বলরাম মুগ্ধ হলেন। গা জুড়োনো বাতাস আর জলের সোঁদা গন্ধ তাঁর ফুসফুসকে যেন হাতছানি দিয়ে বলল, ”এই হচ্ছে নির্মল তাজা অক্সিজেন টেনে নেওয়ার সময়। ফুসফুস তুমি কাজে নামো, সারা শরীরের কোষে কোষে ছড়িয়ে দাও বিশুদ্ধ বাতাস। মাথার ক্লান্তি, দেহের ক্লান্তি সব মুছে ফেলে দেওয়ার এই তো সুযোগ!
সাইকেলটা ঘাসের ওপর শুইয়ে, বলরাম জুতো এবং জামা খুলে ফেললেন। বাবু অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে। ট্রাউজার্স খুলে জাঙ্গিয়া—পরা বলরাম ছুটে গিয়ে দু—হাত তুলে জলে ঝাঁপালেন।
”আহহ।” একবার তাঁর মুখ থেকে শব্দটা বেরোল। কত বছর পর আবার জলের সঙ্গে তাঁর নতুন করে আলাপ হচ্ছে। তিনি ধীরে ধীরে সাঁতার কেটে রানিসায়রের পাড় থেকে প্রায় চারশো মিটার ভেতরে গিয়ে ফিরে এলেন। বারবার ডুব দিলেন, জল ছিটোলেন, মড়ার মতো ভাসলেন এবং ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’ বলে চিৎকার করলেন।
প্রায় আধঘণ্টা জলে থেকে মুখে হাসি নিয়ে বলরাম রানিসায়র থেকে উঠলেন। বাবু বলল, ”গামছা আনেননি? গা মুছবেন কী করে? দাঁড়ান, আমি ছুট্টে বাড়ি থেকে নিয়ে আসি।”
”আরে না, না, না। গায়ের জল এখনিই বাতাসে শুকিয়ে যাবে। আজ প্রথম দিন তো, কতটা সাঁতরালাম বলো তো?”
বাবু সায়রের দিকে তাকিয়ে চোখ কুঁচকে বলল, ”যাতায়াতে আধ মাইল হবে। দিদি এর থেকেও বেশি যায়।”
”তা তো যাবেই, ওর অভ্যেস আছে। আর আমি তো বলতে গেলে নতুন জলে নামলাম।”
”দিদি, আপনার থেকেও জোরে সাঁতরায়।”
”তা তো সাঁতরাবেই, আমার থেকে বয়স অনেক কম।”
ভিজে জাঙ্গিয়ার উপর ট্রাউজারটা পরে, জুতো পায়ে গলিয়ে বলরাম সাইকেলটা তুলে বললেন, ”চলো, আজ এই পর্যন্ত।”
”জামাটা পরুন!”
”নাহ। সকালের এই নরম রোদে আলট্রা ভায়োলেট আছে। চামড়ায় লাগানো দরকার।”
বাড়ির কাছাকাছি এসে বাবু বলল, ”দিদি, একটু পরেই তো আসবে, আপনি বসবেন আমাদের বাড়িতে?”
বলরাম মাথা নাড়লেন। ”বাজার যেতে হবে, রান্না হবে, খেয়েদেয়ে অফিস যেতে হবে। দিদিকে বোলো, আমি কাল আসব।” একটু ভেবে যোগ করলেন, ”রোজই আসব।”
বলরাম যখন তুলসীদের বাড়ি থেকে সাইকেলে উঠলেন তখন তুলসী রেলওয়ে ট্র্যাকের মাঝের স্লিপারের ওপর দিয়ে ছুটছে। হাতঘড়ি দেখে সে ছোটার বেগ বাড়াল। দশ কিলোমিটার দূরত্বের মাপটা পাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে সে জানে পরের রেল স্টেশন ঠাকুরপাড়ার দূরত্ব বিদ্যানগর থেকে ছয় কিলোমিটার। যাতায়াতে বারো কিলোমিটার। এটাকেই সে মাপ ধরে নিয়ে আপ লাইনে এক নম্বর ট্র্যাকের স্লিপারের ওপর দিয়ে দৌড়েছে।
ছোটার মধ্যে দুটি আপ ট্রেনের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল। পেছন ফিরে তাকিয়ে কোনও ট্রেন আসছে কি না দেখে নিয়ে সে দু—নম্বর ট্র্যাকে সরে যায়। স্লিপারগুলো কংক্রিটের এবং তাদের মধ্যেকার ব্যবধান প্রায় সমান মাপের নয়, ফলে তার অসুবিধে হচ্ছিল দৌড়ের ছন্দ রাখতে। কিন্তু এটাকে গ্রাহ্যের মধ্যে আনেনি। সে জানে যে—রাস্তা দিয়ে তাকে দৌড়তে হবে, সেটা এর চেয়েও খারাপ।
বিদ্যানগর—ঠাকুরপাড়া প্ল্যাটফর্ম থেকে প্ল্যাটফর্ম সে যাতায়াত করল, ঘড়ি ধরে পঁয়ষট্টি মিনিটে। শেষের দিকে কষ্ট হচ্ছিল। ইচ্ছে করছিল দাঁড়িয়ে পড়তে। কোমর, ঊরু ভারী হয়ে পা যেন আর উঠতে চাইছিল না। তবে সে জানে, প্রথম কয়েকটা দিন এইরকমই হবে, তারপর ঠিক হয়ে যাবে।
.
