কিন্তু বাজারের কাছের রামপ্রসাদ কলেজ হস্টেলের কোনও কোনও ছেলের হাসির ইচ্ছেটা একটু বেশিই। সকালে বাজার করে থলি হাতে ফেরার সময় যখন তিনি হস্টেলের কাছাকাছি হন, তখন দোতলার বারান্দা থেকে ইদানীং কে একজন মাঝেমধ্যে সুর করে গেয়ে ওঠে :
মাথার ঊর্ধ্বে আছে মাদল
নিম্নে উতল পদযুগল
গড়গড়িয়ে চলিছে বল।
চল চল চল।।
শেষের ‘চল চল চল’—এর সময় আরও দুটো গলা যোগ দেয়। গানের সঙ্গে টিনের কৌটোয় দুটো কাঠি দিয়ে ড্রাম বাজানোর শব্দ হয়। গায়ক ও বাদককে রাস্তা থেকে দেখা যায় না। আমাদের এই লোকটির নাম বলরাম গড়গড়ি। যেভাবেই হোক হস্টেলের ছেলেরা নামটা জোগাড় করে ফেলেছে।
প্রথমদিকে বলরাম গানটিকে আমলই দিতেন না। ছেলেপুলেরা নতুন কোনও গণসঙ্গীত চর্চা করছে ধরে নিয়ে আপন মনে তিনি হস্টেলের সামনে দিয়ে চলে যেতেন। একদিন তাঁর প্রতিবেশী পান্নালাল বাজার করে ফেরার সময় তাঁকে দাঁড় করিয়ে বলল, ”শুনেছেন বলুদা, ছেলেরা কেমন প্যারডি বেঁধেছে আপনাকে নিয়ে।”
”আমাকে নিয়ে। কই, শুনিনি তো!” বলরাম খুব অবাক হয়েই বলেন, ”কেন, কী জন্য?”
”শুনুন ভাল করে, তা হলেই বুঝবেন।” পান্নালাল মুখ টিপে হেসে চলে যায়।
বলরাম হস্টেলের দিকে মুখ তুলে তাকাতেই গানটা শুরু হয়ে গেল। দু’বার শোনার পর তিনি গম্ভীর হয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলেন। ঊর্ধ্বে মাথায় বাজা মাদলটি যে তাঁরই টাক, এবং গড়গড়িয়ে যাওয়া বলটি যে বলরাম গড়গড়ি, এটা বোঝার মতো বুদ্ধি তাঁর আছে। ক্লাস এইট পর্যন্ত বিদ্যের পানু অর্থাৎ পান্নালাল যখন বুঝতে পেরেছে, তখন তাঁর মতো বাংলায় অনার্স গ্র্যাজুয়েটের না বুঝতে পারার মতো কঠিন ব্যাপার তো এটা নয়। অনার্সে নজরুলের কবিতা তাঁকে পড়তে হয়েছে।
প্রথমেই বলরামের মাথা গরম হয়ে উঠল। ভাবলেন হস্টেলে ঢুকে ছেলেগুলোকে কান ধরে ওঠবোস করাবেন। তারপর মনে হল, এই বয়সে উঠতি জোয়ানদের কান ধরা তাঁর পক্ষে কি সম্ভব হবে? গায়ে ততটা জোর নিশ্চয়ই নেই। আগে নিজের শক্তি যাচাই করে তবেই কান ধরার মতো কাজে নামা উচিত।
কীভাবে গায়ের জোর যাচাই করা যায়। বলরাম খুবই ফাঁপরে পড়ে গেলেন। তিনি চাকরি করেন বিধাননগরে সরকারি অফিসে। বিদ্যানগর থেকে, যদি ঠিকমতো ট্রেন চলে তা হলে আধঘণ্টা ট্রেনে কাটিয়ে নামেন বিধাননগর স্টেশনে। সেখান থেকে বাসে অফিসে। তাঁর সহকর্মী মনোজ সামন্ত খুবই বিজ্ঞ লোক। বলরাম তাঁকেই জিজ্ঞেস করলেন, ”সামন্ত বলতে পারো, গায়ের জোর পরীক্ষার উপায় কী?”
