জবাব না দিয়ে সমীরণ শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল টেলিফোনটার দিকে। তার মাথায় এখন অন্য চিন্তা। কানু কি সুটকেস থেকে নোটবইটা পেয়েছে?… ট্রাঙ্ককলে লাইন পেতে কত সময় লাগবে?… নোভাচেক কি পদ্মনাভন এখন যদি কোথাও বেরিয়ে গিয়ে থাকে? অন্য কেউ ফোন ধরলে সে নিশ্চয় বলতে পারবে ইন্ডিয়া টিম ট্যুরে যাচ্ছে কি না। যদি যায় তা হলে অবশ্যই তাকে জলদি যেতে বলবে। যেতে হলে প্রথম এখান থেকে তাকে বেরোতে হবে।
”পিসিমার যদি কিছু হয়ে থাকে তা হলে আমাকে তো যেতেই হবে।” সমীরণ ব্যাকুল হয়ে বলল।
”যাওয়া তো দরকারই।” তুষার সমর্থন করল।
রুগণ, লম্বা মাঝবয়সি লোকটি, সমীরণ যাকে আগে কখনও দেখেনি, বলল, ”ঘুনুদা না বললে তো যাওয়া সম্ভব নয়।”
আর—একজন বলল, ”তোমার ভাই, কনফার্মড হয়ে আগে তো তোমাকে জানাক, তারপর দেখা যাবে।”
দপদপ করে উঠল সমীরণের কানের দু’পাশ। কিন্তু সে জানে রাগারাগি করে কোনও লাভ নেই। সবার আগে তাকে কাজটা হাসিল করতে হবে।
”আমি ঘরে যাচ্ছি, ফোন এলেই খবর দেবেন।” এই বলে সে ড্রইংরুম থেকে বেরিয়ে এসে খাবার টেবিলে রাখা বঙ্কিম গ্রন্থাবলীটা তুলে নিয়ে, নিজের ঘরে এসেই অবাক হল। বুকু শুয়ে রয়েছে, দুলালের শূন্য বিছানায়। বুকের ওপর টেপ রেকর্ডারে নিচু স্বরে বাজছে হিন্দি গান।
”কী ব্যাপার, এখানে?” সমীরণ বলল।
”তুষারদার সঙ্গে থাকব না, অত্যন্ত বাজে লোক।”
সমীরণ আর কথা না বলে নিজের বিছানায় শুয়ে পড়ল। কপালকুণ্ডলা শেষ করার বাসনা এখন আর তার নেই। তার মাথায় এখন চেকোশ্লোভাকিয়া ট্যুর, বাঙ্গালোর, কানুর ট্রাঙ্ককল, প্লেনের টিকিট, পতু ঘোষের বাড়ি থেকে বেরোনো, ঘুনু মিত্তিরের অনুমতি এবং নিজের ওপর প্রচণ্ড রাগ পর—পর খেলে চলেছে।
”তোদের ক্যাম্পে ছিল নাগাল্যান্ডের খাংমা, ঘুনুদা তাকে আনতে কোহিমা যাচ্ছে।” টেপরেকর্ডার বন্ধ করে বুকু বলল।
সমীরণ নিজের ভাবনার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছিল, তার মধ্যেই বুকুর কথাটা তার মগজে আঘাত করল। অবাক হয়ে বলল, ”খাংমা মানে সেই স্টপারটা? নোভাচেক তো ওকে তিনদিন দেখেই ক্যাম্প থেকে ফেরত পাঠিয়ে দেয়!”
”হ্যাঁ, ওকেই আনতে যাচ্ছে। অজয় তালুকদার ওকে চেয়েছে। ওর মধ্যে নাকি ভারতের সেরা স্টপারটা লুকিয়ে আছে, অজয়দা তাকে বের করে আনবে। অতএব ব্রিফকেস নিয়ে ঘুনু মিত্তির এবার প্লেনে উঠবে।”
”একটা হাতির ঘুরতে যে সময় লাগে খাংমার লাগে তার আটগুণ সময়। বিনু কি আলবু তো তাস খেলতে খেলতে ওকে বিট করবে!”
