”ওটা বুকুর সঙ্গে বোঝাপড়া করে নে।” গোলমরিচের গুঁড়ো রুটিতে ছিটিয়ে কামড় বসাবার আগে দুলাল বলল।
”নাকু, তুই তো সারথিতেই থেকে যাবি শুনেছিলাম!” বুকুর বিস্ময়ের ঘোর এখনও কাটেনি।
”মত বদলালাম।”
”কেন? দরে পোষাল না?”
সমীরণ উত্তর দিতে গিয়েও দিল না। শুধু মাথা নাড়ল। বুকু চোখ সরু করে তেরছা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে ভাবতে শুরু করল। সমীরণ প্লেটে স্যালাড তুলতে তুলতে সেটা লক্ষ করে হাসল।
”নাকু তুই হাসলি যে?” দুলাল বলল।
”সারথির পাঁচটা ছেলে বাড়ির সামনে পাহারা দিচ্ছিল কাল রাতে। এখন বটাদা তাদের কী বলছে সেটা মনে করেই হাসি পেল। আচ্ছা দুলালদা, পৃথিবীতে আর কোনও দেশে কি এইভাবে দলবদলের আগে ফুটবলারদের গাধা—গোরুর মতো খোঁয়াড়ে পোরা হয়?”
”একটা দারুণ কথা নাকু তুই বললি।” তুষার মুখভরা রুটির মধ্যে একটা ফাঁক তৈরি করে বাক্যটি বের করে আনল। ”মানুষকে গাধা—গোরু কখনওই বানানো যায় না যদি না সে নিজেই তা হতে চায়। আমরা হতে চেয়েছি তাই ওরা বানিয়েছে। না চাইলে বানাতে পারত না। এখানে লাস্ট চারটে ওয়ার্ল্ড কাপের সাত—আটটা ম্যাচের ক্যাসেট আছে। তুই তার যে—কোনও একটা ম্যাচ দ্যাখ। তোর মনে হবে গাধা—গোরুরা নয়, বাঘ—সিংহের লড়াই হচ্ছে। ওদের খোঁয়াড়ে ভরার কথা কেউ স্বপ্নেও ভাববে না।… দুলে কড়াপাকের দিকে আর তাকাসনি বাবা। আগের সিজনে বুকু যে—ক’টা সিটার মিস করেছে ঠিক সেই ক’টাই এখন রয়েছে। ওর থেকে যদি খাস—।” তুষারের কথা থেমে গেল। রাগ করে বুকু উঠে পড়েছে।
”সব সময় পেছনে লাগার স্বভাবটা তোমার আর গেল না। আমি ক’টা মিস করেছি তার ফর্দ তুমি রেখেছ, আর তুমি ক’টা গলিয়েছ তার হিসাবটাও কি রাখো?”
”রাখি।” নির্বিকার মুখে তুষার বলল। যত্নভরে কলার খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে সে আড়চোখে একবার সমীরণের দিকে তাকাল! ”কলকাতার মাঠে লাস্ট সিজনে চারবার বিট হয়েছি শুধু নাকুর কাছে। কিন্তু ও গোল দিতে পারেনি। হ্যাঁ মানছি, চারবারই সারথির পেনাল্টি পাওয়া উচিত ছিল। এবার আর নাকুকে মেরে থামাতে হবে না ভেবে পুণ্য অর্জনের সম্ভাবনায় ঠিক করেছি স্যাক্রিফাইস করব।”
তিনজোড়া চোখ তুষারের ওপর গেঁথে গেল।
”সন্দেশগুলো, বুকু তুই একাই খেয়ে নে।”
”আমার মুশকিলটা কী জানো তুষারদা, তোমার এগেনস্টে খেলার সুযোগ একবারও পেলাম না। পেলে তোমাকে বুঝিয়ে দিতে পারতাম…।” বুকু অর্থপূর্ণ হাসি তিনজনকে উপহার দিল।
তুষার ভ্রূ তুলে বলল, ”কী বুঝিয়ে দিতিস?”
