”না, না, এতে মনে করার কী আছে।” নম্র স্বরে সে আশ্বস্ত করল বলরামকে। ”একজন মানুষ পড়ে যাচ্ছিলেন, তিনি অন্য একজন মানুষকে ধরে সেটা সামলালেন, এটাই তো স্বাভাবিক…ওই শশাটা, ওইটে, ওইটে, ছাড়িয়ে দিন।” শশাওয়ালাকে নির্দেশ দিয়ে মেয়েটি মুহূর্তের জন্য ইতস্তত করে বলল, ”মেসোমশাই, আপনি একটা খাবেন?”
”না, না, তুমি খাও। বড্ড পেট ভার করে। আমি ওই সময় কিছু খাই না।”
”পেট ভরিয়ে রাখে বলেই তো খাই। বড্ড খিদে পায় এই সময়টায়।” বলেই মেয়েটি হেসে উঠল। বলরাম দেখলেন দাঁতগুলো ঝকঝকে কিন্তু অসমান, আর গলার স্বরটি সুমিষ্ট নয় অর্থাৎ কম মেয়েলি।
”আমি কলা কিনব, তুমি একটা খাবে?”
”খাব।”
সঙ্গে সঙ্গে জবাব এল। বলরাম খুব খুশি হলেন। মেয়েটির মধ্যে ভান নেই। এমন মানুষের সঙ্গে কথা বলতে তাঁর ভাল লাগে।
লম্বা চার ফালি করা খোসা ছাড়ানো শশাটায় নুন ঢুকিয়ে এক টুকরো কাগজে রেখে, লোকটি তুলে দিল মেয়েটির হাতে। একটা পঞ্চাশ পয়সা লোকটির হাতে দিয়ে সে একটা ফালি তুলে কামড় দিল এবং আড়চোখে কলা কেনায় ব্যস্ত বলরামের দিকে তাকাল।
বলরাম একছড়া কলা কিনে তার থেকে দুটি কলা ছিঁড়ে বাড়িয়ে ধরলেন। মেয়েটি তাড়াতাড়ি শশার টুকরো মুখে পুরে কলা দুটো নিয়ে বলল, ”একটা দিলেই তো হত।”
”খিদে পেয়েছে বললে। এইটুকু কলা একটা খেয়ে কি কিছু হয়?”
চেইন খুলে ব্যাগের মধ্যে কলা দুটো রেখে মেয়েটি হাসল, ”পরে খাব, আগে কাগজটা কিনে নিই।”
স্টেশন রোডের দু’ধারে সারি দিয়ে নানারকমের দোকান। সাইকেল রিকশা, অটো রিকশা আর শুধুই সাইকেল রাস্তাটাকে বিশৃঙ্খল করে রাখে। সেইসঙ্গে মানুষের ভিড়ে পথচলা দায়। বাজার কিছু দূরে। ওরা ভিড় ঠেলে হাঁটতে শুরু করল।
”কাগজ, মানে খবরের কাগজ?” বলরাম জানতে চাইলেন।
”হ্যাঁ।”
বলরাম বুঝলেন, সন্ধেবেলায় খবরের কাগজ কম দামে বিক্রি হয়, তাই সকালে না কিনে অনেকেই অফিস থেকে ফেরার পথেছ কেনে। এই মেয়েটিও তাই কেনে। কিন্তু খবরের স্টল তো তারা ফেলে এসেছে, তা হলে যাচ্ছে কোথায়!
”তুমি এদিকে খবরের কাগজের দোকান তো পাবে না?” বলরাম ভুল ধরিয়ে দেওয়ার মতো স্বরে বললেন।
মেয়েটি দাঁড়িয়ে পড়ল এবং হেসে ঠিক সামনেই পুরনো খবরের কাগজ ও শিশি—বোতলের দোকানটার দিকে আঙুল তুলে দেখাল।
”আমি পুরনো কাগজ কিনব, ঠোঙা বানানো হবে।”
বলরাম মনে মনে অপ্রতিভ হলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে সামলে উঠে বসলেন, ”ঠোঙা বানানোটা কুটিরশিল্প। তুমি নিজে বানাও?”
