কী বা অন্ধকার কী বা আলো, ইলেকট্রিক মাঠটাকে সমীরণ চেনে তার হাতের রেখাগুলোর মতো। তার একটাই শুধু ভয় ছিল, কাছাকাছি কুকুরগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে কি না। রাস্তার দিকে এগোতে এগোতে সে খুঁজল মোটরগাড়ি। যে মারুতিটায় ঘুনুদা এসেছিলেন নিশ্চয় সেটাতেই আসবেন। কুকুরের ডাক উঠল না, তবে ছোট্ট করে একবার হর্ন বেজে উঠল। অন্ধকারে ঘাপটি মেরে থাকা মোটরের ছায়া দেখে সে হনহনিয়ে এগিয়ে গেল।
”ঢুকে পড়।” দরজা খুলে মিষ্টি স্বরে ডাক দিলেন। গাড়ির এঞ্জিন চালু হয়ে গেছে। সমীরণ পেছনের সিটে বসে দরজা বন্ধ করার আগেই গাড়ি ছেড়ে দিল।
”কোনও ঝামেলা হয়নি?” ঘুনু শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন। ভি আই পি রোডে পড়ে ডান দিকে সবেগে বাঁক নিয়েই নির্জন রাস্তায় মারুতি প্রায় উড়ে চলল।
”ছেলেগুলো আমাদের বাইরের বারান্দায় ঘুমোচ্ছে। কাল সকালে যখন জানতে পারবে, কী যে তখন করবে কে জানে।”
”কিছু করতে পারবে না। তোর পিসিকে যতটুকু বুঝেছি তাতে এটুকু বলতে পারি, হাড়গোড় আস্ত রেখে সবকটা যদি ফিরে যেতে পারে তা হলে সেটা হবে ওদের বাপের ভাগ্যি।”
”ঘুনুদা, এখন কোথায় যাচ্ছি?”
”যেখানে তুই সবথেকে নিরাপদ থাকবি পতুর বাড়ি।”
এতক্ষণে সমীরণের খেয়াল হল, পেছনের সিটে আর—একজন বসে রয়েছে। অন্ধকারে তাকে চিনতে পারল না।
”আমি দুলালদা।”
সমীরণ ‘অ্যাঁ’ বলে চমকে উঠতে যাচ্ছিল। সামলে নিয়ে বলল, ”তুমিও সারথি ছাড়লে?”
”হ্যাঁ। নির্মাল্যদার জেতার কোনও আশা নেই।” দুলাল মৃদুস্বরে কথাটা বলে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল।
উল্টোডাঙা মোড়, ফুলবাগান, বেলেঘাটা রোড, কনভেন্ট রোড হয়ে সি. আই. টি. রোড এবং পতু ঘোষের বিরাট পাঁচতলা বাড়ির গেট দিয়ে মারুতি যখন ঢুকল তখন রাত আড়াইটে।
সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে পর পর দুটো দরজা। বাঁ দিকেরটির ডোর বেল বাজিয়ে ডান দিকের দরজাটি দেখিয়ে ঘুনু বললেন, ”পতুর প্রাইভেট ড্রইংরুম। অবশ্য ভেতর দিয়েও ওদিকে যাওয়ার দরজা আছে।”
ঘুম—চোখে দরজা খুলল অল্পবয়সি একটি ছেলে। ভেতরে ঢুকে সমীরণ ঘরটা দেখল। দেয়াল থেকে দেয়াল কার্পেট, তাতে পা ডুবে যায়, এত পুরু আর নরম। নিচু টেবিল, কোচ, সোফা, টিভি, টেবিল ল্যাম্প, এয়ার কুলার, আলমারিতে বই, দেয়ালে কয়েকটা পেইন্টিং, রেফ্রিজারেটর, ইনভারটার, জানলায় মেঝে—ছোঁয়া ভারী পরদা। তার দেয়ালে বিচিত্র লাইট শেড। এটা বসার ঘর। এর একদিকের দেয়ালে পাশাপাশি দুটি ঘরের দরজা।
ঘুনু ব্যস্ত হয়ে বললেন, ”দেবু, খাবারদাবার কী আছে?”
”বিরিয়ানি আর কড়াপাকের সন্দেশ আছে।”
”নাকু?”
