”আর যদি একবারও তোরা গান ধরিস, তা হলে এই রামপ্রসাদ হস্টেলে তোদের আর—।”
”অনিলদা, আমরা তো ওঁর নাম করে গান—”
”চওওপ।” বিশাল একটা দাবড়ানিতে, ওরা তিনজনে মিইয়ে গেল।
”তিনটে ছোকরা মিলে একজন বুড়ো মানুষকে মারছিস, লজ্জা করে না। তোরা কি ইয়াংম্যান? উনি কী অন্যায় করেছেন তা আমার জানার দরকার নেই। আমি শুধু দেখলাম তিনটে অল্পবয়সি ছেলে একজন বুড়ো মানুষের গায়ে হাত তুলেছে। উনি বিনা দোষে যদি মারেনও, দাঁড়িয়ে মার খাবি, তাতে লজ্জার কিছু নেই। গায়ে জোর থাকলেই ইয়াং হয় না, বুঝলি, ‘ম্যান’ বলেও একটা কথা আছে। আগে ‘ম্যান’ হওয়ার চেষ্টা কর…এই বলে রাখলাম, হস্টেলের বদনাম হয় এমন কাজ আর যেন না ঘটে।”
অনিল ঘরে ফিরে যাওয়ার সময় জলন্ত চোখে তিনজনের দিকে তাকিয়ে গেল।
বলরাম বাড়ি ফেরার পথে ভাবছিলেন, সত্যিই তিনি বোধ হয় বুড়ো হয়ে গেছেন। তাঁর ধৈর্যশক্তি কমে গেছে, সহিষ্ণুতা লোপ পেয়েছে। তা না হলে এমন করে রেগে উঠবেন কেন? ওরা প্যারডি বেঁধেছে তো কী হয়েছে? মজা করতে চেয়েছে তো মজা করুক। ওদের সঙ্গে আমারও তো মজা পাওয়া উচিত ছিল। ভগবান আমাকে এমনই একটা চেহারা দিয়েছেন, এতে আমার তো কোনও হাত নেই। হাঁটাটা অবশ্য আমার নিজস্ব। এটা বদলাবার চেষ্টা করা উচিত ছিল, কিন্তু আমি তা করিনি। লোকে আমার হাঁটা দেখে হাসে। হাসবেই তো! যা ঘটে গেল, নিশ্চয় এটা জানাজানি হয়ে যাবে। রসিয়ে রসিয়ে লোকে বলাবলি করবে আর হাসবে। ইসস…।
বলরামের চোখে জল এসে গেল। পাঞ্জাবির হাতায় চোখ ঘষলেন। আর ধীরে ধীরে তখন তাঁর মনের মধ্যে একটা লোহার মতো কঠিন ইচ্ছা দানা বাঁধতে শুরু করল। বাড়িতে ঢোকার আগে সদর দরজায় কয়েক সেকেন্ড দাঁড়ালেন। ফিসফিস করে নিজেকে শুনিয়ে তিনি বললেন, ”আমাকে বুড়ো না হওয়ার পরীক্ষা দিতে হবে।”
.
”মেসোমশাই, মেসোমশাই।”
চিৎকার করে হাতছানি দিচ্ছে তুলসী। বলরাম থমকে দাঁড়ালেন। গোপালের কাগজের দোকানে উবু হয়ে বসে সেই মেয়েটি। মেঝেয় দড়ি দিয়ে দিস্তা করে বাঁধা ঠোঙার স্তূপ।
”অফিসে যাচ্ছেন?”
”হ্যাঁ।”
তুলসী বেরিয়ে এল দোকান থেকে। ”মনে আছে, আমি যা বলেছিলাম?”
বলরাম ভাবতে শুরু করলেন।
”চাকরির কোনও সন্ধান পেলে আমাকে জানাবেন।”
”হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে আছে আমার।” বলরাম অপ্রতিভতা কাটাতে একটু জোর দিয়েই বললেন, ”নিশ্চয়ই খবর দেব তোমায়, কিন্তু তোমার নামটা তো জানা হয়নি এখনও! কুলডাঙায় থাকো, শুধু এটাই জানি।”
”আমার নাম তুলসী রায়। কুলডাঙায় রমেন স্যারের বাড়ি বললে যে কেউই দেখিয়ে দেবে। তা ছাড়া আপনি গোপালদাকেও বলতে পারেন, আমি রোজই তো এখান দিয়ে যাই।”
”ঠিক আছে, আমি এখানেই বলব।” বলরাম স্টেশনের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন এবং তাঁর আগের গতিতে নয়। তুলসীও তাঁর সঙ্গে চলেছে।
”তোমার সাইকেলটা কই?”
