ব্যাঙ্ক বাড়ির দেয়ালে, নানা দাবি জানানো পুরনো ছেঁড়া পোস্টারের ওপর ছেলে দুটি তাদেরটি মেরে দিল। বলরাম একবার তাকিয়ে পোস্টারটা দেখে নিলেন। সূর্য সঙ্ঘের পরিচালনায় একটা কী যেন দৌড় প্রতিযোগিতা। তিনি স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের দিকে এগোলেন।
”দিদি, সাইকেলটা এবার ছাড়ুন। এর আর কিছু নেই।” তুলসীকে উপদেশ এবং পরামর্শ দুটোই দিলেন প্রৌঢ় জটাধারী। একটি বালককে সহকারী নিয়ে তিনি নিজেই সাইকেল মেরামতির কাজ করেন।
”ব্রেকের যা অবস্থা, কোনদিন অ্যাকসিডেন্ট করে বসবেন। সামনের চাকার হাব—এর ওপর এই যে রডটা বসানো রয়েছে, এটা তো জং ধরে ঝরঝর করছে। পেছনেরটারও একই অবস্থা। ভেঙে পড়লে আর দেখতে হবে না!”
”এখনও তো অ্যাকসিডেন্ট করিনি।” এই বলে তুলসী সাইকেল নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এসে বলল, ”সারাতে গেলে টাকা লাগে। পাব কোথায়?”
সাইকেলে চড়তে গিয়ে তার নজর পড়ল পোস্টারটা। সে পড়ার জন্য এগিয়ে গেল।
বিরাট দৌড় প্রতিযোগিতা
পরিচালনায় সূর্য সঙ্ঘ
মেয়েদের ১০ কিলোমিটার ও পুরুষদের ২০ কিলোমিটার। নাম দিবার শেষ
দিন ৭ অক্টোবর। প্রবেশ মূল্য ১০ ও ১৫ টাকা।
চিত্তাকর্ষক পুরস্কার।
‘পাঁচ মাইল রোড রেসে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়েছি’—তুলসীর মাথার মধ্যে বাক্যটি বিদ্যুৎ চমকের মতো চড়াত করে উঠল। মিথ্যেটাকে যদি সত্যি করতে হয় তা হলে এই সুযোগ। সত্যি সত্যিই দৌড় প্রতিযোগিতায় নেমে মিথ্যাটা খণ্ডাবার এই সুযোগ তার ছাড়া উচিত নয়। সূর্য সঙ্ঘ স্টেশনের পশ্চিমে, জগন্নাথকাকার বাড়ির কাছেই। ক্লাব ঘরটা সে চেনে। ঠোঙা বিক্রির টাকা থেকে এনট্রি ফি দশ টাকা সে আজই সন্ধ্যায় দিয়ে আসবে। দৌড়টা পাঁচ মাইল না হয়ে ১০ কিলোমিটার, তাতে কিছু যায় আসে না। ১০ কিলোমিটার মানে তো ছ’ মাইল। পাঁচের থেকেও বেশি। এটা তাকে জিততেই হবে। তুলসী সাইকেলে উঠে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হল।
বলরাম আধঘণ্টারও বেশি অপেক্ষা করে ট্রেনের আর দেখা পেলেন না। ফিরে আসতে আসতে পোস্টারটার দিকে আর একবার তাকিয়ে থেমে পড়লেন। খুঁটিয়ে পড়লেন। শুনেছিলেন বটে এখানে একটা বড় দৌড় প্রতিযোগিতা হয়, সেটা তাহলে এটাই বোধ হয়। তাঁর মনে ক্ষণিকের জন্য ভেসে উঠল তুলসীর কোঁচকানো চোখ দুটো। সাঁতার কম্পিটিশনের কোনও সুযোগ থাকলে মেয়েটার কোঁচকানো চোখকে ছানাবড়া করে দিতে পারেন এখনও।
