”ছেলে চেঁচামেচি, কান্নাকাটি করেনি?”
”করেছিল। বাবা একটা স্কুটার কিনে দেবে বলায় ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। কিন্তু সাইকেলটা উনি এখন বিক্রি করে দেবেন। কিনে নিন না!”
”দাম কত নেবে?”
”কিনেছিলেন দু’হাজারে, নিশ্চয়ই একটু কমই চাইবেন। মাস তিনেক মাত্র চালিয়েছে, খুব ভাল কন্ডিশনে আছে।”
বলরামের মনে হল, একটা সাইকেল থাকলে রানিসায়র যাওয়া আর আসার সুরাহা হয়ে যায়। কিন্তু দু’হাজার থেকে একটু কম মানে কত টাকা? দেড় হাজার? অত টাকা দিয়ে কেনা তাঁর দ্বারা হবে না। তবু কিন্তু কিন্তু করে বললেন, ”শ’পাঁচেকে যদি হয় তো নিতে পারি, এর বেশি দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।”
”চেয়ারম্যানকে বলে দেখি, যদি রাজি হয়ে যান—তা হলে নেবেন তো?”
”আজই নেব।”
পান্নালাল সাইকেলে উঠে অফিস চলে গেল। বলরাম বাড়ি ঢুকলেন।
”এ কী, বাড়ি ফিরে এলে যে!” তাঁকে দেখেই বিমলা বললেন।
”ট্রেন বন্ধ।”
বলরাম ঘরে ঢুকলেন। পেছনে বিমলা। পাঞ্জাবির বোতাম খুলছেন, তখন বিমলা বললেন, ”তোমার সঙ্গে ওই হস্টেলের ছেলেদের নাকি হাঙ্গামা হয়েছে? পাশের বাড়ির কাজের মেয়েটা কোথা থেকে শুনে এসেছে।”
”হাঙ্গামা? আমার সঙ্গে!” বলরাম অবাক হওয়ার ভান করলেন। ”অসভ্যতা করছিল তাই বকে দিয়েছি, একে কি হাঙ্গামা বলে? রাস্তা দিয়ে লোক যায় ওরা পেছনে টিপ্পনী কাটে, ছড়া বলে। আমার বকুনির পর এখন সব বন্ধ হয়ে গেছে।”
বিকেলে পান্নালাল এসে জানাল, ”চেয়ারম্যান পাঁচশোতেই রাজি, আজই আপনাকে টাকা দিয়ে দিতে হবে।”
সন্ধ্যাবেলায় তুলসী যখন সূর্য সঙ্ঘের ক্লাবঘরে দশ কিলোমিটার দৌড়ের এন্ট্রি ফি বাবদ দশ টাকা দিয়ে রসিদ নিল, তখন বলরাম পাঁচশো টাকা গুনে দিচ্ছিলেন মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যানকে।
তুলসী যার হাতে এন্ট্রি ফি—র টাকা দিল তাকে সে জিজ্ঞেস করল, ”আচ্ছা দাদা, প্রাইজ কী দেবেন আপনারা?”
একগাল হেসে এবং ভারিক্কি চালে লোকটি বলল, ”অনেক প্রাইজ আছে। আমরা তিনজন স্পনসরার অলরেডি পেয়ে গেছি। সফট ড্রিঙ্কসের, পেইন্টসের আর গুঁড়ো মশলার কোম্পানি দিচ্ছে পাঁচ হাজার টাকা করে। এখানকার ‘আহার’ ক্যাটারিং আর ‘গৃহলক্ষ্মী’ টিভি—র দোকান কথা দিয়েছে তিন হাজার করে দেবে। ‘পিকু’ হোসিয়ারি ওদের নাম—ছাপা গেঞ্জি দেবে সবাইকে, তাই পরে দৌড়তে হবে। আমরা আরও স্পনসরার জোগাড় করার চেষ্টা করছি, যাতে প্রত্যেককেই কিছু—না—কিছু প্রাইজ দেওয়া যায়। এ বছর মিনিমাম আমরা দেড় হাজার টাকার ফার্স্ট প্রাইজই দেব ছেলে আর মেয়ে—বিভাগে।”
”ফার্স্ট প্রাইজ কী দেবেন?”
