”কাকাবাবু, আমি এখানকার ভটচাযবাড়ি থেকে ফোন করছি।… কী বললেন? বিনু সম্পর্কে আর ইন্টারেস্টেড নন? অ, আচ্ছা…না না আমাকে ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই, ভাবলাম যাত্রীর যদি এতে লাভ হয়, অন্তত ওকে আটকে রেখেও সারথিকে বঞ্চিত করে… হ্যাঁ, নমস্কার।”
শ্যামলা হতাশ চোখে সবার দিকে তাকিয়ে রিসিভার রাখল। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন রেখা গুপ্ত। ভটচায মাথা চুলকোচ্ছেন, মালবিকা কপালে ঠুকলেন হাতের মুঠি। জি. সি. দত্ত ”ঘোঁত” ধরনের একটা শব্দ মুখ থেকে বের করে কী একটা বলতে যাচ্ছেন তখনই ফোন বেজে উঠল।
শ্যামলা রিসিভার তুলতে যাচ্ছে, ভটচায চিৎকার করে উঠলেন, ”না, না, তুমি নও। হয়তো ঘুনু মিত্তিরই ফোন করে তোমার কথাটা যাচাই করতে চায়। মিস গুপ্ত, আপনি ধরুন, বলবেন বিনু জন এখন বাড়ি নেই, রান্না—করা কিছু নেই, কানু ওকে খাওয়াবার জন্য ‘তারামা’য় নিয়ে গেছে। মহা ঘাঘু লোক, এটা মনে রাখবেন।”
”মিথ্যে কথা বলব?” রেখা গুপ্ত অসহায়ভাবে তাকালেন।
”হ্যাঁ মিথ্যে বলবেন, নাকুর জন্যই বলবেন।” জি. সি. দত্ত—র দারোগাগর্জনে তিনটি হৃৎপিণ্ড ধড়াস করে উঠলেও চতুর্থজন সটান হয়ে ফোনের দিকে এগিয়ে গেলেন।
”হ্যালো… ওহ নমস্কার, আমি নাকুর পিসিমা বলছি।… ফোন ধরার তো কেউ নেই, আমি শয্যাশায়ী, কাল ছাদ থেকে নামবার সময় আমি নিজেই পড়ে গিয়ে… এখন একটু ভাল আছি। সকালে উঠতে পারিনি, রান্নাবান্নাও কিছু হয়নি, এদিকে নাকুর এক বন্ধু, কী যেন নাম বলল পিনু না বিনু, সে এসে হাজির। ঘরে খাবারদাবার নেই, তাই কানুকে বললাম তারামা থেকে কিছু এনে দে, বেচারা কখন প্লেনে উঠেছে, উপোস করে আছে… ছেলেটি তো এখন বাড়ি নেই, কানুর সঙ্গে বেরিয়েছে। বাঙালির মিষ্টি কত রকমের, কেমন চেহারার হয় দেখার খুব ইচ্ছে, তাই ওর সঙ্গে দোকানে গেছে। মলাটাও যে শুট করে কোথায় বেরোল। তা কী জন্য ফোন করছেন? নাকু ভাল আছে তো?… অ, আচ্ছা আচ্ছা, কানুকেই বলব পিনু জনকে যাহোক করে বসিয়ে রাখতে, আপনি এসে ওকে নিয়ে যাবেন… নমস্কার।”
রেখা গুপ্ত কাঁপা হাতে রিসিভারটা রাখার সঙ্গে সঙ্গে শ্যামলা ”পিসি… গো—ও—ও—ল।” বলে দু’হাত তুলে ভাংরা নাচের মতন শরীরটা ঝাঁকাল।
মালবিকা জড়িয়ে ধরলেন রেখা গুপ্তর দুটি হাত। ”আমি এতক্ষণ ভগবানকে ডাকছিলাম, হে ভগবান রেখা যেন গুছিয়েগাছিয়ে মিথ্যে কথাটা বলতে পারে।”
”মনে হচ্ছে খুব আন্তরিকভাবেই ডেকেছেন। আমারও ভয় হচ্ছিল এই বুঝি গুবলেট করলেন। তবে এজন্য দত্তবাবুই ক্রেডিট পাবেন। নাকুর নামটা না করলে উনি এত শক্ত হতে পারতেন না।” ভটচাযের সপ্রশংস নজরে দত্তর বুকের ছাতি ও বাইসেপস ফুলিয়ে দিলেন।
