াচ্ছে, আঙুল দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। তাই বললুম, ”খুকি একটু ফার্স্ট এড দিয়ে নাও, নইলে সেপটিক হয়ে যাবে।” মেয়েটিকে আপনারা একটু দেখুন। ধনুষ্টঙ্কার হয়ে মরে গেলে আপনাদেরই তো দুর্নাম হবে।”
”ফার্স্ট এড বক্সটা জিপে আছে। আচ্ছা, আমি দেখছি।”
পতাকাধারী সাইকেলটা পেছন দিকে ঘুরে জিপের খোঁজে চলে গেল। লোকটি যেন ঘাবড়ে গেল ধুনষ্টঙ্কারে মরে যাওয়ার কথা শুনে। বলরাম হাসলেন এবং হাত নেড়ে তুলসীকে গতি আরও বাড়াতে ইশারা করলেন।
সামনের দুটি মেয়ের একজন, যে পিছিয়ে পড়ছিল তুলসী তাকে পার হয়ে গেল বিদ্যানগরে ঢোকার মুখেই। তাকে পাশ দিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখে মেয়েটি উৎকণ্ঠিত মুখে গতি বাড়াবার চেষ্টা করল। কিন্তু তুলসী এখন ঊর্ধ্বশ্বাসে তাড়া করে যাচ্ছে বলরামের সাইকেলকে। মেয়েটি হাল ছেড়ে দিল। এবার সে প্রথমজনকে দেখতে পাচ্ছে। রাস্তা এখন আঁকাবাঁকা, প্রথম মেয়েটিকে কখনও দেখা যাচ্ছে, আবার কখনও বাঁকের মুখে আড়ালে চলে যাচ্ছে। দু’ধারের ভিড় নেমে এসে রাস্তাটাকে সরু করে দিয়েছে।
বলরাম নির্বিকার মুখে সাইকেলের গতি একটু একটু করে বাড়িয়ে যাচ্ছেন। রামপ্রসাদ হস্টেলের বারান্দায় সার সার মুখ। দেখে বলরামের মনে ফুর্তি জাগল। তিনি গুনগুন গাইলেন, ”মাথার ঊর্ধ্বে আছে মাদল, নিম্নে উতলা পদযুগল… পদযুগল…পদযুগল।” দু’ পায়ের চাপে বনবন প্যাডেল ঘুরছে।
প্রথম মেয়েটি বারবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছে। তার চোখে স্পষ্ট ভীতি। খালি পায়ের, কালো শর্টস পরা মেয়েটা তার কুড়ি মিটারের মধ্যে এসে পড়েছে। নাছোড়বান্দা ছিনে জোঁকের মতো লেগে আছে তার সঙ্গে।
”সরে যান, সরে যান, রাস্তা পরিষ্কার রাখুন…. মেয়েদের দশ কিলোমিটার দৌড়ের প্রতিযোগীরা সমাপ্তি—সীমানার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আপনারা পিছিয়ে যান।” দুই সাইকেল আরোহী চিৎকার করে হাত নাড়তে নাড়তে পেছন থেকে এসে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। রাস্তায় নেমে আসা ভিড় তাতে একটুও সরল না।
”জায়গা করে দিন, দৌড়োবার জায়গা রেখে আপনারা পিছিয়ে যান।” বলরামও হঠাৎ আগের দুই সাইকেল আরোহীর ভঙ্গিতে হাত নেড়ে চেঁচাতে শুরু করলেন। তাঁর একটু আগেই যাচ্ছে প্রথম মেয়েটি এবং পিছনে তুলসী। দু’ধার থেকে জনতার উৎসাহধ্বনি আর হাততালিতে বলরামের চিৎকার ডুবে গেল।
”পথ থেকে সরে যান, সরে যান।” বলতে বলতে বলরাম প্রথম মেয়েটির পাশে চলে এলেন। পেছনে তাকিয়ে দেখলেন তুলসী দাঁতে দাঁত চেপে তাঁর সাইকেলের পেছনের চাকার দিকে তাকিয়ে দৌড়চ্ছে। একবার সে মুখ তুলল। তখন বলরাম তীক্ষ্নস্বরে বলে উঠলেন, ”এবার এগোও।” বলেই তিনি রাস্তার ধারে সরে গিয়ে সাইকেল থেকে নেমে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে গেলেন।
