”তা হলে যাও না অন্য ক্লাবে।” হরিচরণ চেঁচিয়ে উঠল। ”ওই তো পাশেই একটা ক্লাব রয়েছে।”
”তাই যাব, তাই যাব।”
ক্ষিতীশ হনহন করে এগিয়ে গেল অ্যাপোলোর দিকে। পিছনে জমে যাওয়া ভীড়টাকে উদ্দেশ্য করে প্রফুল্ল বলল, ”পাগল মশাই, পাগল।”
অ্যাপোলোর গেটে পৌঁছে সংবিৎ ফিরল ক্ষিতীশের। দাঁড়িয়ে পড়ে নিজের প্রতি অবাক হয়ে ভাবল, এখানে আমি এলাম কেন? এরা তো জুপিটারের শত্রু। আমি নেমকহারাম হলাম!
ক্ষিতীশকে দেখতে পেল অ্যাপোলোর অন্যতম ভাইস—প্রেসিডেন্ট নকুল মুখুজ্জে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেটের কাছে এসে বলল, ”কি ব্যাপার, ক্ষিতীশ যে! তুই এখানে?”
হঠাৎ ক্ষিতীশের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, ”তোমাদের এখানে জায়গা হবে নকুলদা! জুপিটার আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে।”
”যাঃ কি আজেবাজে বকছিস। তোকে তাড়াবে কে?”
”সত্যি বলছি নকুলদা, তাড়িয়ে দিয়েছে। আমায় টাকা পয়সা দিতে হবে না। একটা মেয়ে পেয়েছি, তাকে শেখাবার সুযোগটুকু দিও তা হলেই হবে।”
”ভেতরে আয়, আগে সব শুনি।”
”তার আগে বলে রাখি, আমি কিন্তু জুপিটারের লোক, অ্যাপোলো কোনদিনই আমার ক্লাব হবে না।”
”তাহলে তোকে আমরা নোব কেন?”
”আমাকে নয়, মেয়েটাকে নাও। আমি ওকে শেখাব। ও যদি সম্মান আনে তাহলে সেটা হবে অ্যাপোলোর।”
”আচ্ছা আচ্ছা, ভেতরে চল।”
”আগে বলো, আমার শর্তে রাজী! অ্যাপোলোর তুমিই সব, তোমার কথায় ক্লাব ওঠে বসে। তুমি কথা দিলে তবেই ঢুকব।”
নকুল মুখুজ্জে কিছুক্ষণ স্থির চোখে ক্ষিতীশের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল ”তোর জুপিটার থেকে বেরিয়ে আসা মানে আমাদের শত্রুর দুর্গের একটা খিলেন ভেঙ্গে পড়া। অ্যাপোলোর ছাদের নীচে যদি তুই আসিস, সেটাই আমাদের ভিকট্রি হবে। আচ্ছা কথা দিলাম।”
গেট অতিক্রম করার আগে ক্ষিতীশ একবার পিছন ফিরল। কমলদিঘির জলে ছায়া পড়েছে পশ্চিমের দেবদারু আর রাধাচূড়া গাছের। জুপিটারের বিরাট ঘড়িটার কালো ডায়ালে কাঁটা দুটো আবছা লাগল ক্ষিতীশের পুরু লেনসে। বুকের মধ্যে প্রচণ্ড একটা মোচড় সে অনুভব করল। চিকচিক করে উঠল চোখ দুটো।
সেই রাতে ঘুম এল না ক্ষিতীশের। বারান্দার দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে রাতটা কাটাল। বারবার একটা কথাই তার মনে পাক দিয়ে ফিরল : ”আমি কি ঠিক কাজ করলাম? অ্যাপোলোয় যাওয়া কি উচিত হল?”
ভেলো উত্তেজিত হয়ে হাজির হল সকালেই।
”ক্ষিদ্দা, তুমি অ্যাপোলোয় জয়েন করেছ? বেশ করেছ। তোমাকে তো সেই কবে বলেছিলুম এটা হল যুদ্ধ। ন্যায়—অন্যায় বলে যুদ্ধে কিছু নেই, শত্রু—মিত্র বাছ—বিচার করে কোন লাভ নেই।”
ক্ষিতীশ চুপ করে রইল।
”জুপিটারকে এবার শায়েস্তা করা দরকার। বুঝলে ক্ষিদ্দা, তুমি শুধু ওই নাড়ির সম্পর্ক—টম্পর্কগুলো একটু ভুলে যাও…”
”ভেলো!”