”এখনও আমরা ঠিক করিনি, কাল—পরশু মিটিংয়ে বসে কমিটি ঠিক করবে। কেউ বলছে রিস্ট ওয়াচ, কেউ বলছে টেপ রেকর্ডার, কেউ বলছে ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট টিভি, কেউ বলছে সাইকেল….।”
”সাইকেল!” তুলসী উচ্ছ্বসিত হতে গিয়ে ঢোঁক গিলল। ”ওটা ছেলেদের, না মেয়েদের জন্য?”
লোকটি একটু তির্যক চোখে তাকিয়ে বলল, ”মনে হচ্ছে যেন ফার্স্ট হয়েই গেছেন! ঠাকুরপাড়ার যুব সম্মিলনীর অনেক ছেলেমেয়ে নাম দেবে, ওরা রেগুলার ট্রেনিং করে।”
দমে গেল তুলসী। দৌড় কেন, কোনও খেলার নিয়মিত কোনওরকম ট্রেনিং—ই সে করেনি। রানিসায়রে সাঁতার আর সাইকেলে আট মাইল, একে ট্রেনিং বলে না। তবে তার দম আছে, শরীর কষ্ট নিতে পারে, হাতে—পায়ে জোর আছে। সে বইতে পারে, সইতে পারে, কোনও কিছুতে লেগে থাকতে পারে। এটাই তার পুঁজি, সে হাল ছাড়ে না।
কিন্তু এই দৌড়ে তাকে যদি প্রথম হতে হয়, তা হলে ট্রেনিং তাকে করতেই হবে। বাড়ি ফেরার সময় সে ঠিক করল, প্রতিযোগিতার তো এখনও দু সপ্তাহ বাকি। সকালে, ছটায়, যে সময় দৌড়টা শুরু হবে ঠিক সেই সময়ে সেও রোজ দৌড়বে, ছ মাইল।
.
চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সাইকেলটা হাতে ধরে বলরাম ঝকঝকে চোখে সেটার ওপর দিয়ে বারবার দৃষ্টি বোলালেন। পান্নালাল বলল, ”খুব দাঁওয়ে পেয়ে গেলেন কিন্তু। বলুদা, খাওয়াতে হবে।”
”নিশ্চয় নিশ্চয়, ওপারে চলো, ‘তৃপ্তি মহল’—এর জিভেগজা খাওয়াব।”
”জিভেগজা! এমন একটা সাইকেল পেয়ে তো লোকে নেমন্তন্ন করে মাংস—ভাত খাওয়ায়।”
”খাওয়াব, খাওয়াব।” বলরাম পরিতৃপ্ত স্বরে বললেন।
”এবার সাইকেলটায় চেপে একবার চালিয়ে দেখুন। মনে তো হয়, প্যাডেল করতে অসুবিধা হবে না।”
বহু বছর বলরাম সাইকেল চড়েননি। এখন সাইকেলে উঠতে গিয়ে ব্যালান্স হারিয়ে যদি পড়ে যান, তাও আবার পানুর সামনে!
”কিছু অসুবিধে হবে না, ও আমি দেখে নিয়েছি, সিটটা নিচুই আছে। বুঝলে পানু, সাঁতার আর সাইকেল একবার শিখলে জীবনে কেউ আর ভোলে না। চলো হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই।”
”আপনি এগোন, এখানে আমার একটা কাজ আছে।” দুপা এগিয়েই পান্নালাল ফিরে এল। ”বলুদা, শুনলুম হস্টেলের ছেলেদের সঙ্গে নাকি আপনার গোলমাল হয়েছে ওই প্যারডি গান গাওয়া নিয়ে?”
”গোলমাল? আমার সঙ্গে?” বলরাম আকাশ থেকে পড়লেন এবং মনে মনে সিঁটিয়ে গেলেন। ”গুজব, গুজব। আচ্ছা আমাকে দেখে কি মনে হয় আমি গোলমেলে লোক? আমি শুধু ওদের রিকোয়েস্ট করেছি, নজরুলের গানের এভাবে বিকৃতি করা ঠিক নয়। তোমরা পারলে নিজেরাই গান বাঁধো। ওরা আমার কথা মেনে নিল।”
”ওহ, তাই এখন গান বন্ধ রয়েছে! বোধ হয় ভাবনাচিন্তা করছে নতুন গান বাঁধার জন্য।”
