”হুঁ, বলো।”
”তুই কেন জানি একটু অন্যরকম। সেজন্যই তোকে আমার ভাল লাগে। লেখাপড়া করা প্লেয়ার বা আমার মতো ‘ক—অক্ষর গোমাংস’ প্লেয়ার কম তো দেখলাম না,কেউ কিন্তু গভীর শ্রদ্ধা ফুটবলকে দেয় না। দিলে সে সবার আগে শরীরের যত্ন নিত, ক্ষমতা বাড়াত, স্কিল বাড়াত, ডিসিপ্লিন লাইফ লিড করত। কিন্তু শ্রদ্ধা যে আনব বা দেব তারও তো একটা সঙ্গত কারণ থাকা চাই। বেশিরভাগই আমার মতো গরিব ঘর থেকে এসেছে, অশিক্ষিত। সবার আগে নিরাপত্তা, টাকা, এটাই আমাদের মাথায় থাকে। এটা কি অন্যায়?”
”অন্যায় তো নয়ই, প্রফেশনালিজমের এটাই আসল ভিত।”
”বলছিস?”
”হুঁ। টাকার জন্যই মারাদোনা, গাওস্কর, লেন্ডল, কার্ল লুইসরা ফর্ম ধরে রাখতে প্রাণপণ করে গেছেন আর সাকসেসও পেয়েছেন। তুমি—আমি তো কোন ছার। টাকাকে অশ্রদ্ধা কোনওমতেই করা উচিত নয়। আসলে আমাদের পরিবেশটাই এত খারাপ যে, এক লাখ কি দু’লাখ পাচ্ছি শুনলেই লোকে চমকে ওঠে। এরা একবারও ভেবে দেখে না টিভি—তে যাদের খেলা দেখে আহা আহা করে তারা বছরে কোটি টাকা পায়। তাদের একটা নিরাপত্তা আছে। এখানে আমার কী আছে?”
”কিচ্ছু নেই। আর সেজন্যই আমাকে উঞ্ছবৃত্তি করতে হয়।”
”তা হলে এবার তুমি ঘুমোও।”
সমীরণ বেডকভার টেনে নিজেকে ঢেকে দিল। ভোরে ঘুম থেকে উঠে ঘরের বাইরে এসে দেবুর দেখা গেল।
”চা দেব?”
”হ্যাঁ, তার আগে ফোন করব।”
”যান না ও—ঘরে, ঘরের দরজা তো শুধু বন্ধ করা।”
”চাবি দেওয়া নয়?”
কালকের মতো সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে দেবু বলল, ”ঘুনুবাবুর কথার ওপর কথা বলা বারণ।”
সমীরণ দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, ”চিরটাকাল একই রকম থেকে গেল।”
তিক্ততায় ভরে উঠল সমীরণ। এত টাকা খরচ করছে যাত্রী ভাল একটা দল গড়ার জন্য, অথচ এইসব ক্ষুদ্রতা নীচতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারল না।
পতু ঘোষের ব্যক্তিগত ড্রইংরুম তার গেস্টরুম থেকে একটু বেশি সমৃদ্ধ। পরদার এবং সোফার কাপড় আরও দামি, কার্পেটের নকশা আলাদা, দেওয়ালে পেইন্টিং তো আছেই। তা ছাড়া করাত দিয়ে কাটা বাকলসহ বিশাল একটা গাছের গুঁড়ির টুকরো রাখা হয়েছে, ঘরের একধারে। ফোনের রিসিভারেই ডায়াল বাটন।
”হ্যালো, কে মলা?”
”দাদা?”