”বুঝিয়ে দিতাম তোমার রিটায়ার করার সময় এসে গেছে।”
বুকু কথাটা বলেই টেবিল থেকে উঠে বসার জায়গায় গিয়ে টিভি সেটের সুইচ টিপল। ধীরে ধীরে তুষারের মুখ থমথমে হয়ে উঠল।
”খবরের কাগজ কখন আসে?” সমীরণ বলল প্রসঙ্গটা সহজ করার জন্য দুলালকে লক্ষ্য করে। এইসব আকচাআকচি, হিংসা, মনোমালিন্য তার মনটাকে ঘুলিয়ে দেয়। সে শুনেছে ক্লাবে আধিপত্য বিস্তারের জন্য এই দু’জনের মধ্যে লড়াই চলছে। দু’জনে দুই কর্তার প্লেয়ার।
”আসে না।”
”মানে? তোমরা কাগজ পড়ো না?”
”পড়ি।”
”তা হলে?”
”তা হলে আবার কী?” দুলাল বিরক্তিভরে বলল, ”আমাদের খবরের কাগজ পড়া বারণ, তাই আসে না।”
স্তম্ভিত হয়ে গেল সমীরণ। সে বুঝে উঠতে পারছে না কাগজ পড়ার মতো একটা সাধারণ ব্যাপারে আপত্তি কেন?
দুলাল ওর মনের কথাটা আন্দাজ করেই বলল, ”ক্লাব অফিসিয়ালদের বিবৃতি, ইন্টারভিউ, প্লেয়ারদের হাম্বা হাম্বা, কে কাকে ধরতে গিয়ে ফসকে গেল, কে বলছে অমুক ক্লাবে খেলব তমুক ক্লাবে যাব না, কাকে কত টাকা অ্যাডভ্যান্স দেওয়া হল আর কে অ্যাডভান্স নিয়েও বিরোধী ক্যাম্পে গিয়ে উঠল, অফিসিয়ালদের কে নিজের ক্লাবের বিরুদ্ধেই কথা বলল—এইসব যাতে আমরা জেনে না যাই সেজন্যই খবরের কাগজ দেওয়া হয় না।” দুলাল ফিক ফিক হেসে চামচে কর্নফ্লেকস তুলে মুখে দিল।
”এটা অত্যন্ত অন্যায়, স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।” সমীরণ রেগে উঠল।
দুলাল কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল দেবু এসে তাকে বলল, ”বউদির ফোন।”
দুলাল ব্যস্ত হয়ে উঠে গেল। তুষারও উঠল। সমীরণ টেবিলে একা বসে রুটি চিবোতে চিবোতে দেবুকে বলল, ”চা দাও।”
”চা নয়, হরলিকস খেতে হবে।”
শুনেই সমীরণ চোখ সরু করল। ”খেতে হবে। যাক, দরকার নেই।”
পাংশু মুখে ফিরে এল দুলাল। সমীরণের সামনের চেয়ারে বসে নার্ভাস স্বরে বলল, ”মুশকিলে ফেলল দেখছি। বটা বিশ্বাসের ষাট—সত্তরটা ছেলে বাড়ির সামনে চিৎকার করছে, গালাগাল দিচ্ছে আমার নামে। কী করা যায় বল তো।” অস্থিরভাবে দুলাল সোফায়—বসা তুষারের কাছে চলে গেল।
”তুষার, এখন কী করি বল তো?”
”কী আবার করবি। বউকে বল দরজা জানলা বন্ধ করে, কানে তুলো দিয়ে বসে থাকতে। কিছুক্ষণ চেঁচামেচি করে ওরা আপনা থেকেই চলে যাবে।”
”তাই—ই বলেছি। কিন্তু বটাদা টেলিফোন করে বউকে বলেছে দেখা করতে আসবে। এটাই তো ভয়ের কথা। ছন্দা তো বটাদা বলতে অজ্ঞান।”
”হোক না অজ্ঞান! তোর জ্ঞানটা ঠিক থাকলেই হল।”
”ছন্দাকে তো চিনিস না, ও অজ্ঞান হলে আমাকেও যে অজ্ঞান হতে হবে এটা বটাদা জানে। গত বছর ওকে দিয়ে বটাদা এমন প্রেশার দেওয়াল যে, যাত্রীর অ্যাডভান্স নিয়েও সারথিতে যেতে হল।”
সমীরণ এসে দু’জনের সঙ্গে বসল। বুকু সঙ্গে সঙ্গে টিভি বন্ধ করে ঘরের মধ্যে চলে গেল। ডোর—বেল বেজে উঠল। দেবু দরজা খুলে দিতেই সুবোধ ধাড়া, সীতেশ রায় এবং সাত—আটজন যুবক ও মাঝবয়সি লোক ভেতরে ঢুকল।