মনোজ সামন্তর এরকম প্রশ্ন শুনে অবাক হওয়ারই কথা, কিন্তু তিনি হলেন না। শুধু বললেন, ”কোনও ভারতশ্রী’র সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে বসুন।”
”তাতে তো হেরে যাব।” বলরামকে হতাশ দেখাল।
”তা তো হারবেনই, কিন্তু কতক্ষণে হারবেন সেটা দিয়ে পরিমাপ হবে আপনার গায়ে কতটা জোর রয়েছে।”
”ধরুন এক সেকেন্ডে হারলাম।”
”গড়পড়তা সবাই ওই এক সেকেন্ডেই হারবে। সুতরাং আপনার গায়ের জোরও ওই গড়পড়তা সবার মতোই ধরে নেবেন।”
”এটা তুমি কী বললে!” বলরাম অখুশি হলেন। ”এইভাবে পাঞ্জা লড়ে কি শক্তি মাপা যায়?”
”তা হলে কীভাবে মাপতে চান? আর মাপতে চাওয়ার উদ্দেশ্যটাই বা কী?”
বলরাম একটু বিব্রত হলেন। উদ্দেশ্য তো ক’টা ছেলেকে কান ধরে ওঠবোস করানো। কিন্তু কেন করাতে চান, সেটা কি সামন্তকে বলা ঠিক হবে?
তবে ঘুরিয়ে অন্যভাবে অবশ্য ব্যাপারটা বলা যায়। এই ভেবে বলরাম বললেন, ”আমাদের বিদ্যানগরে একটা কলেজ হস্টেল আছে, সেখানে কিছু অ্যান্টিসোশ্যাল ছেলে ঢুকেছে। ওদের জন্য লোকজন রাস্তা দিয়ে হাঁটতে পারে না।”
”কেন পারে না?”
”নানারকম কথাবার্তা বলে, ফিল্মের গান গায়, রাস্তার মাঝে অসভ্যতা করে।”
”হস্টেল সুপারকে গিয়ে বলুন। তিনি কিছু না করলে থানায় গিয়ে বলুন।” মনোজ সামন্ত ঈষৎ বিরক্ত স্বরে বললেন, ”আপনি কি এজন্য মারপিট করবেন?”
”মারপিট! কে বলল?” বলরাম সচকিত হয়ে উঠলেন।
”তা হলে গায়ের জোর পরীক্ষা করে দেখতে চান কেন? গড়গড়িদা সাবধান করে দিচ্ছি, খবরদার ছেলেছোকরাদের সঙ্গে লাগতে যাবেন না। একটা টিঙটিঙে ছোকরা দূর থেকে যদি বোমা ছোড়ে কি পাইপগান চালায় তা হলে কী করবেন? গায়ের জোরের দিন আর নেই, সুতরাং—” মনোজ সামন্ত একটা মোটা ফাইলের ফিতে খোলার কাজে ব্যস্ত হয়ে কথাটা শেষ করতে পারলেন না।
বলরাম তাকিয়ে রইলেন সামন্তর দিকে। ‘সুতরাং’ বলে থেমে গেল কেন? আড়চোখে বলরামের মুখ দেখে নিয়ে সামন্ত আবার বললেন, ”বুড়োবয়সে গায়ের জোর পরীক্ষা করে লাভ কী?”
”বুড়োবয়স মানে? আমি কি বুড়ো হয়ে গেছি?” বলরাম অবাক হয়ে সামন্তকে যেন চ্যালেঞ্জ জানালেন।
চোখ কুঁচকে মনোজ সামন্ত সেকেন্ড দশেক বলরামের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার পর মুচকি হেসে বললেন, ”না, বুড়ো হননি, ছোকরাই আছেন। বয়স কত হল?”
সেইদিন বিকেলে ট্রেন ধরার জন্য প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে বলরামের মনে হল, সামন্ত বোধ হয় ঠিক কথাই বলেছে। বুড়োবয়সে কেউ কি গায়ের জোর পরীক্ষা করে? কিন্তু একটা কথা তাঁর মনে কাঁটার মতো খচখচ শুরু করল। বিদ্রূপ করেই অবশ্য সামন্ত বলল, ‘ছোকরাই আছেন’—কিন্তু থাকব নাই—বা কেন?
এই ‘থাকব নাই—বা কেন’ কথাটা বলরামের মাথার মধ্যে এমনভাবে গেঁথে গেল যে তিনি ট্রেনে উঠে মনে করতে শুরু করলেন তিরিশ—পঁয়ত্রিশ বছর আগে ছোকরা বয়সে কী কী করতেন। তিনি ফুটবল—ক্রিকেট খেলেননি। কবাডিও নয়। কোনও দলগত খেলার দলে ঢুকতে পারতেন না শুধু এই দৈহিক উচ্চতার জন্য, তাই ওইসব খেলার দিকে যাননি। যে খেলা একা খেলা যায় এবং নিখরচায়, তিনি সেই খেলার দিকেই ঝোঁকেন।
