”উঠে পড়লি যে, ক্ষিদে পেয়েছে?”
কোনি কথা বলল না। এগিয়ে গেল, রেলিংয়ের গেট লক্ষ করে।
”ক্ষিদে তো পাবেই। ভাবছি দুটো ডিম, দুটো কলা আর দুটো টোস্টের ব্যবস্থা করলে কেমন হয়।”
কোনি দাঁড়িয়ে পড়েছে। ক্ষিতীশ মনে মনে হিসেব করে দেখল প্রায় একটাকার ধাক্কা।
”আজ থেকে?”
ক্ষিতীশ ঘাড় নাড়ল। কোনি কি যেন ভেবে নিয়ে বলল, ”আমি কিন্তু বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খাব।”
ক্ষিতীশ একটু কৌতূহলী হয়েই বলল, ”বাড়িতে কেন!”
”এমনিই। বাইরে আমি খাব না।”
”তাহলে আরো একঘণ্টা জলে থাকতে হবে।”
ক্ষিতীশ কথাটা বলেই মনে মনে ব্যথিত হল। লোভ দেখিয়ে ক্ষুধায় অবসন্ন কোনিকে আরো পরিশ্রম করানো অমানুষিক কাজ হবে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হল, সাধ্যের বাইরে গিয়ে পরিশ্রম করে নিজেকে ঠেলে নিয়ে যেতে হবেই, নয়তো কিছুতেই সাধ্যটাকে বাড়ানো যাবে না। খাটুক, আরো খাটুক। যন্ত্রণায় ঝিমঝিম করবে শরীর, টলবে, লুটিয়ে পড়তে চাইবে যন্ত্রণার পাঁচিলের সামনে। আর তখন জেনেশুনেই চ্যালেঞ্জ দিতে হবে ওই পাঁচিলটাকে। এজন্য চরিত্র চাই, গোঁয়ার রোখ চাই।
…”নাম নাম, দাঁড়িয়ে আছিস কেন। দুটো ডিম, দুটো কলা, দুটো মাখন টোস্ট।”
যন্ত্রণা কি জিনিস সেটা শেখ। যন্ত্রণার সঙ্গে পরিচয় না হলে, তাকে ব্যবহার করতে না শিখলে, লড়াই করে তাকে হারাতে না পারলে কোনদিনই তুই উঠতে পারবি না।
…”ঠিক আছে, ঠিক আছে, কনুই অতটা উঠবে না। মুখ ডুবিয়ে।”
যন্ত্রণা আর সময় তোর অপোনেন্ট। ও দুটোকে আলাদা করা যায় না। যন্ত্রণাকে হারালে সময়কেও হারাতে পারবি। সময়কে হারালে পারবি যন্ত্রণাকে হারাতে।
রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ক্ষিতীশ মনে মনে কোনির সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছে আর মাঝে মাঝে চীৎকার করে উঠছে। কমলদিঘিতে এখন সাঁতার কাটছে একমাত্র কোনি। মাঝখানের চওড়া ঘাটে তিনচারজন বাইরের লোক স্নান করছে। বাসন ধুচ্ছে একটা স্ত্রীলোক। জুপিটার এবং আপোলোর নম্বর খেলা স্টার্টিং প্ল্যাটফর্মগুলো পাশাপাশি প্রায় পঞ্চাশ মিটারের ব্যবধানে। সেগুলো এখন জনশূন্য। শুধু জুপিটারের স্প্রীং বোর্ড থেকে ঝাঁপ দিয়ে যাচ্ছে গোটাচারেক উটকো বাচ্চচা ছেলে। জুপিটারের ক্লাবের বারান্দায় বেঞ্চে বসে দুটি লোক তেলেভাজা খেতে খেতে গল্প করছে আর হাসাহাসি করছে ক্ষিতীশের দিকে তাকিয়ে।
অ্যাপোলো ক্লাবের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল অমিয়া আর বেলা। কোনির সাঁতার দেখতে তারা রেলিংয়ের ধারে দাঁড়াল। অমিয়া দিন সাতেক পর আজ জলে নেমেছিল। কলেজের পরীক্ষার জন্য সে ব্যস্ত। অমিয়া না থাকলে বেলা নাকি ট্রেনিংয়ে জুত পায় না। দু’জনে আজ আধ মাইল করে সাঁতরেছে।
”কে রে মেয়েটা?” অমিয়া জিজ্ঞাসা করল।
”ক্ষিদ্দার আবিষ্কার।” বেলা চোখ পাকিয়ে বলল, ”শুনিসনি, হরিচরণদা কি বলছিল সেদিন? ক্ষিদ্দা নাকি প্রতিজ্ঞা করেছে জুপিটারকে ডাউন দেবে ওই মেয়েটাকে দিয়ে।”
”সে কিরে, ও তো এখনো হাতের টান দিতেই শেখেনি। সামনের বছরই আমি কিন্তু জুপিটারে ফিরে যাব। যেখানে ক্ষিদ্দা আছে যেখানে আমি নেই। পাঁচজনের সামনে ট্যাঁকোস ট্যাঁকোস করে কথা শোনাবে, ও আমার সহ্য হয় না।”
”আমিও তাহলে যাব।”
দুজনে আর একবার কোনির দিকে তাকিয়ে হাঁটতে শুরু করল। তখন অমিয়া হেসে বলল, ”কম্পিটিশনে পড়লে মেয়েটা তো আমার পা ধোয়া জল খাবে।”
.
