”খবরের কাগজে প্রায়ই তো দেখি, রিটায়ার করে শিক্ষকরা কেউ আট, কেউ দশ বছর পেনশন পাচ্ছেন না।” বলরাম সহানুভূতি জানিয়ে বললেন, ”তোমার বাবা নিশ্চয় ভাল শিক্ষক ছিলেন, তাই ছাত্রেরা সাহায্য করছে।”
”বাবা এখন ঘরভাড়া করে কোচিং খুলেছেন। স্কুলের ছেলেমেয়েদের পড়ান, তাতেই সংসার চলে। আগে কখনও করেননি, এখন করতে হচ্ছে বলে খুব কষ্ট পান।”
”তুমি করো কী?”
”কাজের চেষ্টা করছি। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ, চাইলেই কি চাকরি পাওয়া যায়? অনেককে বলে রেখেছি…মেসোমশাই আপনাকেও কিন্তু বলে রাখলাম।” মেয়েটির স্বরে এবার লঘুতার কোনও আভাস নেই।
”আমি খোঁজ পেলে তোমায় জানাব।” বলরামের গলায় আন্তরিকতা।
মেয়েটি এবার দাঁড়িয়ে পড়ল। আর দাঁড়াল ঠিক রামপ্রসাদ কলেজ হস্টেলের সামনেই। বলরাম মুখ না তুলেই দেখতে পেলেন দোতলার বারান্দায় গুটিতিনেক মুখ নীচের দিকে তাকিয়ে।
এক হাত উঁচু কংক্রিটের একটা চাঙড়া বহুদিনই রাস্তার ধারে পড়ে আছে। মেয়েটি তার ওপর দাঁড়িয়ে সাইকেলের সিটে বসল। লাজুক হেসে বলল, ”যখন কাগজ নিয়ে যাই তখন এইখানে এসে এইভাবেই উঠি। এমনি উঠতে গেলে ব্যালান্স রাখা যায় না, একবার পড়ে গেছলুম।…আসি তা হলে মেসোমশাই, খোঁজ পেলে বলবেন।”
বলরাম কিছু বলার আগেই মেয়েটি সাইকেল চালিয়ে দিল। প্রথম দশ—পনেরো মিটার টালমাটাল হয়ে সাইকেলটা সোজা হল এবং দূরের আলোবিহীন রাস্তার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
থাকে কুলডাঙায়, কিন্তু মেয়েটির নামটা তো জানা হল না। বলরাম নিজের বুদ্ধিহীনতায় নিজের ওপর বিরক্ত হলেন। যদি কোনও কাজের সন্ধান পান, অবশ্য না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, তা হলে ওকে খবর দেবেন কী করে? একটা উপায় অবশ্য আছে, পুরনো কাগজের দোকানি গোপালকে বলে দিলে মেয়েটি খবর পেয়ে যাবে। বেশ ভাল মেয়ে, কত সহজে ‘মেসোমশাই’ ডাকল, ঠিক নিজের মেয়ের মতোই কথা বলল।
বলরাম আরও কিছুটা হেঁটে ডানদিকে বাড়ির পথ ধরার সময় মুখ ফিরিয়ে হস্টেলের বারান্দার দিকে তাকিয়ে দেখলেন মুখগুলো তাঁকে লক্ষ করছে।
বাড়ি ফিরে বলরাম তাঁর স্ত্রী বিমলাকে বললেন, ”আজ একটি মেয়ের সঙ্গে আলাপ হল। বড় ভাল মেয়ে। বয়স খুব কম, বলুর থেকেও ছোট। খুব পরিশ্রমী।”
বলু অর্থাৎ বলাই, তাঁদের একমাত্র সন্তান। বছর দুই সে খড়্গপুর আই আই টি—তে ভূ—বিদ্যার ছাত্র। বলরাম—বিমলার সংসারে একটি কাজের মেয়ে ছাড়া আর কোনও লোক নেই। ট্রেনে নামার সময়ের ঘটনা থেকে শুরু করে দশ কেজি কাগজ হ্যান্ডেলে ঝুলিয়ে সাইকেল চালিয়ে কুলডাঙা রওনা হওয়া পর্যন্ত, মেয়েটির আচরণ ও কথাবার্তার সবকিছুর বিবরণ স্ত্রীকে দিলেন বলরাম। বিমলা সব শুনে জিজ্ঞেস করলেন, ”মেয়েটির নামটা তো বললে না?”