”সেটাই তো আনতে যাচ্ছি। আর বলবেন না, সেদিন রাতে বাড়ি ফিরেই আবার আসতে হয়েছিল স্টেশনের ওপারে আমার এক দূরসম্পর্কের কাকার বাড়িতে, ওই চাকরির খোঁজেই। কথা বলে বুঝলাম, হবে না। ওরা খেলোয়াড় মেয়ে চায়।”
”কী খেলার?”
”আর্চারি, রাইফেল শুটিং, শটপাট…এইসব। আমি তো এর কোনওটাই জানি না। সাইকেল চালাতে পারি, দৌড়তে পারি, আমাদের গ্রামের সরকারি ফিশারিজ ডিপার্টমেন্টের বিরাট একটা দিঘি আছে, ‘রানিসায়ের’ নাম, সেখানে প্রায়ই যাই। ঘণ্টাখানেক সাঁতার কাটি। কিন্তু সেই সাঁতারের কথা বলে চাকরি তো আর চাওয়া যায় না!”
”আমিও সাঁতার কাটতাম। কলকাতায় আমাদের বাড়ির কাছেই গঙ্গা। স্কুলের গরমের ছুটি পড়লে, গঙ্গাতেই ঘণ্টা দুয়েক রোজ পড়ে থাকতাম। গঙ্গায় একটা কম্পিটিশনে একবার কাপও জিতেছি, সেকেন্ড হয়েছিলাম।” বলরাম বাধো বাধো স্বরে খবরটা জানালেন।
তুলসী মুখ ফিরিয়ে চোখ কুঁচকে তাঁকে দেখল। বলরামের মনে হল, মেয়েটি বোধ হয় বিশ্বাস করতে পারছে না। তিনি মুখ গম্ভীর করে বললেন, ”তোমাদের রানিসায়রে গিয়ে সাঁতার কাটা যাবে?”
”কেন কাটা যাবে না! আসুন না আপনি।”
”ভাবছি ভোরবেলায় একটু ব্যায়াম করা দরকার, তাতে ব্লাডপ্রেশারটা কমবে। সাঁতারের থেকে ভাল ব্যায়াম আর কী আছে!”
কথা বলতে বলতে ওরা স্টেশনের কাছে এসে পড়েছে। তুলসী দাঁড়িয়ে পড়ল সাইকেল সারাইয়ের দোকানের সামনে।
”সেদিন রাতে সাইকেলের টিউভ পাংচার হয়ে কী বিপদে যে পড়েছিলাম কী বলব! সারাব বলে এই দোকানে দিতে এসে দেখি দোকান বন্ধ। তখন ওটাকে হাঁটিয়ে নিয়ে অনেক রাত্রে বাড়ি ফিরি। পরদিন আবার হাঁটিয়ে এনে জটধারীবাবুর দোকানে দিলাম। শুধু কি পাংচার? শরীরে ওরও অজস্র ব্যামো। ব্রেক, বেয়ারিং, চেন সবকিছুই ঝরঝরে হয়ে গেছে। এ কি আজকের সাইকেল! আমার জন্মেরও আগে বাবা কিনেছিলেন।”
শুনতে শুনতে বলরাম স্টেশনের দিকে তাকাচ্ছিলেন। প্ল্যাটফর্মে অফিসযাত্রী ডেইলি প্যাসেঞ্জারদের ভিড়টা যেন একটু বেশিই। নিশ্চয়ই কোনও গোলমাল হয়ে ট্রেন বন্ধ রয়েছে।
খবরের কাগজের ওপর হাতে লেখা পোস্টার নিয়ে দুটি ছেলে দেয়ালে সাঁটার জন্য জায়গা খুঁজছে। বলরাম তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করে জানলেন, ওভারহেড তারে বিদ্যুৎ নেই। তাই সকাল আটটা থেকে ট্রেন বন্ধ। এমন ব্যাপার প্রায়ই ঘটে। মনে মনে তিনি ঠিক করলেন, আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করে দেখবেন, তার মধ্যে ট্রেন না এলে বাড়ি ফিরে যাবেন।