”না, না, ঘুনুদা, আমি খেয়ে এসেছি।”
”লজ্জা করিস না। এখানে অঢেল ব্যবস্থা। যা খেতে ইচ্ছে করবে দেবুকে বলবি। তুষার তো কাল থেকে শুধু ফিশফ্রাই আর চিনে খাবারই খেয়ে যাচ্ছে।”
”তুষারদা এখানে?”
”বুকুও তো রয়েছে। কড়াপাক বোধ হয় ওর জন্যই আনা?” ঘুনু তাকালেন দেবুর দিকে।
”আজ পঁচিশটা এনেছি, বুকুদা পনেরোটা খেয়ে নিয়েছে।”
”ভাল। গরিবের ছেলে তো, একটু খাই খাই ভাব রয়ে গেছে। নাকু তুই দুলালের সঙ্গেই এক ঘরে থাক।” পকেট থেকে নস্যির ডিবে বের করলেন।
”আগে একটা টেলিফোন করব পিসিকে।”
”টেলিফোন? কিন্তু ওটা তো ওদিককার ড্রইং রুমে। দরজার চাবি দেওয়া।” ঘুনু আমতা আমতা করলেন। ”কাল সকালে করিস।”
দেবু একবার ঘুনুর মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ সিলিংয়ে তুলল। দুলাল বলল, ”ঘুম পাচ্ছে, আয়।”
”আমি এখন বাড়ি যাচ্ছি, কথাটথা কাল হবে। অবশ্য বলার মতো কথা আর কীই—বা আছে। নিজেই এলি, এতে আমার কী আনন্দই যে হচ্ছে। তোর কোনও ব্যাপারে কোনও অসুবিধা হবে না। ক্লাব পলিটিক্স কলকাতায় কী রকম হয় তা তো জানিসই। সুবোধ কি সীতেশ চেষ্টা করবে তোকে খচাবার, কিন্তু পারবে না। যা এখন, শুয়ে পড়।”
ঘুনু চলে গেলেন। দুলালের সঙ্গে ঘরের মধ্যে পা দিয়েই সমীরণের মনে হল কোনও ফাইভ স্টার হোটেলের ঘরে যেন সে ঢুকল।
”পুতুদার গেস্টরা এসে এখানে থাকে, সেইভাবেই সাজানো। কেমিক্যাল ফার্টিলাইজার, কয়লা আর স্টিল… কোটি কোটি টাকা।” দুলাল সসম্ভ্রমে বলল পাজামা পরতে পরতে। ”কিন্তু মানুষটাকে দেখে তোর মনেই হবে না, এত টাকার মালিক। ব্যবসার কাজে এখন কানপুর গেছে… তুই কতয় এলি?”
”দুই—দশ অফার দিয়েছেন ঘুনুদা।”
”রাজি হয়ে ভালই করেছিস। সারথিতে থাকলে পুরো টাকা কখনওই পেতিস না। আমি এখনও পনেরো হাজার পাব, কিন্তু বটা বিশ্বাস আটকে রেখেছে। যাত্রী দেবে পৌনে দুই, ওখানের থেকে পঁচিশ বেশি।”
”দুলালদা, এখন এসব টাকাপয়সার কথা থাক। তিনটে বাজতে চলল, এবার শোব।” সমীরণ বালিশটা কার্পেটের ওপর ছুড়ে দিয়ে বিছানা থেকে বেডকভারটা তুলে নিল।
”তুই মেঝেয় শুবি?”
”নিশ্চয়ই। ওই ফোম রবারের ওপর শুলে আরাম পাওয়া যায়, কিন্তু শরীরটার তেরোটা বাজবে। এই এয়ার কুলারের ঠান্ডাটা খুবই আরামের, তবে আমার পছন্দ পাখার হাওয়া।”
”এয়ার কুলার কিন্তু আমি বন্ধ করব না।” দুলাল বেশ কড়া গলায় সমীরণকে জানিয়ে দিল।
”আলো নেভাব?”
”হ্যাঁ।”
আলো নিভিয়ে, স্লিপিং সুট পরা সমীরণ বেডকভারটা গায়ের ওপর টেনে কার্পেটের ওপর শুয়ে পড়ার কিছুক্ষণ পর দুলাল বলল, ”সমীরণ, একটা কথা বলব?”
