”আলোটালো নেই তো? অন্ধকার তো?”
”একদম ঘুটঘুটে।”
”এখন আর বেশি কথা নয়। আমি ওই মাঠের ধারে, রাস্তায় গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করব, ঠিক দুটোয়।”
”আপনি চিনে আসতে পারবেন মাঠে?”
”আরে, আমি ঘুনু মিত্তির। তারামা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের গা দিয়ে শহিদ কলোনির দিকে যাওয়ার রাস্তা, মাঠটা তো তার ওপরই। বরেন মুখোটি ওই মাঠেই ট্রেনিং করায় না?”
”হ্যাঁ।”
”হুঁ হুঁ বাবা, এ হল ঘুনু মিত্তিরের মেমারি। শোন, ঠিক দুটোয় নেমে আসবি। ছেলেগুলো তখন কোথায় কী অবস্থায় রয়েছে আগে সেটা দেখে নিবি। ছাড়ছি। ঠিক দুটোয়।”
তিনজন হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে। সমীরণ ব্যস্ত হয়ে বলল, ”ব্যাগটা কোথায়? শার্ট, প্যান্ট, টুথব্রাশ, চিরুনি, তোয়ালে, শেভিংকিট…পিসি হাজার তিনেক টাকা কাল কানুকে দিয়ে আমার জন্য প্লেনের টিকিট কেটে রাখবে। কানু, একুশ তারিখের কোঝিকোড়ের টিকিট, ভায়া বোম্বে, একদিনেই তা হলে পৌঁছতে পারব। না পেলে বাঙ্গালোরের, ওখান থেকে ঘণ্টা দশেকের বাস—জার্নি। ঘুনুদা ঠিক দুটোয় ইলেকট্রিক মাঠের ঘরে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করবেন। আমি ছাদ থেকে নেমে গিয়ে গাড়িতে উঠব।”
”উঠে কোথায় যাবি?” উৎকণ্ঠিত প্রশ্ন রেখা গুপ্তর।
”জানি না।”
সমীরণ ঘরে ঢুকে গেল। আলো জ্বালবে কি জ্বালবে না ভাবতে ভাবতে জ্বেলেই ফেলল। জানলার পরদা সরিয়ে দিয়ে কাঁধে ঝোলানোর পলিথিন ট্রাভেলিং ব্যাগটা আলনা থেকে নামাল। রাস্তা থেকে তাকে দেখা যাচ্ছে। স্লিপিং সুট ব্যাগ থেকে বের করে নাড়াচাড়া করল। সে যে এখন ঘুমোতে যাচ্ছে, এটা যেন ওরা বুঝে যায়। আলো নিভিয়ে ডোরাকাটা পাজামা আর ঢিলে জামাটা পরে নিয়ে আবার আলো জ্বালাল। এইসব করার সময় সে একবারও বাইরের দিকে তাকাল না।
শ্যামলাকে ডেকে এক গ্লাস জল চাইল। জল খেয়ে গ্লাসটা ওর হাতে দেওয়ার সময় সে বলল, ”তোরা খেতে বোস টেবিলে, আমারটা এখানে দিয়ে যা, ওদের দেখিয়ে দেখিয়ে খাব, শোব, তুই মশারিটা ফেলে গুঁজে দিবি, আলো নেভাবি। সব যেন নর্মাল ভাবে হয়। আর শোন, ছাদ থেকে নামার জন্য একটা শাড়ি কি বেডকভার ঠিক করে রাখ। ঠিক দেড়টায়, সারা বাড়ি যেন অন্ধকার থাকে।”
।। ৮।।
বাড়ি অন্ধকারই ছিল। জানলার পরদা অল্প সরিয়ে হিমাদ্রি এবার—ওধার তাকিয়ে শুকনো গলায় বলল, ”কাউকে তো দেখছি না।”
”সর, আমি দেখছি।” শ্যামলাও রাস্তার দু’ধারে তাকিয়ে মাথা নাড়াল। কাউকে সে দেখতে পাচ্ছে না। জানলার ধার ঘেঁষে মাথাটা চেপে, এক চোখ দিয়ে বাঁ দিকটা দেখতে দেখতে সে এবার অস্ফুট শব্দ করে ছিটকে সরে এল।
”কী কাণ্ড! ওরা আমাদের বাইরের বারান্দায় শুয়ে রয়েছে।”
”ভালই হয়েছে। পাঁচজনই আছে কি?” হিমাদ্রির গলায় খুশি ফুটে উঠল।
”সবটা তো দেখা যায় না, তা ছাড়া রাস্তার আলোও তো কম।” শ্যামলার চাপা স্বর।
”দরজা জুড়ে শুয়েছে পালানোর পথ বন্ধ করার জন্য। এভাবেই যেন শুয়ে থাকে। দাদা চটপট এবার রেডি হয়ে নে।”
”রেডিই আছি। এই স্লিপিং সুট পরেই চলে যাব। একটা বেডকভারেই তো হয়ে যাবে, আর—একটা জোড়ার দরকার কী?”
