ফাঁপরে পড়ল তুলসী। কোনওটাতেই সে জীবনে নামেনি। ট্রেনে যেতে যেতে ঠাকুরপাড়া স্টেশনের পাশের মাঠে সে কয়েকটি ছেলে আর মেয়েকে দৌড়, লং জাম্প, ডিসকাস প্র্যাকটিস করতে দেখেছে। ওখানে ‘যুব সম্মিলনী’ নামে অ্যাথলেটিকসের একটা ক্লাব আছে। একদিন সে একটি মেয়েকে একটা নারকেলের সাইজের লোহার বল ছুড়তে দেখেছে। এই ছোড়াকেই বলা হয় শটপাট। তার মনে হয়েছিল গায়ে জোর না থাকলে লোহার বল ছোড়া যায় না এবং ছবিতে দেখেছে যেসব মেয়ে ছোড়ে, তাদের তাগড়াই ভারী চেহারা, অথচ সে ছিপছিপে, হালকা। সুতরাং সে শটপাটার এ—কথা বললে কেউ বিশ্বাস করবে না। তা ছাড়া চাকরি দেওয়ার আগে সার্টিফিকেট তো অবশ্যই দেখতে চাইবে। তখন সে কী দেখাবে?
তুলসী মাথা নেড়ে জানিয়ে দিল, সে ডিসকাসে বা শটপাটে নামেনি। ”কিন্তু কাকাবাবু, আমি যদি শিখে নিতে পারি?”
এবার ঘরের তিনজনেই বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকালেন। বলে কী মেয়েটা! লোহার গোলাটাকে কি হাতের মোয়া বা ডিসকাসের চাকতিটাকে কি গুড়ের পাটালি ভেবেছে নাকি? শিখে নেব বললেই কি শেখা যায়? বছরের পর বছর প্র্যাকটিস তা হলে দরকার হয় কেন?
জগন্নাথবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, ”তুই এখন যা, এঁদের সঙ্গে এবার কথা বলব। কিছু হলে তোকে খবর পাঠাব।”
ঘর থেকে বেরিয়ে সাইকেল হাতে ধরে রাস্তায় আসায় সময় সে ভাবল, জগন্নাথকাকা গম্ভীর হয়ে গেলেন কেন? ‘শিখে নিতে পারি’ শুনে ধরে নিয়েছেন নিশ্চয় মাথায় গোলমাল আছে। সত্যিই হয়তো আছে, নইলে এমন একটা অবান্তর কথা তার মুখ দিয়ে বেরোবে কেন!
সাইকেল চড়ে সে বিদ্যানগর স্টেশনে পৌঁছে সাইকেল থেকে লেভেল ক্রসিংয়ে নামল রেললাইনগুলো পার হওয়ার জন্য। ট্রেন আসছে তাই গেটটা বন্ধ। কিন্তু ধৈর্য হারানো কিছু লোক সাইকেল হাতে ধরে নিচু হয়ে, আড়াআড়ি—থাকা কাঠের খুঁটির তলা দিয়ে বেরিয়ে চলে যাচ্ছে। তুলসীও তাই করল।
ডাউন দু’নম্বর রেলের ট্র্যাকে লোকাল ট্রেনের হুটার শোনা গেল। তুলসী সাইকেল দু—হাতে ধরে উঁচু লাইনগুলো আর পাথরকুচির ওপর দিয়ে ছুট দিল। আপ এক নম্বর ট্র্যাক পেরিয়েছে। দু’নম্বরটা পার হতেই একটা গর্ত। বহুদিন ধরেই রয়েছে এই গর্তটা। কিন্তু লম্বা লম্বা ঘাসে আর ফলওয়ালাদের ফেলে দেওয়া ফলের পাতায় ঢেকে থাকায় বোঝা যায় না ওখানে একটা গর্ত রয়েছে। যারা নিয়মিত যাতায়াত করে, তারা জায়গাটাকে চেনে, তাই এড়িয়ে যায়। তুলসীও গর্তটাকে জানে। কিন্তু এখন ট্রেনটাকে সামলাতে গিয়ে তার সরে যাওয়ার মতো সময় ছিল না। গর্তে পড়ল সাইকেলের সামনের চাকা। সেটা টেনে তুলে তিন নম্বর ট্র্যাকে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেনটা ঢুকল বিদ্যানগর স্টেশনে।
কিছু লোক যারা তুলসীকে এইভাবে লাইন পার হতে দেখল, তারা তার দিকে ভর্ৎসনা—ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে। একজন বলল, ”একটু ধৈর্য ধরতে পারো না?”
