সমীরণকে দেখেই সুবোধ ধাড়া একগাল হাসল।
”বটাকে ম্যাজিক দেখালি? ভাল, ভাল, এবার মাঠে নেমে পায়ের জাদুটাও দেখাস।”
সমীরণ চুপ করে রইল। দুলাল ইশারায় সুবোধ ও সীতেশকে ঘরে ডেকে নিয়ে গেল। ওদের সঙ্গে আর যারা ঢুকেছে তারা সোফায় বসে নিজেদের মধ্যে জোর গলায় কথা বলা শুরু করল—কোন প্লেয়ারকে আনা দরকার, কার কত দর হওয়া উচিত, আর পঁচিশ হাজার বাড়ালেই কাকে পাওয়া যাবে, কাকে একদমই বিশ্বাস করা যায় না, কে ল্যাজে খেলাচ্ছে, এইসব কথার থেকে সরে যাওয়ার জন্য সমীরণ বইয়ের আলমারির সামনে দাঁড়াল।
মরক্কো চামড়া—বাঁধানো ইংরেজি এবং বাংলা নানাবিধ বই থেকে সে অনুমান করল পতু ঘোষ লোকটা উটকো এবং সাজানো বনেদি নয়। শিক্ষা, রুচির একটা ভিত পরিবারে আছে। আলমারির পাল্লা টানতেই খুলে গেল। সে বঙ্কিম গ্রন্থাবলীর একটা খণ্ড বের করে পাতা ওলটাল। কয়েকটা উপন্যাস রয়েছে এই খণ্ডে। বইটা নিয়ে সে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে পরদা টেনে দিল। জানলার পরদা সরিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল একটা অফিসবাড়ি। দোতলায় ব্যাঙ্ক। রাস্তার কিছুটা চোখে পড়ে। বাস, মোটর ইত্যাদি চলছে। আকাশ কষ্টেসৃষ্টে দেখা যায়। সে একটা চেয়ারে বসে আর—একটায় দুটো পা তুলে দিল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই সে ‘কপালকুণ্ডলা’য় ডুবে গেল।
উপন্যাসটা যখন প্রায় শেষ করে এনেছে, হঠাৎ একটা মেয়েগলার চিৎকারে সমীরণ বই বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল।
”কোথায় দুলাল চক্রবর্তী? তাকে কোথায় রেখেছেন, বের করে দিন।”
”কে আপনি?”
”আমি ওর বউ মধুছন্দা।”
”এখানে দুলাল চক্রবর্তী নেই।”
”নেই মানে, আজ সকালেই ফোনে কথা বলেছি। আমায় বলল, এখানে ওকে জোর করে আটকে রাখা হয়েছে। আমি সব ঘর সার্চ করব।”
”বলছি তো এখানে নেই। আপনি যেতে পারেন।”
সমীরণ পরদার ওপারের সংলাপ শুনে বুঝল সুবোধ ধাড়াদের সঙ্গে আসা সেই লোকগুলি ছাড়া ওখানে আর কেউ নেই। নিশ্চয় আগাম জেনেছে মধুছন্দা আসছে তাই কেটে পড়েছে।
”আমায় আটকাবেন না বলছি। নীচে একশো ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। আপনারা আমার স্বামীকে অবৈধভাবে এখানে ধরে রেখেছেন।”
”আপনি যদি ঘর দেখতে চান, দেখতে পারেন, কিন্তু অন্য কাউকে ঢুকতে দেব না, সেটাও তা হলে অবৈধ ব্যাপার হবে।”
”ঠিক আছে, এই তোমরা এখানে দরজার বাইরেই থাকো।”
”না বউদি, আমরাও আপনার সঙ্গে থাকব।”
”আপনাকেও যদি আটকে রেখে দেয়?”