ক্ষিতীশের একটা হাত তোলা। চোয়াল শক্ত। পুরু লেনস ভেঙ্গে চোখ দুটো যেন বেরিয়ে আসবে। ভেলো এক পা পিছিয়ে গেল।
”আর একটা কথা যদি বলেছিস তো—”
ভেলো বিড়বিড় করে বলল, ”আমার ভুল হয়ে গেছে। আমায় মাপ করো ক্ষিদ্দা।”
।। ৭ ।।
”না না, না, কতবার বলব কনুইটা অতটা ভাঙ্গবে না—হাতটা অমন তক্তার মতো লাফিয়ে উঠল কেন? উহুঁ উহুঁ… হল না, বাঁ হাতটা এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে বাঁ কাঁধটাও এগোচ্ছে আর ডান কাঁধটা পিছিয়ে যাচ্ছে, এতে স্কোয়ার শোল্ডার পোজিশানটা যে ভেঙ্গে যাচ্ছে… নে নে, আবার কর…ওকি! জলের বাইরে হাত নিয়ে যাবার সময় শরীরের পাশের দিকটা বেঁকে তেউড়ে শুঁয়োপোকা চলার মতো হয়ে যাচ্ছে যে!..দ্যাখ আমাকে দ্যাখ। তোর কনুইটা কেন বাঁক খাচ্ছে না বোঝার চেষ্টা কর…এইভাবে, এই রকম। আর হাতের আঙুল জল টানবার সময় ফাঁক করবি না। জলের ওপর থাবড়ে থাবড়ে হাত ফেলিস দেখেছি, ওভাবে নয়। পরিষ্কারভাবে সোঁত করে ঢুকে যাবে। আগে আঙুল তারপর কব্জি থেকে পুরো হাতটা । আর নিঃশ্বাস নেওয়াটা ভালো করে বুঝে নে। যদি ডান দিকে মাথা ঘুরিয়ে নিঃশ্বাস নিস, তাহলে বাঁ হাতটার কব্জি যখন জলে ঢুকছে তখন মাথা ঘোরাবি। মাথা নিচু রাখার জন্য থুতনিটা বুকের দিকে টেনে রাখবি। মাথার লাইন এধার—ওধার হবে না। ডান হাতটা যখন উঠবে তার তলা দিয়ে উঁকি দেবে হাঁ করে নিঃশ্বাস নিতে নিতে। আর ডান হাত যেই জলে ঢুকছে সেই সঙ্গে তোর মুখও আবার জলে ডুবছে। যা যা আবার কর। দু’হপ্তা হয়ে গেল এখনো একটা জিনিসও ঠিক মতো করতে পারলি না।”
জলের ধারে সিমেন্ট বাঁধানো সরু পাড়ে দাঁড়িয়ে ক্ষিতীশ সমানে বকবক করে চলেছে। কোনি পাড়ের ধারে খানিকটা সাঁতরায় আর থেমে থেমে ওর দিকে তাকায়। সকাল সাড়ে ছ’টা থেকে এই ব্যাপার চলেছে। এখন সাড়ে আটটা।
”আর পাচ্ছি না ক্ষিদ্দা”
”কেন! বলেছিলি দু দিনেই সুহাসের মতো স্ট্রোক শিখে নিবি। দু’দিন ছেড়ে তো সতেরো দিন হয়ে গেল।”
জলের মধ্যে দাঁড় সাঁতার কাটতে কাটতে কোটি চাপা রাগ নিয়ে বলল, ”করছি তো আমি। আপনি খালি হচ্ছে না হচ্ছে না বলেই যাচ্ছেন।”
”না হলে কি বলব, হচ্ছে?”
”হচ্ছেই তো।”
”কিচ্ছু হয়নি। যা বলছি আবার কর।”
”আমার ভাল লাগছে না।”
কোনি পাড়ের দিকে এগিয়ে এল। ক্ষিতীশ কি করবে ভেবে না পেয়ে বলল, ”স্ট্রোক শিখলে কিন্তু নাইলন কস্ট্যুম দেবো।”
”দরকার নেই আমার।”
বাঁধানো পাড়ে দু’হাতের ভরে কোনি জল থেকে উঠে এল। ক্ষিতীশ বুঝতে পেরেছে ওকে খাটাতে হলে জোরজবরদস্তিতে কাজ হবে না। কিছু একটা প্রাপ্তিযোগ না থাকলে ওকে উৎসাহিত করা যাবে না।