আর একজন বলল, ”এখন মানুষের যেন আর তর সয় না, আধ মিনিটও সবুর করতে পারে না। এত ব্যস্ততা কীসের?”
তুলসী মাথা নামিয়ে কথাগুলো শুনতে শুনতে চার নম্বর ট্র্যাক পেরিয়ে স্টেশন রোডে এল। তার মনে হল, সত্যিই তার ধৈর্যটা কম। কিন্তু এই লোকগুলো কি জানে, এখনিই তার একটা চাকরি দরকার। আলসারে বাবা ধুঁকছেন, আর তিনি সংসার টানতে পারছেন না। তেরো বছরের ক্লাস সেভেনে পড়া ভাই ট্রেনে চিনেবাদাম ফেরি করার কাজ নেবে বলছে। হ্যাঁ, সে খুবই ব্যস্ত।
সাইকেলে উঠল তুলসী। জলতেষ্টা পেয়েছে। খিদেটা এখন হুহু করে বাড়ছে। এখানে ধারে— কাছে টিউবওয়েল নেই। শশাটাও যে কখন হজম হয়ে গেছে! আর সেই টাকওলা ভদ্রলোক বললেন কিনা ‘বড্ড পেট ভার করে’। এখন তো লোহা খেয়ে সে হজম করে ফেলতে পারে। এত খিদে—
আর ঠিক এই সময়ই সাইকেলের সামনের চাকার টিউব পাংচার হয়ে চাকাটা বসে গেল। ব্রেক কষে তুলসী সাইকেল থেকে নামল। টায়ারটা আঙুল দিয়ে টিপে সে মাথা নাড়ল। দু’মাস আগে একবার সে এই অবস্থায় পড়েছিল। তবু রক্ষা, পাংচারটা হয়েছিল বাড়ির কাছেই, কিন্তু এখন?
তার কাছে পাঁচটা পয়সাও নেই। টিউবটা সারিয়ে নিতে হলে তাকে ধার রাখতে হবে। বিপদের কথা বলে ধরাধরি করলে, ‘জটাধারী সাইকেল রিপেয়ারিং শপ’—এর বুড়ো মালিক জটাধারী হালদার হয়তো দয়া দেখাতে পারে। এই ভেবে তুলসী আবার ফিরে এল স্টেশনের দিকে।
হায় কপাল! দোকানটা যে বন্ধ! তুলসী ফ্যালফ্যাল করে বন্ধ ঝাঁপের দিকে তাকিয়ে রইল। সেই সময় পাশের রেডিমেড পোশাকের দোকানের মালিক বলল, ”আজ দুদিন হল জটুদার দোকান বন্ধ। বোধ হয় অসুখবিসুখ করেছে।”
এবার তা হলে সাইকেল হাতে ধরে চার মাইল হেঁটে কুলডাঙায় ফিরে যাওয়া! আজ সারাদিন একটা কাজও তার সফল হল না। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেখেছিল ”বাড়ি বাড়ি ঘুরিয়া প্রসাধনসামগ্রী বিক্রয়ের জন্য কয়েকজন সেলসগার্ল আবশ্যক। সত্বর দেখা করুন।” এবং সে আজ কলকাতায় দেখা করতে গিয়ে শুনল ”পাঁচজন মেয়ে নেওয়া হয়ে গেছে। পরে আবার নেওয়া হতে পারে। মাঝে মাঝে এসে খবর নেবেন।” তারপর জগন্নাথকাকার কাছ থেকেও হতাশ হয়ে ফিরে আসা। এমন সব খেলার জন্য চাকরি, যার একটাও সে খেলেনি। কবাডি, খো খো সে ভালই খেলে। এক বছর সে সূর্য সঙ্ঘের হয়ে কলকাতায় কবাডি লিগে খেলেছে। একবার তার মনে হয়েছিল জগন্নাথকাকাকে বলে ”আপনারা মেয়েদের কবাডি টিম করুন না!” কিন্তু উনি যখন বললেন মাত্র পাঁচজনকে চাকরি দেওয়ার কোটা পেয়েছেন, তখনই সে মনে মনে চুপসে যায়। একটা কবাডি টিম করতে কমপক্ষে বারোজন প্লেয়ার চাই। সাতজন খেলে, পাঁচজন রিজার্ভে থাকে।
