খাট থেকে নামলেন রেখা গুপ্ত। পিসির চোখমুখ দেখে শ্যামলা জড়িয়ে ধরে টেনে এনে তাঁকে খাটে বসাল।
”কোথায় যাবে তুমি?”
”যেখানে নাকুকে ধরে রেখেছে। কত ক্ষমতা আছে ওই ঘুনু মিত্তিরদের, আমি দেখব।”
”ওখানে গিয়ে কোনও লাভ হবে না পিসি। দাদাকে যদি বের করে আনতে হয় তা হলে অন্য উপায় ভাবতে হবে।” শ্যামলা ঠান্ডা গলায় বলল।
”কী উপায়?” রেখা গুপ্তর চোখের আগুন অল্প স্তিমিত হল।
”ভাবতে হবে।”
”তা হলে তাড়াতাড়ি ভাব।”
”এসব কি একা ভাবা যায়? তুমিও ভাবো।”
”আমি কী ভাবব, আমার মাথার কিছু ঠিক নেই এখন। এখন ইচ্ছে করছে জেল ভেঙে, ওদের হাত—পা গুঁড়িয়ে, মাথা ফাটিয়ে নাকুকে বের করে আনতে। এছাড়া আর কিছু মাথায় আসছে না। ভটচাযদের মতো ঠান্ডা মাথা তো আমার নয়।”
”হয়েছে।” শ্যামলার চোখে ঝিলিক দিয়ে উঠল চিচিংফাঁক হওয়া গুহাটা। ”ওকেই বলে দেখি। তুমি চুপ করে এখন শুয়ে থাকো। কানুর এয়ারলাইন্স অফিস থেকে ফিরতে দেড়—দু’ ঘণ্টা তো লাগবেই, ততক্ষণে আমি ভটচায—জেঠুর বাড়ি থেকে ঘুরে আসি।”
”দত্তবাবুকেও ব্যাপারটা বলিস। পুলিশে ছিলেন তো, বদমাইশ লোকেদের শায়েস্তা করার ব্যাপারটা জানেন।”
আধ ঘণ্টার মধ্যে ডাইনিং টেবিল ঘিরে বসে গেল বেগারদের শলাপরামর্শের অধিবেশন। সরোজ বসাক কাজে বেরিয়েছেন, তাই অনুপস্থিত। সমস্যাটা বিশদভাবে বুঝিয়ে দিয়ে শ্যামলা বলল, ”তা হলে কী উপায়?”
”শঠে শাঠ্যং ছাড়া কোনও উপায় তো দেখছি না।” ভটচায চিন্তিত চোখে ব্যান্ডেজ জড়ানো পায়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
মালবিকা ইতস্তত করে বললেন, ”মলা তুমি বলছ বিনু না পিনু জন, তাকে পাওয়ার জন্য এই ঘুনু মিত্তির দু’—দু’বার এর্নাকুলম পর্যন্ত ছুটেছিল?”
”কাল রাত্তিরে মশারি গুঁজে দেওয়ার সময় বলল, ‘টুলে বসে একটু কথা বল যাতে বাইরে থেকে ওরা বুঝতে পারে আমি রিল্যাক্সড আছি।’ তখনই তো দাদা বলল, ‘বিনু জনকে পাওয়ার জন্য ঘুনুদার এত ছোটাছুটি, পয়সা খরচ হল, অথচ সে এখন কিনা চন্দননগরে সারথির কবজায়।”’
”নাকুর সঙ্গে বিনুর আলাপ কেমন?” ভটচায জানতে চাইলেন।
”খুব আলাপ।” দাদা বলল, ”ও তো আমাদের বাড়ি বেড়াতে আসতেও চেয়েছিল।”
”হুমম।” ভটচাযের আঙুলগুলো টেবিলের কাঠে ঢাকের বোল তুলল। সবাই তাঁর দিকে তাকিয়ে।
”বিনু জনকে দিয়ে এখন কী হবে!” জি. সি. দত্ত অধৈর্য হয়ে পড়লেন। ”এখন দরকার কুইক অ্যাকশন। বহুদিন হাত—পা গুটিয়ে রেখে শরীরটা আমার মাখন মাখন হয়ে পড়েছে। আমি বরং রেইড করতে যাই পতু ঘোষের বাড়িতে। যা হওয়ার হবে।”
”কাল রাতে তিনটে গুণ্ডাকে কাঁপিয়ে দিয়েছেন বলে কি ভেবেছেন, সবাই আপনাকে ভয় পাবে?” মালবিকা প্রায় চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বসল।
হাত তুলে, চেয়ার থেকে ওঠা দত্তর চ্যালেঞ্জ গ্রহণটাকে বসিয়ে দিয়ে ভটচায বললেন, ”আমার মাথায় একটা প্ল্যান এসেছে। যাত্রীর কাউকে আমরা যদি হোস্টেজ রাখতে পারি তা হলে বন্দি বিনিময়ের মতো—”
”কাশ্মীরে যা হচ্ছে?” মালবিকা বললেন।
”আসামেও তো হচ্ছে।” দত্ত জানিয়ে দিলেন তিনিও ওয়াকিবহাল।
”মলা তুমি একটু পাশের ঘরে এসো, কথা আছে।”
পাশের ঘরে ওরা দু’জন মিনিটসাতেক ফিসফিস করে বেরিয়ে এল।
”এটা কিন্তু ঠিক হল না মিস্টার ভটচায।” জি. সি. দত্ত দেরিতে হলেও তাঁর ক্ষোভটা জানালেন। ”আমাদের সামনে কি কথা বলা যেত না?”