”অ্যা অ্যা অ্যা, আটকাবে আমাকে? জ্বালিয়ে দেব না সারা বাড়ি। আমি একাই দেখছি, তোমাদের ঢুকতে হবে না।”
বটা বিশ্বাস তা হলে এর মধ্যেই অর্গানাইজ করে ছেলে পাঠিয়ে দিয়েছে। সমীরণ পাতার সংখ্যাটা দেখে বই বন্ধ করল। কিন্তু যদি তাকে এখন দেখে ফেলে? যদি জবরদস্তি চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে যায়? তারপরই মনে হল, প্লেয়ার তোলা এভাবে হয় না। যাকে তোলে সে স্বেচ্ছায়ই হাজির হয়।
ঘরের দরজা খোলা আর বন্ধের শব্দের সঙ্গে মধুছন্দার গলা ভেসে এল। ”কোথায় ওকে সরিয়েছেন আপনারা বলুন, নয়তো কুরুক্ষেত্র বাধাব বলছি।”
”বললাম তো আপনাকে, দুলাল চক্রবর্তী আধঘণ্টা আগে ওর জিনিসপত্র নিয়ে চলে গেছে। হঠাৎ, নিজের থেকেই। যওয়ার সময় শুধু বলল, এখানে থাকব না, বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছি। যদি বউ খোঁজ করতে আসে—”, কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সমীরণ শুনল তুষারের গলা, ”তা হলে বলে দেবে, বটাদা এবার কত ভরির হার দেবে সেটা জেনে নিয়ে যেন বাড়িতে বিকেলে ফোনের পাশে বসে থাকে। পাঁচ ভরির কম হলে সারথিতে থাকব না।”
”তুষারদা, আপনি তো একজন বড় প্লেয়ার, আপনিই বলুন, ফুটবলারদের কি বিশ্বাস করা যায়? ওদের কথার কি কোনও দাম আছে?”
”ছন্দ, আমিও কিন্তু একজন ফুটবলার।”
”না, না, আপনাকে বলছি না, আপনি বাদে আর সবাই। আমাকে বলল একটা হিরের নাকছাবি করিয়ে দেবে সারথির টাকাটা পেলেই। এক বছর হয়ে গেল, কোথায় নাকছাবি? এবার বলল যাত্রীর অ্যাডভান্স পেলেই—না, না, আমি আর বিশ্বাস করছি না। বলুন না তুষারদা ও কোথায়? বটাদা বলেছেন মামনকে লরেটোয় ভর্তি করিয়ে দেবেন। উনি এককথার মানুষ, যা বলেন তাই করেন।”
”লরেটোয় তো পতুদাও ভর্তি করিয়ে দিতে পারেন।”
”পারেন? আপনি একটু বলবেন তুষারদা?”
”তুমি নিজেই বলো না।”
”ঠিক আছে আমিই বলব। জানেন, আমার বড়দির মেয়ে কী ফটাফট ইংরিজি বলে। মেমসাহেবদের মতো উচ্চচারণ। শুনলুম পতুদা এখানে নাকি নেই?”
”কাল—পরশুই এসে যাবে, তুমি বরং পরশুই এসো।”
সমীরণ ভেবে পাচ্ছে না, হাসবে, না, রাগবে। একটা ফুটবলারকে জীবনে কতজনের কতরকমের স্বার্থ, লোভ দেখে চলতে হয়। দুলালদা প্রায়ই বলে, ”গুছিয়ে নে, নাকু, গুছিয়ে নে। এই খেলা চিরকাল তো থাকবে না, যা পারিস বাগিয়ে নে।” দুলালদা বাগিয়ে নেওয়ার জন্য যাত্রী আর সারথির মধ্যে লাথি খাওয়া বলের মতো যাতায়াত করছে।
বইটা খুলে আবার সে পড়তে শুরু করল। কয়েক মিনিট পর দেবু পরদা সরিয়ে মুখ বাড়াল।
”দুপুরে কী খাবেন?”
”যা হোক।”
”তুষারদা ইলিশ খাবে বলেছে, বুকুদা চিকেন। যে যা চাইবে তাই দেওয়া হবে। বুকুদা তো কাল এগারোটা ক্যাডবেরি চকোলেট খেল।”
”আমি খাব ভাত, ডাল, তরকারি আর যে—কোনও একটা মাছের ঝোল।”
”আর?”
”আবার কী?” সমীরণ তাকাল দেবুর বিড়ম্বিত মুখের দিকে। ”রোজ যা খাই তাই খাব, তবে ইলিশভাজা পেলে ছাড়ি না আর দই পেলে তো খুবই ভাল হয়।”
