সঙ্গে দুটো লোক! শ্যামলা রীতিমতো ঘাবড়ে গেল। এটা তো হিসাবের মধ্যে রাখা হয়নি। লোক দুটো যদি অপেক্ষা করে করে ঘুনু মিত্তিরকে বেরিয়ে আসতে না দেখে তখন তো খোঁজ করতে বাড়ির মধ্যে আসবে। সঙ্গে নিশ্চয় চেম্বার আছে। প্লেয়ার তুলতে এসব তো সঙ্গে রাখতেই হয়। তা হলে উপায়?
শ্যামলা দৌড়ে কানুর ঘরে এসে দেখল চাদর ঢেকে শুয়ে থাকার বদলে পিসিমা খাটের ওপর কাঠ হয়ে বসে, হাতে চাদর।
”সব্বোনাশ হয়েছে পিসি, লোকটার সঙ্গে আরও দুটো লোক। তারা অবশ্য গাড়িতেই বসে।”
ডোর—বেল বাজল।
”মলা আমি কী করব?” করুন মুখে রেখা গুপ্ত বললেন।
”যা বলা হয়েছে তাই করো, চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ো।” শ্যামলা ঠেলা দিয়ে রেখা গুপ্তকে বিছানার ওপর ফেলে চাদর দিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে দিল।
দ্বিতীয়বার বেল বাজার সঙ্গেই দরজা খুলল শ্যামলা। ”ওহ আপনি এসে গেছেন।” গলা নামিয়ে এর পর বলল, ”খুব টায়ার্ড, ও ঘরে ঘুমোচ্ছে। আপনি এখন এখানেই বসুন।”
”সব বন্ধ কেন, অন্ধকার অন্ধকার লাগছে।” ঘুনু মিত্তির চেয়ারে বসলেন হাসি হাসি মুখে। ”তুমি মা খুব বুদ্ধিমতী। ছেলে হলে তোমাকে ট্রেনিং দিয়ে যাত্রীর রিক্রুটিং অফিসার করে নিতাম। এমন সব বোকাহাবাদের নিয়ে কাজ করতে হয়। বিনু জন যে কলকাতায়, এটা তুমি না জানালে আমি জানতেই পারতাম না।”
”ওকে এখন কোথায় নিয়ে যাবেন?”
”দেখি কোথায় রাখা যায়।”
”কিন্তু ও তো সারথিতে খেলবে বলে এসেছে, আপনার সঙ্গে যাবে কেন?”
”আহা আমি তো সারথিরই লোক।” ঘুনু মিত্তির ইঙ্গিতপূর্ণ চোখ টিপলেন। ”ও কি আর চেনে কে যাত্রীর আর কে সারথির! সইসাবুদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ও আমাদের কাছে থাকবে।”
”যেমন দাদাকে আপনারা রেখে দিয়েছেন। কিন্তু কাকাবাবু, দাদাকে এই মুহূর্তেই যে আপনাকে ছেড়ে দিতে হবে। বাঙ্গালোর থেকে আজ ট্রাঙ্ককল এসেছে, ইন্ডিয়া টিম চেকোশ্লোভাকিয়া ট্যুরে যাচ্ছে। দাদাকে এক্ষুনি বাঙ্গালোর ফিরে যেতে হবে। সুতরাং সমীরণ গুপ্তকে এখনই বাড়িতে পাঠিয়ে দিন, কাল ভোরের ফ্লাইটে সে বাঙ্গালোর যাবে।”
”ইম্পসিবল। নাকুকে আমি ছাড়ব না। ইন্ডিয়া ক্যাপ্টেন হয়ে, ইন্ডিয়ার হয়ে খেলে ওর কি ল্যাজ গজাবে?” কী পাবে ও? তোমরা অত দেশ দেশ করে চ্যাঁচাও কেন? চেকোশ্লোভাকিয়ায় গিয়ে দশটা ম্যাচ খেলে তো চল্লিশটা গোল খেয়ে আসবে। ক’টা টাকা পাবে দেশের হয়ে খেলে? এসব চিন্তা ও ছাড়ুক। তার থেকে ক্লাবে খেলুক, টাকা কামাক, অর্জুন ফর্জুন হোক, তারপর কোচিংয়ে নামুক। তাতেও ভাল পয়সা, অফিসেও উন্নতি করুক, অফিসার হোক ব্যস বাঙালির ছেলের জীবনে আর কী চাই?”