”আর দেরি নয়, দেরি নয়, আমাদের জেলখানা কোনটে হবে?” মালবিকা তাড়া দিলেন।
সবাই তাকাল দত্তর দিকে। এ—ব্যাপারে পুলিশের অভিজ্ঞতার কাছে তাদের হাত পাততেই হবে। জি. সি. দত্ত গম্ভীর হয়ে বললেন, ”ঘরগুলো আগে দেখব।”
শ্যামলাকে নিয়ে তিনি তিনটি শোবার ঘর, তাদের গ্রিল, জানলা, দরজা, মায় দেয়াল পর্যন্ত ধাক্কা দিয়ে পরখ করলেন। রান্নাঘরে, এমনকী বাথরুমেও ঢুকলেন। দোতলায় উঠে সুনীলবরণের ঘর দেখলেন।
”ছাদের ঘরটাই মনে—”
”না। দাদার ঘরে ওইসব পাজি লোক ঢোকাব না।” রেখা গুপ্তর কঠিন গলা দত্তকে দ্বিতীয় নির্বাচনে ঠেলে দিল।
”তা হলে কোণের ওই ছোট ঘরটা।” দত্ত অনুমোদনের জন্য রেখা গুপ্তর দিকে তাকালেন।
”কানুর ঘর, হ্যাঁ হতে পারে।”
এর পর দত্তর নির্দেশে দালানের জানলা বাদ দিয়ে সব ঘরের জানলা বন্ধ করা হল। চাপা গলায় তিনি বলতে লাগলেন, ”ফটক খোলা থাক। বেল বাজলে মলা দরজা খুলে ওকে সোজা নিয়ে যাবে কানুর ঘরে। এই সময়টা খুব ক্রুশিয়াল, একটু সন্দেহ হলেই কিন্তু পালিয়ে যেতে পারে। বিছানায় শুয়ে থাকবেন মিস গুপ্ত, চাদর মুড়ি দিয়ে। লোকটা ঘর ঢুকলেই আমি ছুটে এসে দরজা বন্ধ করে দেব।”
”তারপর আমি কী করব?” রেখা গুপ্ত ভয়ে ভয়ে জানতে চাইলেন।
”দরজা বন্ধের শব্দ পেলেই আপনি চাদর ফেলে লাফ দিয়ে উঠবেন। তারপর আপনি জাপটে ধরবেন লোকটাকে।”
”এ আপনি কী বলছেন, রেখা জাপটে ধরবে?” মালবিকা প্রতিবাদ এবং ভর্ৎসনা করলেন।
”খোকাকে তো আমি জাপটেই—”
”দত্তবাবু এ খোকা নয়, খোকার জ্যাঠা। অন্যভাবে ধরার প্ল্যান করুন।” ভটচাযকে বিরক্ত দেখাল।
”তা হলে একটা ডান্ডা হাতে রাখুন। লাফ দিয়ে উঠেই সেটা মাথায়—।”
”তারপর সত্যিকারের থানা, পুলিশ, জেল হোক রেখার।” মালবিকা হাত তুলে মনে হল ডান্ডাটা ধরলেন।
”আচ্ছা, আমরা তো তখন হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে ঘুনু মিত্তিরকে ঘিরে ধরতে পারি, গায়ে হাতটান না দিয়েই।”
শ্যামলা সমাধানের পথ বাতলাল।
”হ্যাঁ, তাও হতে পারে।” দত্ত হাঁফ ছাড়লেন।
অতঃপর রেখা গুপ্ত একটা চাদর নিয়ে কানুর ঘরে অপেক্ষা করতে লাগলেন। অন্যরা দরজা ভেজিয়ে নাকুর ঘরে বসে রইলেন। দালানে পায়চারি করতে লাগল শ্যামলা।
অবশেষে পতু ঘোষের সবুজ মারুতি ফটকের সামনে থামল। শ্যামলা পরদা ফাঁক করে জানলায় উঁকি দিয়ে দেখল ঘুনু মিত্তির ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে নামলেন এবং পেছনের সিটে বসা দুটি লোককে কী যেন বললেন। তারপর পকেট থেকে ডিবে বের করে নস্যি নাকে দিয়ে কিছুটা ইতস্তত করে ডিবেটা ড্রাইভারের হাতে জমা দিলেন।