”মা বানান। আমিও হাত লাগাই, মাঝে মাঝে ছোট ভাইও বসে।” এর পর ইতস্তত করে বলল, ”মেসোমশাই, সাইকেলটা একটু ধরবেন, আমি কাগজগুলো আনি।”
”নিশ্চয়, নিশ্চয়।”
বলরাম সাইকেলটা ধরে দাঁড়ালেন। বোধহয় আগেই বলা ছিল, ওজন করে পুরনো বাংলা খবরের কাগজ ডাঁই করে রাখা। সাইকেলের কেরিয়ারে যে বাজারের থলিটা ছিল সেটি আকারে যে কত বড়, বলরাম সেটা আগে বুঝতে পারেননি। এখন মেয়েটি দোকানির কাছে থলির মুখ খুলে ফাঁক করে ধরতে বলরাম সেটা দেখে অবাক হয়ে গেলেন। এ তো বাজারের ছোট থলি নয়, হাতে ধরে চাল বওয়ার জন্য অন্তত পনেরো কেজি—র থলি। তবে খবরের কাগজের পরিমাণ দেখে তাঁর মনে হল, পনেরো কেজি—র অনেক কমই হবে।
”মাস্টারমশাই এখন আছেন কেমন?” দোকানি জানতে চাইলেন মেয়েটির কাছে।
”সকালে তো জ্বর দেখে বেরিয়েছি। তবে পেটের যন্ত্রণাটা কমেনি।” মেয়েটি থলিটা মেঝে থেকে দু’হাতে তুলে ভেতরের কাগজগুলো ঝাঁকাল।
”ডাক্তারবাবু কী বলেন?”
”কী আর বলবেন, সেই এক কথা….অপারেশন না করলে…আমি এখন আসি গোপালদা।”
”আয়।”
মেয়েটি এক হাতে থলিটা তুলে সাইকেলের কাছে এল। শরীরটা একটু বাঁকিয়ে, দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁট টিপে ধরা।
”মেসোমশাই, সাইকেলটা একটু ধরবেন, এটা হাতলে ঝুলিয়ে দিই।”
”ওজন কত?”
”দশ কেজি।”
”যাবে কদ্দূর?”
”কুলডাঙা।”
”সেটা কোথায়?”
”এই তো, মাজাভাঙা, তারপর হোতর তারপর কুলডাঙা…মাইলচারেক।”
জবাব দিতে দিতে সাইকেলের হাতলের রডে থলিটা ঝুলিয়ে দিল।
”চাআর মাইইল যাবে এই দশ কেডি সাইকেলে ঝুলিয়ে!” বলরাম এবার যথেষ্ট অবাক হলেন।
মেয়েটিও অবাক এইরকম একটা কথা শুনে। ”কেন, আমি তো কতবার কাগজ নিয়ে গেছি!” সাইকেল হাতে ধরে সে হাঁটতে শুরু করল, তার পাশে বলরাম। আরও কিছুটা গিয়ে ডানদিকের রাস্তায় তার বাড়ি।
”রাস্তার অবস্থা যা! গর্তে ভরা, দশগজ রাস্তাও সমান নয়, তার ওপর অন্ধকার। এই রাস্তায় হ্যান্ডেলে অত ওজন নিয়ে চালাতে গেলে তো পড়ে যাবে!” বলরামের উদ্বেগ তাঁর স্বরে ফুটে উঠল।
”এখনও তো পড়িনি।” হালকা স্বরে মেয়েটি বলল।
”কাজটা তো দাদা, কাকা বা বাড়ির কোনও পুরুষ করতে পারে, তুমি একটা মেয়ে—।”
বলরাম চুপ করে গেলেন। তাঁর মনে হল একটু বেশিই যেন গায়েপড়া হয়ে যাচ্ছে।
”আমার দাদা নেই, আমিই বড়, কাকাও নেই, শুধু একটা তেরো বছরের ভাই, স্কুলে পড়ে। বাবা স্কুলমাস্টার ছিলেন। তিন বছর রিটায়ার করেছেন, কিন্তু এখনও পেনশন পাননি। ওই যে ”গোপালদা’ বললাম যাঁকে, উনি বাবারই এক ছাত্র। কাগজের দাম নিলেন না। ঠোঙা তৈরি করে গোপালদাকে দিয়ে যাব। বিক্রি করে কাগজের দাম কেটে রেখে বাকিটা আমাকে দেবেন। বাবার আরও ছাত্র আছেন, নানাভাবে সাহায্য করেন।”
