পান্নালাল চলে গেল। বলরাম সাইকেলটাকে হাঁটিয়ে রেল লাইনগুলো পেরিয়ে স্টেশন রোড ধরে এগোলেন। তাঁর একটু আগেই তুলসী কুলডাঙা রওনা হয়ে গেছে সাইকেলে।
বাড়িতে পৌঁছে বলরাম সাইকেলটা দরজার বাইরে রেখে চেঁচিয়ে বিমলাকে ডাকলেন, ”দেখে যাও, কী একটা জিনিস কিনে এনেছি। দেখে চমকে যাবে।”
ব্যস্ত হয়ে বিমলা রান্নাঘর থেকে ছুটে এলেন এবং না চমকালেও, অবাক হলেন। ”ওমমা, এটা আবার কী!”
”রেসিং সাইকেল।”
”বলাই আবার রেসে নামবে নাকি পড়াশুনো ফেলে? না না। এখন ওকে এটা দিতে হবে না।”
”বলাইকে দেব কেন? আমি তো নিজের জন্য কিনেছি। খুব সস্তায় পেয়ে গেলাম।”
”তুমি চালাবে সাইকেল!” বিমলা হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইলেন।
”হ্যাঁ চালাব, দেখবে?”
বলরাম হ্যান্ডেল দু—হাতে ধরে ডান পা তুলে লাফ দিলেন চড়ার জন্য। যতদূর তোলা দরকার, পা ততটা উঠল না, ফলে সাইকেল নিয়ে তিনি হুমড়ি খেয়ে পড়লেন।
”কাণ্ড দেখেছ!” বিরক্ত হয়ে বিমলা এগিয়ে এসে স্বামীকে টেনে তুললেন এবং বলরাম তুললেন সাইকেল। স্বামীর হাত থেকে প্রায় ছোঁ মেরে সাইকেলটা কেড়ে নিয়ে বিমলা আর কথা না বলে সেটাকে হিঁচড়ে টানতে টানতে বাড়িতে ঢুকলেন।
কলঘরের মধ্যে সাইকেলটা দেয়ালে ঠেসান দিয়ে রেখে বিমলা জানিয়ে দিলেন, ”কাল চেন আর তালা কিনে এনে এটাকে বেঁধে রেখে দেব, এই বয়সে হাড়গোড় ভাঙলে আর জোড়া লাগবে না।”
”এই বয়স মানে?” বলরাম যৎপরোনাস্তি ক্ষোভ প্রকাশের চেষ্টা করলেন। ”তুমি কি আমায় বুড়ো বলছ?”
”হ্যাঁ বলছি। বয়স তো পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে কবে!”
”তা হলেই কি লোকে বুড়ো হয়ে যায়? বার্ধক্য কি শুধু বয়স দিয়ে ঠিক হয়?” বলরামকে অবাক দেখাল।
”তবে না তো কী।”
রাত্রে ঘুম এল না বলরামের। ভোরের দিকে বিমলা যখন কাঁথা জড়িয়ে গাঢ় ঘুমে, তখন তিনি নিঃসাড়ে বিছানা থেকে উঠলেন। ট্রাউজার্স, বুশশার্ট আর জুতো পরে, কলঘর থেকে সাইকেলটা নিয়ে সদর দরজা খুলে বেরোলেন।
দরজার বাইরে রক। তার কিনারে সাইকেল রেখে, যেভাবে সেদিন তুলসীকে সাইকেলে উঠতে দেখেছিলেন, সেই ভাবে রক থেকে সোজা সিটে বসলেন। প্যাডেলটা উলটো দিকে ঘুরিয়ে পরীক্ষা করলেন পা কতটা পর্যন্ত যায়। মোটামুটি পৌঁছচ্ছে। এবার তিনি প্যাডেলে চাপ দিয়ে এগোতে গিয়েই পড়ে গেলেন। কাছেই একটা কুকুর ডেকে উঠল। বলরাম সিঁটিয়ে গিয়ে রকে বসে পড়লেন। এখনও অন্ধকার কাটেনি। কুকুরের ডাকে লোকজন জেগে উঠে তাঁকে চোর বলে যদি ধরে!
