”বেশ তাহলে ট্রায়াল নেওয়া হোক।”
হরিচরণ মুখ ফেরাল এতক্ষণে। কোনিকে আপাদমস্তক দেখে বলল, ”মেয়েটি কে?”
”আমার চেনা মেয়ে। গুড মেটিরিয়াল। স্ট্রোক শেখাতে হবে।”
”গুড মেটিরিয়াল!” হরিচরণ ঠোঁট বেঁকিয়ে শব্দগুলো দুমড়ে মুখ থেকে বার করল। কোনিকে আর একবার দেখে নিয়ে, গম্ভীরস্বরে বলল, ”এ ক্লাবের কাউকে স্ট্রোক শেখাতে হলে শেখাবে ক্লাবেরই ট্রেনাররা। কাল সকালে আসুক। বন্দনা কি টুনু ওর ট্রায়াল নেবে।”
ক্ষিতীশ কয়েক সেকেন্ড হরিচরণ ও প্রফুল্লর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ”আচ্ছা।”
বেরিয়ে এসে কোনি বলল, ”কি হল, ভর্তি করাল না?”
”পরীক্ষা দিতে হবে। কোনি আমাদের দুজনকেই পরীক্ষা দিতে হবে।”
কথাটা বুঝতে পারল না কোনি। সে আবার জিজ্ঞাসা করল, ”দুজনকেই! কেন, আপনি সাঁতার জানেন না?”
”সাঁতার নয়, আমাকে পরীক্ষা দিতে হবে অপমান সহ্য করার।”
ক্ষিতীশ জলের ধারের রেলিংয়ের দিকে এগিয়ে গেল। দুটি ক্লাবের প্রায় চারশো ছেলে কমলদিঘিতে দাপাদাপি করছে, কয়েকটি মেয়েও আছে। দুটো ডাইভিং বোর্ডে কয়েকটি ছেলে। তারা জলে লাফাচ্ছে নিছকই লাফাবার জন্য। বিষণ্ণচিত্তে ক্ষিতীশ মাথা নাড়ল। কাজের কাজ কেউই করছে না। সুহাস জলে নামছে। একবার সে তাকাল মাত্র তার দিকে।
হরিচরণ ক্লাব অফিসের জানলা থেকে চেঁচিয়ে বলল, ”সুহাস, দুটো ফোর হানড্রেড তারপর হানড্রেড বাটারফ্লাই, ব্যাক অ্যান্ড ব্রেস্টস্ট্রোক ইচ, মনে আছে তো?”
সুহাস ঘাড় নাড়ল।
ক্ষিতীশ হাসল। মাত্র এগারোশো মিটার, এই ট্রেনিংয়ে এরা উন্নতি করবে! তবে সুহাসের স্ট্রোক নিখুঁত। ক্ষিতীশ বলল ”কোনি ওই যে ছেলেটা জলে নামল ওকে লক্ষ করো, দেখো কেমনভাবে হাত পাড়ি দেয়।”
কোনি একাগ্র হয়ে তাকিয়ে রইল সুহাসের সাঁতারের দিকে। ক্ষিতীশ এক সময় বলে উঠল, ”হাতটা মাথার ঠিক সামনে জলে ঢুকে সামনে চলে যাচ্ছে, তারপর নীচে নামছে, তারপর টেনে ঊরু পর্যন্ত আনছে। সব থেকে দরকার স্পীডে হাত চালানো। তার মানে এলোপাথাড়ি গঙ্গায় যেভাবে করো তা নয়। সুন্দরভাবে জলে হাতের ঢোকাটা আর শক্ত কব্জি খুব দরকার। আসল স্পীডটা আসে কাঁধের, পিঠের আর হাতের মাসলের শক্তি থেকে। এজন্য তোমার একসারসাইজ করতে হবে। এই শক্তিটাকে গুছিয়ে কাজ করালে তবেই স্পীডটা আসবে। মাথাটা কিভাবে রয়েছে দেখেছ? তুমি যেমন এধার ওধার নাড়াও, সেই রকম করছে কি? মুখ জলে ডুবিয়ে কেমন এগোচ্ছে। শুধু নিঃশ্বাস নেবার জন্য মাথাটা, ওই দ্যাখো পাশে ঘোরাল। বেশি মাথা নাড়ালে স্পীড কমে যায়। কাঁধটা জল থেকে উঠে আছে।”
কোনি শুনছে কি শুনছে না বোঝা গেল না। সাঁতারুর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ সে বলল, ”আচ্ছা ওই মেয়েটার নাম কি?”