”তাতে কী হয়েছে, ছ’ফুটের ওপর লম্বা, পঁচাশি কেজি ওজন, এটাই তো যথেষ্ট দেড় লাখ টাকার পক্ষে। গৌরবন্ধু, খাংমা, এইসব নিয়ে গোল খাবে আর সেই গোল শোধ করতে হবে আমাকে, এবার থেকে তোকেও। আর না পারলে কী অবস্থাটা আমাদের হবে… পাবলিক জানে অলরেডি পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা যাত্রী খরচ করে বসে আছে।” বুকু টেপরেকর্ডারটা আবার চালিয়ে কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্বরগ্রাম কমিয়ে বলল, ”তুই আসায় আমি বিন্দুমাত্র দুঃখিত নই।”
সমীরণ বিছানা থেকে উঠে ঘরের বাইরে এল। ঘরের কোণে টেবিলের ওপর রাখা ঘড়িটা টুংটাং শব্দ করল। এগারোটা। সমীরণ অস্থির মনে পায়চারি করতে করতে একসময় ড্রইংরুমে ঢুকল। লোকসংখ্যা বেড়ে গেছে। তাদের মধ্যে তিন—চারজনকে মস্তানগোছের বলে তার মনে হল। যাত্রীর দু’জন ফুটবলারও রয়েছে এর মধ্যে, বোধ হয় দরাদরি করার জন্য এসেছে। ট্রেজারার মহাদেব সামুই একটা বালিশ বগলে রেখে সোফায় কাত হয়ে আধশোয়া।
ফুটবলারদের একজন সামুইকে তখন বলছিল, ”সারথির নির্মাল্য রায় কাল এসেছিল।”
”চুঁচড়োয়? তোর বাড়িতে?”
”হ্যাঁ, বললেন ফুড কর্পোরেশনে, নয়তো কোল ইন্ডিয়ায় চাকরির ব্যবস্থা করে দেবেন।”
”ভাল কথা, তা হলে সারথিতেই চলে যা।”
ফোন বেজে উঠল। সামুইয়ের হাতের কাছে ফোন, তিনি তুললেন, শুনলেন এবং উদগ্রীব সমীরণের দিকে সেটি বাড়িয়ে ধরলেন।
”কে, কানু?”
”কারেক্ট খবর। নোভাচেককেই ফোন করেছিলাম, বলল ট্যুরটা হঠাৎই ক্লিয়ারেন্স পেয়ে গেছে। সম্ভব হলে স্যাম আজই ফ্লাই করুক, নয়তো পজিটিভলি যেন কাল করে। একদিন দেরি হলে ওকে বাদ দেব। হাতে একদমই সময় নেই। দাদা, আমি এখন টাকা নিয়ে এয়ারলাইন্স দৌড়চ্ছি।”
”কিন্তু আমি যাব কী করে কানু, এখানে আমায় নজরবন্দি করে রেখেছে, ধরে রেখেছে। আই অ্যাম ইন এ জেইল।” সমীরণ চিৎকার করে উঠল। ঠকঠক কাঁপছে তার দেহ। চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ঘাম ফুটেছে কপালে। ”যেভাবে পারিস উদ্ধার করে নিয়ে যা। আমি ভারতের ক্যাপ্টেন হয়ে খেলতে চাই, সবার আগে আমি একটা মানুষ হতে চাই।”
সমীরণ আর কিছু বলার সুযোগ পেল না। ছোঁ মেরে তার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়েছে মহাদেব সামুই।
”কী আজেবাজে কথা বলছিস সমীরণ! এটা কি জেলখানা? যাত্রীর সেক্রেটারির বাড়িকে তুই জেলখানা বলছিস? তুই আছিস যাত্রীর গেস্ট হয়ে, পতুর গেস্ট হয়ে, আর বলছিস কিনা… এমন বদনাম… ছি ছি ছি, কেউ দেবে না।”
”তা হলে আমাকে যেতে দিন।” সমীরণ দরজার দিকে পা বাড়াল। তিন—চারজন যুবক ছুটে গিয়ে দরজা আগলে দাঁড়াল। সমীরণ তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে মুখটা নামাল। কাঁধ দুটো হতাশায় ঝুলে সে কুঁজো হয়ে গেছে। পায়ে পায়ে নিজের ঘরে ফিরে এল। টেপরেকর্ডারে তখনও হিন্দি গান হয়ে চলেছে।
।। ৯।।
”কী বলল?” খাটের ওপর ধীরে ধীরে উঠে বসলেন রেখা গুপ্ত। ”যেভাবে পারিস উদ্ধার করে নিয়ে যা!… আমায় ধরে রেখেছে! আমার নাকুকে ওরা ধরে রেখেছে? আমি যাব।”
