”এখুনি টেলিফোন করে বলে দিন, নাকুকে যেন পৌঁছে দিয়ে যায়, নইলে—” এবার দুটো তালু সাঁড়াশির মতো ঘুনুর ঘাড়ে এঁটে বসল। ”আমার শরীরে অল্পস্বল্প জোর আছে। এই ঘাড়টা ইচ্ছে করলেই—”। দশটা আঙুলের ব্যূহ ছোট হয়ে এল ঘুনুর শীর্ণ গলাটি ঘিরে।
এবার আর আর্তনাদ নয়, চাপা কান্নার মতো আওয়াজ হতেই হুঁশ ফিরে এল শ্যামলার। এগিয়ে এসে রেখা গুপ্তকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ধমকে উঠল, ”পিসি, তুমি কি পাগল হলে? এখনি দমবন্ধ হয়ে মরে যেত।” তারপর ঘুনুকে মিনতির সুরে সে বলল, ”কাকাবাবু, পিসিকে থামানো যাবে না। আপনি ওর কথা শুনুন, ফোন করে দিন।”
ঘুনুর চোখ বন্ধ, মুখ থেকে কথা বেরোচ্ছে না। শুধু মাথাটা নাড়লেন।
”ফোন করবেন?”
”হ্যাঁ। আমার হাতে কোনও জোর নেই, নাড়াতে পারছি না।” হাঁপাচ্ছেন। দুই চোখে ছেয়ে রয়েছে আতঙ্ক।
”আপনি বসুন, আমি ডায়াল করে রিসিভারটা আপনাকে দিচ্ছি।”
শ্যামলা যখন ডায়াল করছে, রেখা গুপ্ত তখন প্রায় ছুটেই কানুর ঘরে চলে গেলেন।
”হ্যালো, এটা কি পতু ঘোষের বাড়ি?… একটু ধরুন, ঘুনুদা কথা বলবেন… হ্যাঁ ঘুনু মিত্তির।”
রিসিভারটা ঘুনুর হাতে তুলে দেওয়ার সময় শ্যামলা মুখ ঘুরিয়ে ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখল, চাদরে নিজেকে ঢেকে নিয়ে পিসি বিছানায় উপুড় হয়ে। ফুলে ফুলে উঠছে পিঠ।
”কে, মানু নাকি?… শোন, নাকু কোথায়?… আচ্ছা, ওকে এখনি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যা।” ঘুনু আড়চোখে শ্যামলার মুখটা দেখে নিলেন। শ্যামলা মাথা নাড়ল। ”একটা ট্যাক্সি করে নে, ওর যা জিনিস আছে সে সবও যেন নিয়ে আসে। তাড়াতাড়ি করিস, নইলে—”। ঘুনু রিসিভারটা তুলে দিলেন শ্যামলার হাতে।
”কাকাবাবু আপনি একটু চা খান, আমি করে আনছি।”
ঘুনু সামনের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইলেন কথা না বলে। তারপর ধীরে ধীরে মাথাটা নামিয়ে টেবিলে কপাল রাখলেন। শ্যামলা রান্নাঘরে গেল। তখন নাকুর ঘরের দরজার একটা পাল্লা সন্তর্পণে খুলে পা টিপে টিপে তিনজন বেরিয়ে এলেন। ফটক পার হয়েই বেগিংয়ের থেকে দ্রুত গতিতে তাঁরা বাড়ির পথ ধরলেন।
.
