দেবুর স্বস্তি পাওয়া মুখ দেখে সে বলল, ”বউদি চলে গেছেন, না দলবল নিয়ে নীচে বসে আছেন?”
”বসেটসে নেই, একদমই চলে গেছেন। এদিকে এরাও সব তুষারদাকে নিয়ে বড়বাবুর ড্রইংরুমে গিয়ে বসেছে। মাঝের দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছে। বাইরের দরজাও লক করে দিয়েছি। বড়বাবুর কড়া অর্ডার প্লেয়ার ছাড়া এদিকে কেউ থাকবে না। ঝামেলটামেলা হলে ওদিককার ঘরেই হোক। কাল গৌরবন্ধু বেরা—র বাবা এসে যা চেঁচামেচি করল।”
”গৌরবন্ধু, মানে সারথির তিন নম্বর গোলকিপার?”
”হ্যাঁ। ওকে সত্তর হাজার দেওয়ার কথা হয়েছে। লোকটা এসে বলে একলাখ পঁচিশ চাই। ভাবুন একবার, জুনিয়ার বেঙ্গলে একটা ম্যাচ শুধু খেলেছে, সিনিয়ার বেঙ্গল টিমের রিজার্ভে ছিল, সারথিতে গত বছর চারটে একজিবিশন ম্যাচে নেমেছে, আপনি তো আমার থেকেও ভাল জানবেন, এই প্লেয়ার কিনা চাইছে সোয়া লাখ! দু’ঘণ্টা ধরে ওর বাপ চেঁচাল, রাগ দেখাল, তারপর কান্নাকাটি, হাতজোড়, মানে শান্তিগোপাল, স্বপনকুমারও হার মেনে যাবে!”
”চাইবে না কেন? সারা ময়দানে রটে গেছে টাকার বস্তা নিয়ে পতু ঘোষ প্লেয়ার কেনার দোকান খুলেছে। কানা, খোঁড়া, নুলো, খোকা, বুড়ো যাকে পারছে অ্যাডভান্স ধরাচ্ছে। গৌরবন্ধুর কতয় রফা হল?”
”আশি হাজার।”
”অ্যাঁ। ওর দাম তো আশি টাকাও নয়, আর কিনা পাবে আশি হাজার।”
”আপনি অ্যাডভান্স নিয়েছেন?” দেবুর স্বরে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা।
”না।” সমীরণ হুঁশিয়ার হল। এইসব বিষয় নিয়ে এই পর্যায়ের লোকের সঙ্গে কথা বলা উচিত নয়।
”চাইলে অ্যাডভান্স কেন, পুরো টাকাটাই আপনাকে দিয়ে দেবে। আপনি যাত্রীর বড় ক্যাচ, আপনাকে যে পাব এটা তো আমরা আশাই করিনি।”
এই সময় চেঁচিয়ে একজন বলে গেল, ”সমীরণ তোমার ফোন এসেছে।”
নিশ্চয় বাড়ি থেকে। আর তো কেউ জানে না সে এখানে! সমীরণ প্রায় ছুটেই ড্রইংরুমে গেল।
”কে, দাদা? আমি কানু।”
”পিসি স্কুলে গেছে?”
”যায়নি। হটওয়াটার ব্যাগ নিয়ে সেঁক দিচ্ছে। শোন, এইমাত্র বাঙ্গালোর থেকে তোর ফোন এসেছিল।”
মাথার মধ্যে ঝনাৎ শব্দ করে সমীরণের শরীর শক্ত হয়ে গেল। ”কে করেছে?”
”পদ্মনাভন, এ.আই.এফ.এফ. সেক্রেটারি। এক্ষুনি তোকে রওনা হতে বলল।”
”এক্ষুনি রও—” সে থেমে গেল। সারা ঘর কান পেতে, সব চোখ এখন তার দিকে। খোলাখুলি কথা বলা নয়।
”কেন বলল?”