ক্ষিতীশ একটু হতাশ হয়েই বলল, ”জানি না।”
”ওর কস্ট্যুমটা কিসের, গেঞ্জির?”
”নাইলনের—খুব দামি।”
‘খুব সুন্দর রঙটা।”
ক্ষিতীশ কি যেন ভেবে নিয়ে বলল, ”তোমাকে কিনে দেবো একটা—”
কোনি ঘুরে দাঁড়াল। চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে।
”যেদিন তুমি ওই রকম স্ট্রোক দিতে শিখবে।” ক্ষিতীশ আঙুল দিয়ে সাঁতরে যাওয়া সুহাসকে দেখাল।
কোনি তীক্ষ্ন চোখে সুহাসের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, ”দু’দিনে শিখে নেব।”
”ভাল। কাল সকাল ঠিক সাড়ে ছ’টায় আজ যেখানে দাঁড়িয়েছিলে, সেখানে দাঁড়াবে। কস্ট্যুম সঙ্গে আনবে। পাশ তুমি করে যাবেই, সেজন্য ভাবছি না। কিন্তু স্ট্রোক শেখানোর ভার পান্না কি নির্মলের উপর যদি পড়ে তাহলে তো সব মাটি হয়ে যাবে।”
কিন্তু কোনি পাশ করেও ভর্তি হতে পারল না।
সকালে ক্ষিতীশ দাঁড়িয়ে পরীক্ষা নেওয়া দেখল। কোনি অনায়াসে দু’শো মিটার সাঁতরালো, জলে দু’হাত তুলে রইল, ঝাঁপ দিল ডাইভিং বোর্ডের নীচতলা থেকে।
বিকেলে অফিস ঘরে প্রফুল্ল তাকে বলল, ”সম্ভব নয়, আর মেম্বার নেওয়া যাবে না। সেক্রেটারির স্ট্রিক্ট অর্ডার। জলে আর হাত—পা ছোঁড়ারও জায়গা নেই, এত ভীড়। আজকেই তো দুজনকে রিফিউজ করতে হল।”
”তাহলে আগেই সেটা আমাকে বলা হল না কেন?” ক্ষিতীশ রাগে ফেটে পড়তে গিয়েও সামলে নিল।
”বলার কথাটা মনে ছিল না।”
বন্দুকের নল থেকে বেরিয়ে আসার মতো ক্ষিতীশ ক্লাব থেকে বেরিয়েই দেখল স্টার্টিং প্ল্যাটফর্মে হরিচরণ দাঁড়িয়ে। কথা বলছে, দুটি ছেলের সঙ্গে।
”হরিচরণ” ক্ষিতীশ চীৎকার করে উঠল, ”চিফ ট্রেনার হতে চেয়েছিলিস, হয়েছিস। এরপরও এসব কি হচ্ছে?”
হরিচরণ বিরক্তিভরে ফিরে তাকিয়ে বলল ”কি আবার হচ্ছে?”
”আমার মেয়েটাকে ভর্তি করলি না কেন?”
”প্রফুল্লের কাছে যাও।”
”ওসব ছেঁদো ওজর অনেক শোনা আছে। তবে এই বলে রাখলুম, দেখবি ওই মেয়ে তোদের মুখে চুনকালি দেবে। সেদিন আফসোস করবি।”
”ওই মেয়ে, যাকে কাল এনেছিলে! ভালো, ভালো, তাই দিক। একটা মেয়ে সুইমার বেঙ্গল পাচ্ছে তাহলে!”
”বেঙ্গল নয়, ইন্ডিয়া পাবে।” রেলিংয়ে ধরা মুঠোটা শক্ত করে নিজেকে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে ক্ষিতীশ ভাঙ্গা গলায় চেঁচিয়ে যেতে লাগল, ”ওলিম্পিকের গুল মেরে সুইমার তৈরী করা যায় না রে, ধরা একদিন পড়বিই।”
প্রফুল্ল ক্লাব থেকে বেরিয়ে এল।
”কি আবোলতাবোল চীৎকার করছ ক্ষিদ্দা।”
”বেশ করছি। কর্পোরেশনের জমিতে আমি দাঁড়িয়ে। তোদের ইতরোমোটা শুধু দেখছি। মেয়েটাকে তোরা ভর্তি করলি না, ভেবেছিস আর বুঝি ক্লাব নেই। পৃথিবীতে শুধু জুপিটারই একমাত্র ক্লাব।”