”…আই সি ফ্লাইট নাম্বার সেভেন সেভেন ওয়ান ফর বাঙ্গালোর আর রিকোয়েস্টেড টু প্রসিড…” সিকিউরিটি চেকিংয়ের জন্য ঘোষণা হচ্ছে।
শ্যামলা তাড়া দিল, ”দাদা লাইন পড়ে গেছে।”
”পড়ুক।” সমীরণ ব্যস্ততা না দেখিয়ে বইয়ের দোকানের দিকে এগোল। ওখানে খবরের কাগজও বিক্রি হয়। সাড়ে পাঁচটা এখন। এত ভোরে এয়ারপোর্টে কাগজ পাওয়া যাবে কি না তাই নিয়ে সে উদ্বিগ্ন থাকায় লক্ষ করেনি লোকটিকে।
”দাদা।”
শ্যামলার দৃষ্টি অনুসরণ করে সমীরণ অবাক হয়ে দেখল, লাউঞ্জের একটা চেয়ারে ঘুনু মিত্তির বসে রয়েছেন। কোলে ব্রিফ কেস। বাঁ হাতের কনুইয়ের মোটা ব্যান্ডেজ, হাতটা গলায় বাঁধা ব্যান্ডেজে ঝুলিয়ে বুকের কাছে তুলে রাখা। ঘুনু তাদের দিকেই নির্বিকার মুখে তাকিয়ে রয়েছেন। ”আপনি এখন এখানে?” সমীরণ বলল।
”খাংমাকে ধরতে যাচ্ছি। আমার প্লেন আটটা—চল্লিশে, একটু আগেই এসে গেলাম।… তুই সত্যি সত্যিই বাঙ্গালোর যাচ্ছিস, না ধাপ্পা মেরে বটার ঘরে উঠছিস সেটা তো দেখতে হবে।” ঘুনু মিত্তিরের গলায় কোনওরকম আবেগ নেই। বারো ঘণ্টা আগে যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, মনে হচ্ছে না তার কণামাত্রও তিনি মনে করে রেখেছেন।
”ট্যুর থেকে ফিরে এসেও তো দাদা সই করতে পারবে আর করলে পিসি যা বলেছে, সেই ক্লাবেই করবে। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।” অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য হাঁসফাঁসানিটা শ্যামলার গলা থেকে বেরিয়ে এল।
”তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে বলছ?” ঘুনু মিত্তিরের মুখের নির্বিকারত্ব মুছে গিয়ে হাসি ফুটে উঠল।
”ভি আই পি রোডের ওপর নিলডাউন হয়ে থাকার থেকে আপনার হাতে ধরা দেওয়া অনেক ভাল।” সমীরণের মুখও নিঃশব্দ হাসিতে ভরে গেল।
ঘুনু মিত্তির ডান হাতটা সেলামের ভঙ্গিতে কপালে ঠেকিয়ে বললেন, ”তোর পিসিকে নমস্কার।”
সিকিউরিটি চেকিংয়ের জন্য দ্বিতীয় ডাক শোনা গেল।
”নাকু, একটা কথা বলে রাখি, তোর কাছে দেশ যেমন বড়, আমার কাছে তেমনই ক্লাব… আমি ক্লাবের কাজ হাসিল করার জন্য নিজেকে যতটা ঢেলে দিই, আশা করব তুইও দেশের কাজটা সেইভাবে করবি।” তারপরেই চোখ টিপে নিচু গলায় বললেন, ”কিন্তু, পা বাঁচিয়ে।”
তুলসী
তুলসী – মতি নন্দী – কিশোর উপন্যাস
এই কাহিনীতে বলা হয়েছে দুটি মানুষের কথা। তাঁদের একজন পুরুষ ও অন্যজন মেয়ে। পুরুষটির বয়স ষাটের কাছাকাছি। মেয়েটির বয়স প্রায় কুড়ি।
প্রথমে পুরুষটির কথা বলি। ওঁর দৈহিক উচ্চতা পাঁচ ফুট। দেহের পেশিগুলো একটু ভারী। ঘাড় ও গলা ছোট হওয়ায় তাঁকে ঘাড়ে—গর্দানে দেখায়। মনে হয় অল্প বয়সে ব্যায়াম করেছেন এবং হয়তো এখনও চর্চাটা রেখেছেন। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যাম। চোখে পড়ার মতো বিশেষ কিছুই ওঁর চেহারায় নেই, শুধু উচ্চতাটুকু ছাড়া। তবে বেঁটে মানুষ আমাদের দেশে লক্ষ লক্ষ আছে, সুতরাং এটা কোনও বিশেষত্ব হিসেবে গণ্য হতে পারে না। ওঁর যে মসৃণ টাকটি, সেটাও বহু লক্ষ লোকের মাথায় দেখা যায়। তবে মাথার খুলির গড়ন গোলাকার হওয়ায় টাকটি দু’নম্বর ফুটবলের কথা মনে পড়ায়।
এই লোকটির বিশেষত্ব বলে যদি কিছু থাকে তা হলে সেটি হল, ওঁর হাঁটা। হাঁটেন অতি দ্রুত। সাধারণ মানুষ জগ করে যে গতিতে, ইনি হাঁটেন সেই গতিতে। ওঁর উচ্চতার সঙ্গে হাঁটার বেগ, দুটো মিলিয়ে দাঁড়ায় একটা বেমানান দৃশ্য। যেটা হাসি পাইয়ে দেওয়ার জন্য খুবই কার্যকর হয়। যারা ওঁকে প্রথম দেখে, তারা আড়ালে হাসাহাসি করে। তবে প্রতিদিন দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর তারা আর হাসে না।