”দরকার আছে। কানু ছাদ থেকে ঝুলিয়ে দেখেছে জমির অনেক ওপর পর্যন্ত থেকে যাচ্ছে। লাফিয়ে পড়লে শব্দ হবে।” রেখা গুপ্ত বেডকভারটা আঁকড়ে বললেন, ”আমি আর—একটা বেঁধে নিয়েছি। ছাদে চল। আর শোন, যেখানেই যা, পৌঁছেই ফোন করে জানাবি কিন্তু।”
সুনীলবরণের ঘরের দরজা বন্ধ। চারজন নিঃসাড়ে ঘরটা পেরিয়ে পাঁচিলের ধারে এল। নীচেই বাড়ির পেছনে সরু গলি। তারপর পাঁচ ফুট উঁচু সীমানার পাঁচিল। ওটাও সমীরণকে টপকাতে হবে এবং বহুবারই সে এটা করেছে মাঠে যাওয়ার জন্য শর্টকাট করতে গিয়ে।
বেডকভার ঝুলিয়ে হিমাদ্রি আর শ্যামলা ধরে রইল। কাঁধে ব্যাগটা নিয়ে সমীরণ কার্নিসে নেমে বেডকভার আঁকড়ে সন্তর্পণে একটা পা প্রথমে ঝোলাল। পা রাখার মতো জায়গা নেই।
”দুর্গা, দুর্গা।” পাঁচিলে ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে রেখা গুপ্ত ভাইপোর মাথা স্পর্শ করলেন।
হিমাদ্রি ও শ্যামলা প্রাণপণে টেনে রয়েছে। প্রায় সত্তর কেজি ওজনের টান সামলাতে দু’জনেরই দাঁতে দাঁত লেগে গেছে।
”আহহ”, সমীরণ কাতরে উঠল।
”কী হল নাকু?” রেখা গুপ্ত ঝুঁকে পড়লেন।
”একটু টেনে তোলো, একটা শিক, তাড়াতাড়ি, লাগছে।
রেখা গুপ্ত প্রায় লাফিয়েই এসে বেডকভার ধরলেন। তার ধাক্কায় হিমাদ্রির মুঠো আলগা হয়ে গেল। অবশ্য পিসির মুঠো ততক্ষণে শক্ত করে ধরে ফেলেছে। একটা টানেই তিনি সমীরণকে প্রায় দু’হাত তুলে নিলেন।
”কানু জিজ্ঞেস কর, আর তুলব?”
হিমাদ্রি পাঁচিলে ঝুঁকে ফিসফিস করে ফিরে এল। ”এইভাবে ধরে থাকতে বলল।”
রেখা গুপ্ত বেডকভার ধরে শরীরটা প্রায় চল্লিশ ডিগ্রি পেছনে হেলিয়ে দিলেন। টানটান বেডকভার হঠাৎই ঢিলে হয়ে গেল, আর রেখা গুপ্ত ছাদের ওপর চিত হয়ে পড়লেন, শ্যামলাকে বুকের ওপর নিয়ে।
”নাকু তা হলে এখন মাটিতে।” রেখা গুপ্তর প্রথম প্রতিক্রিয়ায় আশ্বস্তের ভাগটাই বেশি। ধড়মড়িয়ে উঠে তিনি পাঁচিলের কাছে যাওয়ার আগে, বেড়ালের মতো লাফিয়ে পাঁচিল টপকে সমীরণ ইলেকট্রিক মাঠে নেমে পড়েছে।
তিনজন তীক্ষ্ন নজরে অন্ধকার চিরে চিরে সমীরণকে খুঁজে পেল না। একটু পরে মোটর স্টার্ট দেওয়ার ক্ষীণ শব্দ পেয়ে শ্যামলা তালি দিয়ে উঠল। হিমাদ্রি বলল, ”সেফলি পৌঁছে গেছে।” রেখা গুপ্ত জোড়হাত কপালে ঠেকালেন।
