”পি টি ঊষা, সাইনি আব্রাহাম।” অপেক্ষাকৃত কমবয়সি লোকটি নাম দুটি মনে করিয়ে দিলেন।
”আমাদের ছেলেগুলো তো কোনও কম্মের নয়, তাই স্পোর্টস বোর্ড ঠিক করেছে, ছেলেদের নয়, এবার শুধু মেয়েদেরই চাকরি দেবে। বারোজনের কোটা ঠিক করে দিয়েছে ইস্টার্ন সার্কেলের জন্য। আমরা পেয়েছি পাঁচজনের চাকরির কোটা। দুটো ক্লাস থ্রি, তিনটে ক্লাস ফোর—এর চাকরি। কিন্তু পাঁচজন দিয়ে কোনও খেলার টিম তো আর কার যায় না। কাল আমাদের স্পোর্টস ক্লাবের মিটিংয়ে এই নিয়ে আলোচনা হয়েছে, আমি আবার ক্লাবের প্রেসিডেন্ট।”
জগন্নাথবাবু সামনের দুই অতিথির দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসলেন। তাঁরা দু’জন খুব অবাক হলেন।
”আপনি স্পোর্টসেও আছেন! কই, এটা তো আমাদের বলেননি?” বয়স্কজন বললেন ঈষৎ সমীহভরে।
”এ আর বলার মতো কথা নাকি! এককালে খেলতুম টেলতুম, ফার্স্ট ডিভিশনে ফুটবল খেলেছি, ভলিটাও খারাপ খেলতুম না। তারপর যা হয়, চাকরিতে মন দিলুম, মাঠে যাওয়াও ছাড়লুম। এখন দেখছেন তো শরীরের অবস্থা।” জগন্নাথবাবু নিজের বিশাল ভুঁড়িটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে তৃপ্তমুখে হাসলেন।
তুলসী হাসল না। সে ঠায় দাঁড়িয়েই আছে। জগন্নাথবাবু তাকে বসতে বলতে ভুলে গেছেন। তার নিজেরও কুণ্ঠা লাগছে খাবারের প্লেটের সামনে নিজের থেকে বসতে। তার মুখে ক্লান্তিমাখা উদ্বেগ। জগন্নাথবাবুর কথাগুলো থেকে সে এইটুকু বুঝেছে, পাঁচটা চাকরি ওঁর অফিসে পাঁচজন মেয়ে পাবে, কিন্তু তাদের খেলোয়াড় হতে হবে। কোন খেলার খেলোয়াড়দের জন্য চাকরিগুলো, সেটা এখনও জগন্নাথবাবু বলেননি। তবে স্বাভাবিক বুদ্ধিবিবেচনা থেকে সে ধরে নিয়েছে, রাজ্য পর্যায়ের খেলোয়াড় না হলে সরকারি চাকরি মেলে না।
”কাল মিটিংয়ে আমরা ঠিক করলাম, ওলিম্পিকে যেসব খেলা আছে তার মধ্যে থেকে ইনডিভিজুয়াল খেলার একটা—দুটো বেছে তাতেই চাকরি দেব। তুই আর্চারি কি রাইফেল শুটিং কি ব্যাডমিন্টন, এসব খেলা খেলেছিস? স্টেট মিটে চ্যাম্পিয়ান না হলেও অসুবিধা হবে না। সেকেন্ড, থার্ড পজিশন পেলেও আমরা স্পোর্টস বোর্ডে সুপারিশ করে বলব, ভবিষ্যতে এই মেয়েটির উন্নতি করার মতো সম্ভাবনা আছে। তুই এইসব খেলা—” জগন্নাথবাবু কথা অসমাপ্ত রেখে তুলসীর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
চোখ নামিয়ে তুলসী শুনে যাচ্ছিল। তার মনে হচ্ছে, কী এক অবাস্তব জগতে তার এই জগন্নাথকাকা বাস করছেন! কুলডাঙার মতো জায়গায় বাস করে যে মেয়ে, সে তিরধনুক, রাইফেল, ব্যাডমিন্টন পাবে কী করে? সে শুনেছে মাত্র এইসব খেলার কথা, পাশের বাড়ির টিভি—তে মাত্র একবার দেখেছে। শুনেছে হাজার হাজার টাকা লাগে একটা ধনুক বা রাইফেল কিনতে। ব্যাডমিন্টন খেলার কোনও ব্যবস্থাই নেই তাদের দশ বর্গ মাইলের মধ্যে।
”না কাকা, আমি এসব খেলা কখনও খেলিনি।”
”তাই তো।” জগন্নাথবাবু হতাশ হয়ে যেন ঝিমিয়ে পড়লেন। ”তা হলে আর কী খেলা জানিস?”