বলরাম মাথা অর্থাৎ টাক চুলকে বললেন, ”ওটা জিজ্ঞেস করার সময় আর পাইনি।”
”সময় কখনওই তোমার হবে না।”
যে সময়ে বিমলা এই কথা বলছিলেন ঠিক তখনই কুলডাঙায় একতলা দু’ঘরের একটি বাড়ির সামনে মেয়েটি সাইকেল থেকে নামল।
”মা, দিদি এসেছে।” ভেতর থেকে একটি ছেলে চেঁচিয়ে তার মাকে জানিয়ে দিল।
ব্যস্ত হয়ে টালির চালার রান্নাঘর থেকে মা বেরিয়ে এলেন। ”ওরে খুকি, জগন্নাথকাকা খবর পাঠিয়েছেন, আজই তোকে ওঁর সঙ্গে দেখা করতে বলেছেন।”
হ্যান্ডেল থেকে কাগজের থলিটা নামাবার জন্য সে ডাকল, ”বাবু এদিকে আয়।” তারপর ক্লান্ত স্বরে সে মাকে বলল, ”কাল সকালে গেলে হয় না?”
”বলেছেন আজই দেখা করতে। ওঁর আপিসে বোধ হয় লোক নেবে।” মায়ের স্বরে ব্যস্ততা আর ক্ষীণ একটা আশা।
মেয়েটি থলিটা ভাইয়ের হাতে দিয়ে সাইকেলটা ঘোরাল। অন্ধকার রাস্তার দিকে তীক্ষ্ন চোখে একবার তাকিয়ে নিয়ে সে সাইকেলে উঠল। জগন্নাথ সেন কেন্দ্রীয় সরকারের অফিসে উচ্চপদে চাকুরে, তাদের দূরসম্পর্কের আত্মীয়। থাকেন বিদ্যানগর স্টেশনের পশ্চিম দিকে।
এখন তাকে চার মাইল সাইকেল চালিয়ে আবার যেতে এবং ফিরতে হবে।
.
মেয়েটি যখন জগন্নাথ সেনের বাড়িতে পৌঁছল, তখন তিনি ছেলের বিয়ের ব্যাপারে ভাবী কুটুমদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। সাইকেলটা বারান্দার ধারে দেয়ালে হেলান দিয়ে রেখে সে সিঁড়ি দিয়ে দু’ধাপ উঠে বারান্দা থেকে বসার ঘরে উঁকি দিল।
”কে? কে ওখানে?” ঘরের ভেতর থেকে জগন্নাথবাবু হাঁক পাড়লেন।
”আমি তুলসী।”
মেয়েটি কুণ্ঠিত পায়ে ঘরে ঢুকল। ঘরে সোফায় দুটি লোক, তাদের মুখোমুখি আর একটি সোফায় জগন্নাথবাবু। মাঝে নিচু টেবিলে দুটি প্লেটে কিছু মিষ্টি আর চা।
”ডেকেছিলেন, জগন্নাথকাকা?”
”হ্যাঁ। দিল্লি থেকে জেনারেল ম্যানেজারের কাছে একটা চিঠি এসেছে। আমরা এবার খেলার ব্যাপারে উৎসাহ দিতে কিছু খেলোয়াড়কে চাকরি দেব।” জগন্নাথবাবু এর পর সামনের লোক দুটির দিকে তাকিয়ে বললেন, ”কিছু মনে করবেন না, আমি এর সঙ্গে একটু কথা বলে নিই।”
”না, না, মনে করার কী আছে।” ওদের একজন ব্যস্তভাবে বলে উঠলেন। ”আপনি কথা বলে নিন।”
”আমাদের মিনিস্টার তো খেলাধুলো খুবই ভালবাসেন। গতবছর ফুটবল টিম আমরা করেছি, টেবল টেনিস আর ভলিবলেও টিম হয়েছে কিন্তু সবই ছেলেদের। মিনিস্টার চান মেয়ে খেলোয়াড়দের চাকরি দিতে। বিদেশ থেকে সোনাটোনা তো ওরাই আনে।” জগন্নাথবাবু সামনের লোক দুটির দিকে তাকিয়ে শেষের কথাটি বললেন।