মিনিট পনেরো পরে আবার তিনি চেষ্টা শুরু করলেন এবং চতুর্থবারে সফল হলেন, অর্থাৎ পড়লেন না। কিশোর বয়সে প্রথম শিখে সাইকেল চালানোর আনন্দের মতো প্রচণ্ড খুশিতে ভরে গিয়ে তারপর সাইকেল চালিয়ে দিলেন স্টেশনের দিকে।
ফাঁকা রাস্তা। দু—পাশের দোকানগুলি বন্ধ। বহু দোকানের সামনে খাটিয়ায় বা মাটিতে লোকে ঘুমোচ্ছে। লেভেল ক্রশিং পর্যন্ত পৌঁছে তিনি সাইকেল ঘোরালেন। ব্যায়ামের জন্য সাঁতার কাটতে হলে কাটা দরকার ভোরবেলাতেই, আর সেটা রানিসায়রেই। রানিসায়রটা কেমন, সেটা এখন একবার দেখা দরকার। বলরাম কুলডাঙার উদ্দেশে রওনা হলেন। সর্বাগ্রে তাঁকে রমেন স্যারের বাড়িটা খুঁজে বের করে তুলসীকে সঙ্গে নিতে হবে।
বলরাম কোনওদিন এইদিকে আসেননি। তুলসীকে সাইকেল চালিয়ে যেতে দেখেছেন যে রাস্তা দিয়ে, তিনি সেটা ধরেই চললেন। ভোর হতে শুরু করেছে। সূর্য দেখা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু আলোর আভায় রাতের চিহ্নটুকু আকাশ থেকে মুছে গেছে। লোক চলাচল শুরু হয়েছে। তাঁর বাড়ির এত কাছে এমন ধানক্ষেত আর কার্তিক মাসের পাকা ধান তিনি দেখতে পাবেন, স্বপ্নেও কখনও ভাবতে পারেননি। পায়েসের মতো একটা গন্ধ মাটি থেকে উঠে আসছে। তাঁর মনে হচ্ছে, আজন্ম কলকাতায় আর বিদ্যানগরের মতো শহরতলিতে বাস করে, তিনি এখনও জানেনই না সেই কথাগুলোর মানে—’বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল…’ বলরাম বেসুরো হেঁড়ে গলায় গানটা গাইতে গাইতে জোরে প্যাডেল শুরু করলেন।
শুধু দুটি লোককে জিজ্ঞেস করেই বলরাম পৌঁছে গেলেন তুলসীদের বাড়ি।
”তুলসী আছ নাকি, তুলসী?” বলরাম ডাকলেন বাঁশের বেড়ার বাইরে থেকে। বাবু বেরিয়ে এল। তার পেছনে ওর মা।
”তুলসী আছে নাকি?” মাকে উদ্দেশ করে বলরাম জিজ্ঞেস করলেন, অবশ্য আগে একটা নমস্কার করে নিয়েছেন।
”তুলসী তো ভোরেই বেরিয়েছে, ছোটার জন্য। ঘণ্টা দেড়েক পর ফিরবে।” তুলসীর মা প্রতিনমস্কার করে বললেন।
”না, না, দিদি তার আগেই ফিরবে।” বাবু শুধরে দিল তার মাকে।
”ওকে কি কিছু বলতে হবে?” মা জিজ্ঞেস করলেন।
”বলবেন মেসোমশাই এসেছিল। আমার নাম বলরাম গড়গড়ি। বিদ্যানগরে থাকি। স্টেশনেই ওর সঙ্গে আলাপ হয়েছে। ওকে বলেছিলাম সকালে রানিসায়রে আমি সাঁতার কাটব, সেইজন্যই এসেছি। সায়রটা তো আমি চিনি না।”
”তুলসী না থাক, বাবু তো আছে। বাবু তুই ওনাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে দে না।”
মার কথায় বাবু বেরিয়ে পড়ল। মিনিট সাতেক গ্রামের ভেতরের পথ দিয়ে হেঁটে ওরা দুজন রানিসায়রে পৌঁছল। প্রায় দেড়শো বিঘার এক জলাশয়। পাড়ের কাছে জলজ লতাপাতা, গুল্ম থাকলেও মাঝখানটা পরিষ্কার টলটলে। বাঁধানো ঘাট নেই। গ্রামের লোকেরা একটা জায়গা দিয়ে জলে নেমে নেমে সেইখানটায় ঘাট তৈরি হয়ে গেছে।