”হ্যাঁ, আরও চাই। মনের গভীরে একটা সুখ, যেটা লাখ টাকা আয় করেও মেলে না। এটা আমার নয়, দাদার কথা। আপনি আমার দাদাকে এনে দিন।”
”নাকু আমার অনেকদিনের টার্গেট, ওর আশা আমি ছেড়েই দিয়েছিলাম। ভগবান যখন পাইয়ে দিয়েছেন তখন আর হাতছাড়া করব না।”
”সেক্ষেত্রে, আপনিও আর এ—বাড়ির বাইরে যেতে পারবেন না।” শ্যামলা দাঁড়িয়ে কথা বলছিল এবার চেয়ারে বসল।
”তার মানে?”
”যেভাবে দাদাকে আটকে রেখেছেন, সেইভাবে আপনিও এই বাড়িতে আটকা থাকবেন। সে ছাড়া পেলে আপনিও পাবেন।”
”তা হলে বিনু জনের ব্যাপারটা ধাপ্পা?”
”পুরোপুরি।”
”তা হলে জেনে রাখো, নাকুকে আমি ছাড়ব না। তোমরা যা করতে পার করো।”
”তা হলে যেটা পারি তা হল, একটা একটা করে আপনার হাত, পা আমি ভাঙব, চোখ দুটো উপড়ে নেব।”
ঘুনু মিত্তির আর শ্যামলা চমকে চেয়ার থেকে উঠে ঘুরে দাঁড়াল। রেখা গুপ্ত ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। তাঁর দু’চোখে ঠান্ডা চাহনি। অত্যন্ত ঠান্ডা চাহনি। ঘুনু মিত্তিরের দু’হাতে কাঁটা উঠল। ঘাড়টা সিরসির করছে।
”নাকুর জীবন যাত্রীর নয়, সারথির নয়, আপনার নয়, আমারও নয়, নাকুর জীবন নাকুরই। সেই জীবন যা চায় তাই—ই করবে। আপনি তা করতে দেবেন না। তা হলে আমিও—”। রেখা গুপ্ত দু’হাতে ঘুনু মিত্তিরের কলার ধরলেন, ”আমিও আপনার স্বাধীনতা কেড়ে নেব।”
একটা হ্যাঁচকা টানে ঘুনু মিত্তির টেবিলে মুখ থুবড়ে পড়লেন। তাঁর দুটি হাত পিছমোড়া করে ধরে একটু ঝুঁকে ঘুনুর কানের কাছে মুখ এনে, রেখা গুপ্ত বরফের মতো গলায় বললেন, ”প্রথমে দুটো হাত, তারপর দুটো পা। সারাজীবনের মতো পঙ্গু হয়ে থাকতে হবে।” বলেই তিনি হাতে মোচড় দিলেন।
ঘুনু মিত্তির যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠলেন। শ্যামলা চোখ বন্ধ করে ফেলল। পিসির এই মূর্তি সে আগে কখনও দেখেনি। নাকুর ঘরের দরজার পাল্লা ঈষৎ ফাঁক হল এবং বন্ধ হয়ে গেল।
”আমার দুটো ছেলেকে মোটরে রেখে এসেছি, আমি কিন্তু এবার চ্যাঁচাব।”
”তা হলে ঘাড় মটকে দিয়ে চেঁচানি বন্ধ করে দেব।” রেখা গুপ্ত কথার সঙ্গে সঙ্গে হাতে আবার মোচড় দিলেন। আবার আর্তনাদ।
”ফুটবল টুটবল আমি বুঝি না। এই তিনটে ছেলেমেয়েকে অনেক কষ্টে বড় করেছি। এরা আমার বুকের তিনটে পাঁজর। এর একটা ভেঙে দিলে আমি মরে যাব। আর জেনে রাখুন, মরতে যদি হয় তা মেরে মরব, ফাঁসিতে যেতে হয় তো যাব।”
তাঁর গলার দু’পাশের পেশি ফুলে উঠেছে। রক্ত জমে মুখ লাল। চোয়ালের হাড় উঁচু হয়ে রয়েছে দাঁতে দাঁত চাপার জন্য। রেখা গুপ্ত শেষবারের মতো একটা মোচড় দিয়ে ঘুনু মিত্তিরকে ছেড়ে দিলেন। ঘুনু নিথর হয়ে টেবিলের ওপর থুবড়ে পড়ে রইলেন। দুটো হাত ঝুলছে।
