সাইকেল হাতে ধরে স্টেশন রোড দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তুলসীর আর একটা কথা মনে হওয়ায় তার সারাদিনের ব্যর্থতার কষ্টটা যেন আরও বেড়ে গেল। সে একটা মিথ্যা কথা বলেছে। পাঁচ মাইল দৌড়ে সে কখনও নামেনি। অথচ চাকরি পাওয়ার আশায় সে জগন্নাথকাকাকে বলে দিল, মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়েছে! একেই কি বলে ‘অভাবে স্বভাব নষ্ট’? ছি ছি ছি, তুলসী মাথা নাড়ল। বাবা, মা, কি ছোটভাইটা শুনলে তার সম্পর্কে কী ভাববে?
লোকটা ঠিকই বলেছে, ”এত ব্যস্ততা কীসের?” আর এই জন্যই তো সে বোকার মতো বলে বসল, ”আমি যদি শিখে নিতে পারি?” গাছে না উঠতেই এককাঁদি! খেলাধুলোয় ওপরদিকে উঠতে গেলে কত ধৈর্যের আর খাটুনির দরকার। আর সে কিনা বলে বসল—। তুলসী মাথা নাড়ল। লোকটা ঠিকই বলেছে, ”একটু কি ধৈর্য ধরতে পারো না?” পি টি ঊষা, সাইনি আব্রাহাম কত বছর পরিশ্রম করেছে বলেই না ওপরে উঠেছে। আর আমি, কুলডাঙার তুলসী রায়, আমি কিনা দু—দিনেই শটপাট, ডিসকাস শিখে নিয়ে চাকরি পাব আশা করছি!
স্টেশন রোড শেষ হয়ে গেল। এবার রাস্তায় আর আলো নেই। মাজাভাঙা, হোতর, কুলডাঙা। সামনে ঘুটঘুটে অন্ধকারের দিকে তুলসী তাকাল। আজ সে মোট বারো মাইল সাইকেল চালিয়েছে। পেটে আগুন জ্বলছে। এখনও চার মাইল তাকে হাঁটতে হবে।
ঠিক আছে। তুলসী হাঁটা শুরু করল।
.
সকালে বাজার থেকে ফিরছেন বলরাম। হস্টেলের কাছাকাছি হতেই শুরু হল অদৃশ্য গায়কদের কোরাস :
ট্রেনের ওই খোলা কপাট,
নামে লোক ঝপাত ঝপাত
চিত পটাত
প্ল্যাটফরমের পাষাণ পরে।
বলরাম থমকে দাঁড়ালেন। হঠাৎ তাঁর দেহের সব রক্ত যেন মাথার দিকে উঠতে শুরু করল, ফলে মাথাটা গরম হয়ে উঠল। দাঁতে দাঁত ঘষে অস্ফুটে বললেন, ”অসভ্যতা এবার বন্ধ করা দরকার। দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে।”
চশমা—পরা একটি মুখ মুহূর্তের জন্য বারান্দায় উঁকি দিয়েই সরে গেল। তারপরই আবার শুরু হল:
ওরে ও তরুণ বুড়ো,
গড়াগড়ি দিসনে আরও
লম্ফ মারো
উঠবে রে চুল টাক উপরে।।
‘টাক উপরে’ যখন শেষ হচ্ছে, বলরাম তখন বাজারের থলি হাতে সিঁড়ি দিয়ে দোতলার বারান্দায় উঠে এসেছেন। দুটি ছেলে রাস্তার দিকে মুখ করে গেয়ে চলেছে। মেঝেয় বসে একজন দুটো কাঠি দিয়ে বনস্পতির একটা গোল টিনে ড্রাম বাজাচ্ছে।
”পাজি, হতভাগা, নচ্ছার।” চিৎকার করে উঠে বলরাম থলিটা নামিয়ে রেখে চড় কষালেন চশমাপরা, ফরসা, টিঙটিঙে রোগা ছেলেটির গালে।
চশমাটা ছিটকে পড়ামাত্র একটা কাচ ভেঙে গেল। এর পর দ্বিতীয়টির গেঞ্জি ধরে এমন টান দিলেন যে, সে সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ল এবং গেঞ্জি ছিঁড়ে গেল। ড্রামবাদক ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। বলরাম টিনের কৌটোয় জোরে লাথি মারতেই সেটা দেয়ালে গিয়ে লাগল।
হতভম্ব অবস্থাটা কাটিয়ে উঠে ওরা তিনজনে একসঙ্গে চেঁচাতে শুরু করল। বলরামের মুখে শুধু একটাই কথা, ”দাঁড়া, আজ তোদের মজা বার করছি।…ওরে ও তরুণ বুড়ো?…দ্যাখ তবে বুড়োটা কে?”