”নাগজি টুর্নামেন্টে তোরা খেলছিস না, কারণ চেকোশ্লোভাকিয়া ট্যুর গভর্নমেন্ট স্যাংশন করেছে। দশদিনের মধ্যেই টিম রওনা হবে। তোর জন্য নোভাচেক অপেক্ষা করছে। মিনিটখানেক কথা হল।”
সমীরণের হাতের ফোন থরথর কাঁপছে। তার জীবনের স্বপ্ন বাস্তব হয়ে ফোনের মধ্য দিয়ে সারা শরীরকে সুখে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যেই একটা সন্দেহ কাঁটার মতো তার মগজে বিঁধল। ফোনটা বাঙ্গালোর থেকে, না কি শোভাবাজারের অভয় কুণ্ডুর বাড়ি থেকে? এটা আগে যাচাই করে নেওয়া দরকার। কলকাতার ফুটবলে নোংরামির তো অন্ত নেই।
”কানু, তুই একবার পদাকে ফোন কর, এক্ষুনি?” নম্বরটা লেখা আছে ফোন—গাইডে।”
”পদা কে?”
”আহা, একটু আগেই তো বললি তোকে ফোন করেছিল পদা।” সমীরণ আড়চোখে ঘরের লোকেদের দিকে তাকাল। ”আমার সুটকেসের একটা নোট বইয়ে নোভুদার ফোন নাম্বার আছে। ওখানে করলেও হবে।”
”পদ্মনাভন, নাকি নোভাচেক, আগে কাকে করব?”
”যাকেই হোক, জিজ্ঞেস করে কনফার্মড হয়ে নে। অন্য কেউ ধাপ্পা দেওয়ার জন্য এভাবে বলছে কি না সেটা বাজিয়ে নেওয়া দরকার। যদি সত্যি হয় তা হলে যা কিনতে বলেছি সেটা কিনে ফেল।”
”কিনতে মানে প্লেনের টিকিট কাটতে বলেছিলিস।”
”হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাই। তবে বো নয় বা।”
”আরে বাঙ্গালোরেরই কাটব। আমার বন্ধুর দাদা, সারথির পাগল সাপোর্টার, এখনও জানে না তুই যাত্রীতে উঠেছিস, তিনি এয়ারলাইন্সের অ্যাকাউন্টসে আছেন। তাঁকে ফোন করে কালকের বোম্বাইয়ের টিকিট চেয়েছিলাম, বললেন হয়ে যাবে। এখন আবার বাঙ্গালোরের চাইতে হবে। অবশ্য প্রথমে পদার কাছ থেকে জেনে নিয়ে।”
”জেনেই আমাকে জানাবি, এক সেকেন্ডও দেরি করবি না। ভীষণ ক্রুশিয়াল এটা আমার কাছে।”
সমীরণ রিসিভার রাখতেই প্রশ্ন হল, ”নাকু, কোনও খারাপ খবর?”
”অ্যাকসিডেন্ট নাকি সমীরণ?”
”তোমার পিসিমার?”
দুর্ভাবনা—পীড়িতের মতো দেখাচ্ছে সমীরণকে। এখন তাকে এই ভাবটা দেখাতেই হবে। এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া সহজ কর্ম নয়। তাকে আটকে দেবেই। যাত্রীর সে বড় ক্যাচ।
”হ্যাঁ, তুষারদা, একজন ফোন করে ভাইকে বলেছে স্কুলের সামনে বাস থেকে পিসিমা পড়ে গিয়ে শিরদাঁড়ায় চোট পেয়েছে। কথাটা সত্যি কি না কনফার্ম করার জন্য ভাইকে বললাম, পদাদা, আমার এক মামাতো দাদা, পিসিমার স্কুলের পাশেই থাকেন, তাকে ফোন করে জেনে নিয়ে আমাকে জানাতে। কী যে করব ভেবে পাচ্ছি না, বাড়িতেও কেউ নেই যে—।” সমীরণ ক্লিষ্ট মুখে ধীরে ধীরে তুষারের পাশে বসে পড়ল।
অভিনয়! এখন সে স্টেজের ওপর। ঘাগু দর্শকদের সামনে তাকে অভিনয় করতে হচ্ছে। একটু এধার—ওধার হলেই এরা ধরে ফেলবে। বাসব কী যেন বলেছিল? ”কী গলা, কী ডেলিভারি, কী পিচ কন্ট্রোল!” এসে একবার দেখে যাক সমীরণ গুপ্তর অভিনয়।
”পিসিমার তো দারুণ স্বাস্থ্য, প্রচণ্ড ফিট। শুনেছি এককালে রেগুলার বাস্কেট খেলতেন।” তুষার সমীহ করে বলল।