”সাঁতার জানি, সাইক্লিং জানি তবে কম্পিটিশনে কখনও নামিনি।” তুলসী আশাভরে তাকাল। কিন্তু জগন্নাথবাবুর মুখের ভাব বদলাল না দেখে সে দমে গেল।
”আমাদের অল ইন্ডিয়া ইন্টার সার্কেল স্পোর্টসে যে—যে বিষয়ে কম্পিটিশন হয়, শুধু সেই খেলাগুলোতেই প্লেয়ার নিয়ে থাকি। তার মধ্যে মেয়েদের সাইক্লিং নেই, সাঁতার অবশ্য আছে। কিন্তু সুইমার নিতে হলে তো আমরা নামী সুইমারই নেব।”
”নামী মানে, কীরকম নামী?” তুলসী জানতে চাইল।
”নামী মানে রেকর্ড টেকর্ড করেছে, ন্যাশনালে গোল্ড কি সিলভার পেয়েছে।”
তুলসী অপ্রতিভ হয়ে মাথা নাড়ল। সে বুঝতে পারছে জগন্নাথকাকা যা চাইছেন, তা পূরণ করা তার দ্বারা সম্ভব নয়। তবু মরিয়া হয়ে বলল, ”অ্যাথলেটিকসে তো নিতে পারেন।”
জগন্নাথ কিছুক্ষণ তুলসীর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে কী যেন ভেবে নিয়ে বললেন, ”অ্যাথলেটিকস অবশ্য ইনডিভিজুয়াল ব্যাপার, এতে আমরা মেয়ে নিতে পারি। তুই কম্পিটিশানে নেমেছিস কখনও? স্ট্যান্ড করেছিস?” এর পর তিনি অতিথি দু’জনের প্রতি মনোযোগ করলেন। ”এ কী, আপনারা এখনও শুরু করেননি? আমাদের এখানকার ক্ষীরের চমচম খুব বিখ্যাত, শুরু করুন।”
তুলসী স্কুলে পড়ার সময় বাৎসরিক স্পোর্টসে নেমে পরপর চার বছর প্রথম হয়েছে, একশো, দুশো, চারশো মিটারে। স্পোর্টসের দিন দশেক আগে, মাইলখানেক দূরের হোতরের ফুটবল মাঠে সে কিছুক্ষণ ছোটাছুটি করে নিত। আর তাতেই প্রথম হয়ে যেত। সে এটুকু অন্তত বোঝে, স্কুলের স্পোর্টসের রেজাল্ট দেখিয়ে এইসব চাকরি চাওয়া যায় না।
কিন্তু এখন সে মরিয়া একটি চাকরি পাওয়ার জন্য। তাই একটা মিথ্যা কথা বলে ভাগ্যপরীক্ষা করতেও রাজি। সূর্য সঙ্ঘের উদ্যোগে প্রতি বছর দৌড়ের রোড রেস হয়। মেয়ে—পুরুষ তাতে দৌড়য়। পথের ধারে ভিড় করে লোকে দেখে, তুলসীও দেখেছে কিন্তু দৌড়ে কখনও নামেনি। কিন্তু এখন সে বলল, ”পাঁচ মাইল রোড রেসে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়েছি।”
”আমাদের ইন্টার সার্কেলে রোড রেস হয় না, আর যা হয় না তাতে চাকরি দিই না। তবে মেয়েদের পাঁচ হাজার কি দশ হাজার কিলোমিটার দৌড় হয় কি না বলতে পারছি না। খোঁজ নিয়ে দেখি, যদি হয় তোকে খবর দেব। তবে দৌড়ের থেকে ফিল্ড ইভেন্টে, মানে জাম্পিং—এ থ্রোয়িং—এ পয়েন্ট পাওয়ার চান্স বেশি। তাই, নিলে, এইসবেতেই আমরা মেয়ে নেব। তুই ডিসকাসে কি শটপাটে কোনও মিট—এ নেমেছিস?”