বলতে বলতে বলরাম দু—হাতে অন্ধের মতো ঘুসি ছুড়তে লাগলেন, যার একটাও কিন্তু লাফিয়ে লাফিয়ে সরে যাওয়া ওদের গায়ে লাগল না। এর মধ্যেই ড্রামবাদক, যে রীতিমতো বলিষ্ঠ এবং চটপটে, বলরামকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ল্যাং মেরে মেঝেয় ফেলে দিল। বাকি দু—জন ঝাঁপিয়ে পড়ল তাঁর ওপর।
গোলমালের আওয়াজে হস্টেলের অন্যান্য ছাত্ররা ছুটে এসেছে। কাচভাঙা চশমাটা হাতে নিয়ে টিঙটিঙে যুবক তখন চিৎকার করে যাচ্ছে, ”বাঁচাও, বাঁচাও। আমরা আক্রান্ত।” উপুড় হয়ে পড়া বলরামের পিঠের ওপর চেপে বসে, ছেঁড়া গেঞ্জি গায়ে ছেলেটি দু—হাতে তাঁর মাথায় চাঁটি মেরে চলেছে আর টিনের ড্রাম বাজাতে বাজাতে অন্যজন গেয়ে যাচ্ছে, ”মাথার ঊর্ধ্বে আছে মাদল, নিম্ন উতলা পদযুগল, গড়গড়িয়ে চলিছে বল, চল চল চল।”
ব্যাপারটা যদিও বিদঘুটে হাস্যকর, কিন্তু বলরামের কাছে সেটা মর্মান্তিক। হস্টেলের বয়স্ক ছাত্ররা এমন একটা দৃশ্য দেখে প্রথমে থতমত খেয়ে যায়। তারপর ছুটে গিয়ে একজন বলরামের পিঠের ওপর থেকে ড্রামবাদককে টেনে নামাল।
”হচ্ছে কী? একজন বুড়ো লোককে এইভাবে হেনস্থা করে?”
”এই বুড়ো লোক আমাদের কী করেছে, অনিলদা তুমি কি সেটা দেখেছ? তুমি শুধু ওকে হেনস্থা করাটাই দেখলে। হেনস্থা নয়, এটা হল আত্মরক্ষা।” ড্রামবাদক বাজনা থামিয়ে কথাটা বলেই আবার তার বাদন শুরু করল।
”উঠে আয়, ওঠ ওঠ।” অনিলদা নামের ছাত্রটি বলরামের পিঠ থেকে টেনে তুলল ছেঁড়া গেঞ্জিপরা ছেলেটিকে।
বলরাম উপুড় হয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তিনি কিছুই ভাবছেন না। মাথার মধ্যে শুধু অন্ধকার আর ঝোড়ো বাতাসের মতো শোঁশাঁ শব্দ। প্রচণ্ড রাগে জ্বলে ওঠার বদলে এখন তিনি গভীর লজ্জায় ডুবে যাচ্ছেন। ‘কেন, কেন, এমন একটা বোকামি করতে গেলাম?’ এই কথাটাই এখন তাঁকে ছোবলাতে শুরু করেছে।
তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। কপালে, নাকে ধুলো লেগে। বাহু তুলে পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে ধুলো মুছলেন। বারান্দার এককোণে বাজারের থলিটা কাত হয়ে রয়েছে। দুটো পেঁয়াজ মেঝেয় পড়ে। বলরাম নীচু হয়ে পেঁয়াজ দুটো তুলে থলির মধ্যে রেখে, মাথা নিচু করে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেলেন।
এতক্ষণ ওরা কেউ নড়েনি, শুধু চুপচাপ দেখে যাচ্ছিল। বলরাম নীচে নেমে যেতেই ওরা বারান্দার পাঁচিলে এসে নীচের দিকে তাকাল। থলি হাতে পাঁচ ফুট এক ইঞ্চির একটি মানুষ মাথা নামিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। আশ্চর্যের ব্যাপার, হাঁটছেন ধীরগতিতে। কী যেন তিনি ভাবছেন।
