তিনি গঙ্গায় সাঁতার কাটতেন। হাটখোলায় তাঁদের ভাড়াবাড়ি থেকে আহিরিটোলা লঞ্চ ঘাট ছিল মিনিট তিনেকের পথ। সেখানে বেলা এগারোটা নাগাদ তাঁরা জনা সাত—আট ছেলে সাঁতার কাটতে যেতেন। ওপারে সালকিয়ার বাঁধাঘাটগামী ফেরি লঞ্চে উঠে মাঝগঙ্গা পর্যন্ত গিয়ে তাঁরা ঝাঁপিয়ে পড়তেন জলে, সাঁতরে ফিরে আসতেন আহিরিটোলা ঘাটে। বলরাম পিছিয়ে পড়তেন না, কিন্তু সবার আগেও থাকতেন না। মাঝারি ধরনের সাঁতারু ছিলেন। পরপর তিন বছর তিনি বালি ব্রিজ থেকে আহিরিটোলা ঘাট পর্যন্ত সাঁতার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। শেষবারে দ্বিতীয় স্থান পেয়েছিলেন একত্রিশজনের মধ্যে। যে কাপটা পান সেটা ছিল আসল রুপোর। ছোটকাকা স্যাকরার দোকানে দাম যাচাই করে এসে বলেছিলেন, ”কম করে দেড়শো টাকা তো হবেই।”
কাপটা এখন আর নেই। বিদ্যানগরে জমি কিনে, কোনওরকমে একটা দু’ঘরের বাড়ি তৈরি করে হাটখোলা থেকে দশ বছর আগে উঠে আসার সময় কাপটা হারিয়ে যায়। ট্রেনের কামরায় গাদাগাদি ভিড়ের মধ্যে চিঁড়েচ্যাপটা অবস্থাতেই বলরাম তাঁর হারানো কাপের কথা ভাবলেন।
মুঠোয় ধরার জন্য ঝোলানো হাতলগুলোয় বলরামের হাত পৌঁছয় না। তাই তিনি চেষ্টা করেন দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াতে। কিন্তু সবদিন এই সুবিধেটা তিনি পান না, যেমন আজও পাননি। এক একটা স্টেশন এলে হুড়মুড়িয়ে ট্রেনে ওঠার যাত্রীরা কামরার মধ্যে যে ধাক্কা তৈরি করে, তাতে বলরাম সিধে হয়ে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। তখন শরীর বেঁকে যায় এবং বাঁকানো শরীরটাকে সিধে করার জন্য দু’পায়ে চাপ দিয়ে পিঠ, কোমর ও কাঁধের পেশি শক্ত করে নিজেকে নিয়ে ধস্তাধস্তি করতে হয়। বলরামকে আজও তাই করতে হল। এবং এই কথার মধ্যেই তাঁর মনে হল, এটা কি গায়ের জোরের একটা পরীক্ষা নয়। রোজই তো এই পরীক্ষাটা দিচ্ছি আর পাশও করছি, তা হলে কি এটাকে ‘ছোকরা’ থাকা বলা যেতে পারে না?