বলরামের বুকের মধ্যে একটা চনমনে উচ্ছ্বাস ফেঁপে উঠল। নিজেকে তাঁর খুব শক্ত বলিষ্ঠ মনে হল। হ্যাঁ, এই বয়সেও তিনি গঙ্গার চার—পাঁচ মাইল সাঁতরাতে পারবেন, শুধু একটু প্র্যাকটিস করে নিতে হবে, এই যা! পঁয়ত্রিশ বছর আগে সেই কাপটা জিতেছিলেন। এত বছর পর আর—একবার চেষ্টা করে দেখলে কেমন হয়? তুলসী বলল, ওদের গ্রামের পাশে রানিসায়র নামে বিরাট দিঘি আছে। ওখানে তো প্র্যাকটিস করা যায় ভোরবেলায়, সেইসঙ্গে ব্যায়ামটাও হয়ে যাবে।
কিন্তু চার মাইল যাওয়া আর চার মাইল আসা, সেটা কী করে হবে? অসম্ভব! মাথা নাড়তে নাড়তে বলরাম রামপ্রসাদ হস্টেলের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আড়চোখে দোতলার বারান্দার দিকে তাকালেন। সেদিনের পর থেকে ওদের গান গাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। কেন বন্ধ হল কে জানে! তবে এখনও তিনি হস্টেলের কাছাকাছি হলে কেমন একটা অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
বাড়ির সামনেই তাঁর সঙ্গে দেখা হল সাইকেল হাতে—ধরা পান্নালালের। স্টেশনের ওপারে মিউনিসিপ্যালিটি অফিসে কেরানির কাজ করে। সাইকেলে যায়—আসে। বলরাম বললেন, ”পানু, তুমি আছ ভাল। ট্রেনে চড়ে চাকরিতে যেতে হয় না, সাইকেলের দু’বার প্যাডেল মেরেই অফিস! আর আমাকে কিনা আজও কামাই করতে হল, ট্রেনের তারে বিদ্যুৎ নেই! তোমার মতো একটা সাইকেল যদি থাকত তা হলে অফিসে চলে যেতাম। লেট হবে নিশ্চয়ই, তবু কামাইটা তো হবে না, তা ছাড়া এটা ভাল ব্যায়ামও।”
পানুর হেসে ওঠা উচিত ছিল বলরামের সঙ্গে। কিন্তু হাসল না। একটু অবাক হয়ে বলল, ”বলুদা, আপনি সাইকেল চালাতে পারেন?”
”কেন পারব না? তেরো—চোদ্দো বছর বয়সেই কলকাতায় শিখেছি। সাইকেল চড়ে দক্ষিণেশ্বর, বেলুড় মঠ, এমন কী, ব্যান্ডেল চার্চ পর্যন্ত গেছি। একবার দল বেঁধে ডায়মন্ড হারবার যেতে গিয়ে আমতলার কাছে একটা ষাঁড় শিং নেড়ে এমন তাড়া করল যে, পালাতে গিয়ে ডোবায় পড়লাম, মাথা ভাঙল। ব্যস, বাবা বললেন আর সাইকেল না, সেই আমার শেষ চড়া।”
পানু শুনতে শুনতে বলরামের আপাদমস্তক দু’বার দেখে নিয়ে বলল, ”বড়দের, না বাচ্চচাদের সাইকেল চালাতেন?”
প্রশ্নটা অবশ্যই তাঁর উচ্চতাকে কটাক্ষ করে। বলরামের রেগে ওঠা উচিত। রাগের বদলে হেসে উঠলেন তিনি।
”বলেছ ভাল।” হাসি চাপতে চাপতে বললেন, ”সত্যিই আমার পা প্যাডেল পর্যন্ত পুরো পৌঁছত না। সাইকেলের সিটটা নিচু করার জন্য যে রডের ওপর সেটা বসানো থাকে, সেটা কেটে ছোট করে নিয়েছিলাম।”
”আমাদের চেয়ারম্যান একটা রেসিং সাইকেল বিক্রি করছেন, আপনি কিনবেন?”
”তোমাদের চেয়ারম্যান সাইকেল চড়েন নাকি?”
”উনি নন, ওঁর স্কুলে—পড়া ছোট ছেলে চড়ত। একজন সাইক্লিস্ট সকালে প্র্যাকটিস করার সময় গত বছর ট্রাকের ধাক্কায় মারা গেল জি টি রোডে। চেয়ারম্যানের বউ কাগজে সেটা পড়েই ছেলের সাইকেলটা নিজের শোবার ঘরে তুলে এনে এক বছর হল চেন দিয়ে বেঁধে রেখেছেন।”