”যেত, তবে কিনা আমি অত্যন্ত গুরুতর একটা ব্যাপার নিয়ে, মানে একটি তরুণের বড় হওয়ার চেষ্টাকে সাহায্য করার একটা কাজ নিয়ে ফেলেছি। তাই বুদ্ধিটাকে থিতিয়ে নিয়ে, মানে অবান্তর কথাবার্তা থেকে সরে গিয়ে এখন কাজে নামা দরকার।” ভটচায এত আন্তরিক ও গম্ভীর হয়ে কথাগুলো বললেন যে, দত্ত পর্যন্ত মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলে ফেললেন, ”তা তো বটেই।”
”মলা, তা হলে ফোন করো।” ভটচায নির্দেশ দিয়ে চেয়ারে টান হয়ে বসলেন।
শ্যামলা ডায়াল করে ঘরের সকলের দিকে নার্ভাস চোখে একবার তাকাল।
”হ্যালো, এটা কি ঘুনু মিত্তিরের বাড়ি?… তিনি কি আছেন?… আমি? আমি সমীরণ গুপ্তর বাড়ি থেকে বলছি, ওর বোন।… ঘুমোচ্ছেন? খুব জরুরি একটা দরকার, যাত্রীর জন্য একটা ইনফরমেশন দেব যেটা ওঁর খুব কাজে লাগবে…আচ্ছা ধরছি।”
শ্যামলা ঘরের ওপর চোখ বুলিয়ে আরও নার্ভাস হয়ে পড়ল। প্রত্যেকের চোখমুখ, এমনকী বসার ভঙ্গিতে সিঁটোনো ভাব। যেন তার ওপর নির্ভর করছে সমীরণের মুক্তি।
”হ্যালো কাকাবাবু, আমি নাকুর বোন মলা। আমাদের বাড়িতে ঘণ্টাখানেক আগে”, শ্যামলা ঝপ করে গলার স্বর নামিয়ে বলল, ”বিনু জন এসেছে।… বিনু জন, বিনু জন কেরলের। বাঙ্গালোর ক্যাম্পে দাদার সঙ্গে তো ওর খুব বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। অনেকবার বলেছে তোমাদের বাড়িতে যাব, কয়েকদিন থেকে কলকাতাটা দেখব। তা সারথির লোকেরা তো তিন—চারবার ওর কাছে গেছল। শেষে ওর বাবার হাতে অ্যাডভান্স ধরিয়ে দিয়েছে… দাদার কাছেই এসব কথা কাল রাতে শুনেছি। তা সেই বিনু জন সই করার জন্য চলে এসেছে। কিন্তু এয়ারপোর্টে সারথির কেউ ছিল না। বোধহয় ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। আমাদের ঠিকানাটা ওর কাছে ছিল, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে একটা ট্যাক্সি নিয়ে সোজা আমাদের বাড়ি চলে এসেছে।… কাকাবাবু, আমার মেজো ভাই কানু, ও বলল, তুই লুকিয়ে চট করে ঘুনুদাকে ফোন করে ব্যাপারটা বল। সারথির হাতে পড়ার আগেই বিনু জনকে যেন যাত্রীর ক্যাম্পে উঠিয়ে নিয়ে যায়… য়্যাঁ, ফোনটা বিনু জনকে দিতে বলছেন?” শ্যামলা ঢোঁক গিলল। ভটচায ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই নিজের বুকে আঙুল ঠেকিয়ে, নিজের বাড়ির দিকে আঙুলটা তুলে, কানে অদৃশ্য ফোনের রিসিভার ধরলেন।