বলরাম বাড়ি পৌঁছতেই বিমলা জানতে চাইলেন, ”এই সাত সকালে খালি গায়ে কোথায় বেরিয়েছিলে?”
”সাঁতার কাটতে।”
”সাঁতার! সাইকেলে চেপে?”
”সাইকেলে চেপে সাঁতার কাটা যায় না। সাইকেলে চেপে জলের ধারে যাওয়া যায়, আর সেইজন্যেই এটা কিনেছি। চার মাইল দূরে কুলডাঙায় রানিসায়র, সেখানে গিয়ে সাঁতার কেটে এলাম। দাও, থলে দাও, বাজার যাব। আর বলে রাখছি এবার থেকে রোজ ভোরবেলায় যাব। আমার দারুণ ভাল লাগছে নিজেকে।”
বিমলা হতবাক! তিনি ঠিক করে রেখেছিলেন, প্রচণ্ড রাগে জ্বলে উঠবেন।
বলরাম যখন অফিসে পৌঁছলেন, তুলসী তখন ঘরের মেঝেয় চিত হয়ে শুয়ে। বাড়ি ফিরেই সে শুনেছে, বলরাম এসে রানিসায়রে সাঁতার কেটে গেছেন। সে অবাক হয়েছে রেসিং সাইকেলে চড়ে বলরামের আসার কথা শুনে। ”মেসোমশাইয়ের সাইকেল আছে এটা তো জানতাম না!” তুলসীর দুটো পা মালিশ করে দিতে দিতে মা বললেন, ”প্রথম দিনেই কি এত পরিশ্রম করতে হয়…অভ্যাস নেই, ব্যথা তো করবেই। এখন চান করে দুটো ভাত খেয়ে নে, তারপর ঘুমো।”
.
যা কখনওই হয় না, আজ বলরামের তাই হল। অফিসে কাজ করতে করতে তিনি ঘুমে ঢুলতে শুরু করলেন।
”ও গড়গড়িদা, আজ হল কী আপনার, ঘুমোচ্ছেন যে?” মনোজ সামন্ত সত্যিই অবাক!
চমকে সিধে হয়ে বসে বলরাম বোকার মতো হাসলেন। ”বহু বছর পর আজ খুব সাঁতার কেটেছি।”
”সাঁতার? এই বয়সে? ডুবে যাবেন মশাই!”
”তা হলে তো হাফ ছুটি পাবেন।”
”তা পাব। কিন্তু ব্যাপারটা কী, ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ানশিপে নামবেন টামবেন নাকি?”
বলরাম গম্ভীর মুখে বললেন, ”হ্যাঁ।”
.
সূর্য সঙ্ঘের প্রতিযোগিতার দিন সকাল ছ’টার আগে সাইকেলে বেরিয়ে পড়লেন বলরাম। সঙ্ঘের সামনে থেকে শুরু হয়ে, পুরুষ ও মেয়েদের প্রতিযোগিতা শেষ হবে ওখানেই। তার মধ্যে বিদ্যানগর লেভেল ক্রসিং পেরিয়ে মেয়ে প্রতিযোগীরা ছুটবে মাজাভাঙা, হোতর পার হয়ে ডানদিকে বেঁকে জোড়াশোল। সেখান থেকে আবার ফিরে আসবে আগের রাস্তা ধরে। অতঃপর বিদ্যানগর লেভেল ক্রসিং পেরিয়ে এসে প্রথম হওয়া মেয়েটি সূর্য সঙ্ঘের ক্লাবঘরের সামনে সুতো ছিঁড়বে। ছেলেদের দৌড়ের দূরত্ব যেহেতু দীর্ঘ, তাই তাদের পথ জোড়াশোল থেকে আরও প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে সখিবাড়ি পর্যন্ত গিয়ে তারপর তারা ফিরে আসবে।