বিদ্যানগরের আগের স্টেশন ঠাকুরপাড়ায় ট্রেন পৌঁছবার আগেই বিদ্যানগরে নামার যাত্রীরা দরজার দিকে এগোতে থাকে। ট্রেন থামলেই হুড়মুড়িয়ে নামতে হবে, নয়তো দুড়দাড়িয়ে ওঠা বিপরীত স্রোতের বিরুদ্ধে ট্রেন থেকে নামাটা প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে যায়। বলরাম আজ চিন্তার মধ্যে ডুবে গিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যাওয়ার কাজটা ভুলে গেলেন। যখন খেয়াল হল তখন কয়েক সেকেন্ড দেরি হয়ে গেছে। মরিয়া হয়ে তিনি দরজা দিয়ে ঢোকা যাত্রী—স্রোতের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি শুরু করলেন। তখন কে যেন তাঁর মাথায় একটা চাঁটি দিল। ট্রেনের বাইরে সবে পা রাখতে যাবেন তখন কাঁধে একটা জোর ঠেলা খেয়ে প্ল্যাটফর্মে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গড়াগড়ি গেলেন। তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াচ্ছেন, তখন আর একটা ধাক্কায় আবার পড়োপড়ো হয়ে তিনি পেছন থেকে দু’হাতে প্রায় জড়িয়ে ধরলেন যাকে, সে একটি মেয়ে।
হলুদ শালোয়ার ও খয়েরি—সবুজ নকশার কামিজ পরা মেয়েটি চমকে ঘুরে দাঁড়াল। একজন বয়স্ক লোককে কাঁচুমাচু হয়ে হাতজোড় করতে দেখে সে সঙ্গে সঙ্গে মুখে হাসি ফুটিয়ে, বলরামকে আশ্বস্ত করে ভিড়ের সঙ্গে চলতে শুরু করে দিল। ট্রেন থেকে নামা লোকের প্ল্যাটফর্মে পড়ে যাওয়া খুবই সাধারণ ব্যাপার। কেউ ফিরে তাকায় না। কিন্তু বলরামের জীবনে একটা প্রথমবার ঘটল। তিনি লজ্জিতভাবে দুপাশে তাকালেন এবং দেখলেন রামপ্রসাদ হস্টেলের দুটি ছেলে, তাদের হাতে ধরা প্লেটে ঘুগনি এবং তারা খাওয়া ভুলে তাঁর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তাদের চাউনির মধ্য দিয়ে যে খবরটা বলরাম পড়তে পারলেন, তাতে তাঁর বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। হয়তো আবার শুরু হবে, ‘গড়গড়িয়ে চলিছে বল’।
প্ল্যাটফর্মে পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ‘ছোকরা থাকা’র পক্ষে যেসব যুক্তি খাড়া করেছিলেন সেগুলো তো চুরমার হয়েই গেছিল। এখন ছেলে দুটি ব্যাপারটাকে হস্টেলে কীভাবে চাউর করবে সেটাই বলরামকে অস্বস্তির মধ্যে রাখল।
প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে চার জোড়া রেললাইন পার হয়ে স্টেশনের পুবদিকে এসে বলরাম কলা কেনার জন্য দাঁড়ালেন। তখন দেখলেন সামনের ‘মা তারা সাইকেল গ্যারেজ’ থেকে সাইকেল নিয়ে সেই মেয়েটি বেরিয়ে এল। সাইকেলটি মেয়েদের জন্য নয়। কলাওয়ালার পাশেই শশাওয়ালা। মেয়েটি শশা কেনার জন্য বলরামের পাশে দাঁড়াল এবং তার দিকে তাকিয়ে সহানুভূতি জানাবার মতো করে হাসল।
”তুমি কিছু মনে করোনি তো, মা?” বলরামের স্বরে ক্ষমাপ্রার্থনার সুর।
তাঁর মনে হয়েছে মেয়েটি বিবেচক এবং বোধ—বুদ্ধিটাও আছে। হালকা টাইপের নয়। সারা মুখ ক্লান্তিতে শুকনো, দুই গাল বসে গিয়েছে। ছিপছিপে লম্বা, কিন্তু দৃঢ় শরীর। শরীর ঘিরে কঠিন জীবনের ছাপ। কোনও প্রসাধন নেই, গহনা বলতে শুধু কানে নকল দুটি সাদা পাথরের ফুল আর হাতে রিস্টওয়াচ। মেয়েটির রং, বোঝা যায় একসময় গৌরই ছিল, এখন রোদে পোড়া, তামাটে। ওর বগলে যে ব্যাগটা, দেখতে চামড়ার মতো হলেও ওটা কমদামি নকল চামড়ার। হাতে ধরা সাইকেলটা খুবই পুরনো, কেরিয়ারে পাকিয়ে রাখা আছে একটা বাজারের থলি।
কাহিনীর শুরুতে যে পুরুষ ও মেয়েটির কথা বলা হয়েছে সেই পুরুষটি বলরাম গড়গড়ি, আর মেয়েটি হল—এখন তিনি যাকে বললেন, ”কিছু মনে করোনি তো, মা?”