প্রায় পৌনে দশটা। বাজার নিয়ে ফিরতে আজ দেরি হবেই। ক্ষিতীশ ব্যস্ত হয়ে হাঁটছে, পিছনে কোনি। একটা অস্টিন ফুটপাথ ঘেঁষে ক্ষিতীশের পাশে দাঁড়াল। জানলা দিয়ে বেরিয়ে এল বিষ্টু ধরের মুখ।
”ও ক্ষিতীশবাবু, আপনাকেই খুঁজছি যে। যে ইস্পিচটা লিখে দিলেন সেটা কেমন যেন ঠিক বাগে আনতে পাচ্ছি না, একটু ডিসকাসন করলে ভাল হতো। আজকেই তো বিকেলে সভা।”
”কিন্তু আমার যে এখুনি বাজার করে বাড়ি পৌঁছতে হবে।”
”গাড়িতে উঠুন। বাজার সেরে গাড়িতেই পৌঁছে দিয়ে ডিসকাসটা করে ফেলব।”
বিষ্টু ধর মোটরের দরজা খুলে দিল। ব্যস্ত হয়ে ক্ষিতীশ গাড়িতে উঠছে, তখন জামায় টান পড়ল।
”খাবারের কি হবে!”
”ওহ তোর ডিম—কলা।” ক্ষিতীশ বিব্রত হয়ে, কি বলবে ভেবে পেল না।
”আমাকে বরং পয়সাটা দিয়ে দিন, কিনে নোব।”
কথা না বলে ক্ষিতীশ পকেট থেকে একটা টাকা বার করে কোনির হাতে দিয়ে বলল, ”বিকেলে ঠিক সময়ে আসিস।”
গাড়ি চলতে শুরু করলে বিষ্টু ধর জিজ্ঞাসা করল, ”কে মেয়েটা?”
”আমার ভবিষ্যৎ।” ক্ষিতীশ হেসে বলল।
.
লীলাবতী যথারীতি তালা দিয়ে বেরিয়ে গেছে।
ক্ষিতীশ রান্নার উদ্যোগ না করে বিষ্ণু ধরকে নিয়ে বারান্দায় বসল। বিশু আর খুশি এগিয়ে এল ক্ষিতীশকে দেখে। বিষ্টু কুঁকড়ে গিয়ে বলল, ”ও দুটোকে সরান। দেখলে গা সিরসির করে।”
বিড়াল দুটিকে ক্ষিতীশ ছোট্ট ধমক দিতেই ওরা বারান্দা থেকে নেমে গেল।
”দারুণ ট্রেনিং তো।”
”ওদের ভালবাসি তাই কথা শোনে। ভালবাসলে সবকিছু করিয়ে নেওয়া যায়, মানুষকে দিয়েও।”
”তার মানে মানুষ আর জানোয়ারকে একই লাইনে ফেলছেন।”
”তা কেন। জানোয়ার দেখলে মানুষের গা সিরসির করে, কিন্তু মানুষ দেখলে জানোয়ারের করে কিনা জানি না।”
”অই, অই, অমনি ত্যারাব্যাকা কথা শুরু হয়ে গেল।” বলতে বলতে বিষ্টু ধর পকেট থেকে বক্তৃতা লেখা কাগজটা বার করল। ”আমি দাগ দিয়ে রেখেছি জায়গাগুলো। রাস্তায় রবারের বল ফাইনাল, চিফ গেস্ট বিনোদ ভড়। বুঝলেন না, ওর দলের ছেলেরা থাকবে। ফস করে যদি কিছু প্রশ্ন করে বসে আর যদি জবাব দিতে না পারি তাহলে আওয়াজ খাবো, বেইজ্জত হবো।”