”খবর কী, ওই ছেলেগুলো—”
”আ বলিসনি। পিসি তো আজ বেগিংয়ে বেরোয়নি। কাল ছাদে পড়ে গিয়ে কোমরে লেগেছে। এখন বিছানায়। আমি মাদার ডেয়ারির বুথ থেকে দুধ আনতে যাব বলে দরজা খুলে বেরিয়েই দেখি পাঁচ মূর্তি বসে রয়েছে বারান্দায়। বললাম, ”এ কী আপনারা বাড়ির মধ্যে কেন?” একজন বলল, ”পিসির সঙ্গে সমীরণদা কথা বলা কি শেষ হয়েছে? তাড়াতাড়ি আসতে বলুন।” বললাম, ”কাকে আসতে বলব?” বলল, ”সমীরণদাকে। বটাদা বলে দিয়েছে তাড়াতাড়ি নিয়ে যেতে।” তখন বললাম, ”দাদা তো অনেকক্ষণ আগেই বেরিয়ে চলে গেছে।” তাই শুনেই তো ওদের চক্ষু চড়কগাছ। ভেতরে ঢুকে সব ঘর, ছাদ তন্নতন্ন করে দেখে প্রায় কেঁদে ফেলার জোগাড়। বারবার জিজ্ঞেস করতে লাগল, ”কোথায় গেছে সমীরণদা, বলুন কোথায় গেছে?” কানু বলল, ”কলকাতার ফুটবলের হাল দেখে বোধ হয় সন্ন্যাসী হয়ে হিমালয় চলে গেছে।” আমি বললাম, ”দাদা তো সন্ন্যাসী হওয়ার লোক নয়, দেখুন গিয়ে তারামা’য় বসে হয়তো জিলিপি খাচ্ছে।” শোনামাত্র পড়িমড়ি দৌড়ল তারামা’র দিকে। আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল চলে যাওয়ার সময় ওদের মুখ দেখে।”
”মলা শোন, আমি এখন পতু ঘোষের বাড়িতে। ফোন নাম্বারটা রেখে দিস, দরকার হলেই ফোন করবি।”
”জায়গাটা কেমন?”
”ফুটবলারদের ধ্বংস করার জন্য যা দরকার সেটা এখানে ভালমতোই আছে, প্রচুর টাকা, প্রচুর আরাম। ভাল কথা, কানু যেন প্লেনের টিকিটটা কেটে রাখে।”
”ওখানেও কি জেলখানা?”
”বুঝতে পারছি না, কয়েক ঘণ্টা তো এসেছি। আজকের দিনটা দেখে বুঝতে পারব।”
”পিসিকে কিছু বলতে হবে?”
”না, না, কিছু বলার দরকার নেই। শুয়ে থাকতে দে। মনে হয় না বটা বিশ্বাস বাড়িতে এসে গোলমাল করবে, এখন রাখছি।”
গেস্টরুমগুলোর লাগোয়া, ঘরের মাপের একটা ডাইনিং স্পেস। ছ’জনের জন্য একটা টেবিল। পরদা টেনে দিলেই এই খাবার জায়গাটা বসার জায়গা থেকে আলাদা হয়ে যায়। টেবিলে দেবু থরে থরে খাদ্য সাজিয়ে রেখেছে। বিশাল এক বৌলে স্যালাড। আপেল, কলা, আঙুর, স্তূপ করা। বাটিভরা মাখন আর জেলি। প্লেটে দুধে ডোবানো কর্নফ্লেকস। ধরে ধরে সাজানো সেঁকা পাউরুটি। কড়াপাকের সন্দেশ।
দুলাল ছুরি দিয়ে মাখন লাগাচ্ছে রুটিতে, এক একটা স্লাইসে প্রায় একশো গ্রাম। তুষার বিরক্ত চোখে মাখনের বাটিটা পাওয়ার জন্য তাকিয়ে রয়েছে দুলালের দিকে। বুকু অবাক হয়ে গেল সমীরণকে দেখে।
”তুই! এখানে?”
”কাল রাত্তিরে এসেছে”, তুষার একদৃষ্টে মাখনের বাটির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ”কীরে দুলে, রুটির ওপর মাখনের ড্রিবলিং অনেকক্ষণ তো চালাচ্ছিস, এবার পাসটা বাড়া।”
”তুই জেলি মাখানো শুরু কর না। ওভারল্যাপটা কখনওই ঠিক সময়ে তোর দ্বারা আর হয়ে ওঠে না। আচ্ছা এই নে।”
দুলালের ঠেলে দেওয়া মাখনের বাটিটার দিকে হতাশ চোখে তাকিয়ে তুষার বলল, ”এটা নিয়ে করব কী! কিছুই তো রাখিসনি। চিরকালই তোর ফাইনাল পাসটা এমন জায়গায় হয় যে, গোল আর করা যায় না। সন্দেশের প্লেটে কিন্তু হাত দিবি না বলে রাখলুম।”
