বাঁ দিক থেকে তিনজন বেড়াবার মতো শ্লথভঙ্গিতে আসছে। দূর থেকে গলার আওয়াজ ভেসে এল, ”অ্যাই, অ্যাই।”
ওরা তিনজন ঘুরে দাঁড়াল। সমীরণ মুখটা একটু তুলে দেখতে পেল, লুঙ্গি আর গেঞ্জিপরা জি.সি. দত্তর দশাসই চেহারাটি বেগিং—এর গতিতে এগিয়ে আসছে।
”কে তোমরা এখানে এত রাতে কী করছ?” দত্তর উচ্চ স্বরে দুটো বাড়ির বারান্দায় লোক টেনে আনল, একতলার জানলা খুলিয়ে দিল।
তিনজন কী জবাব দিল সমীরণ তা শুনতে পেল না। দত্ত যে জবাবে একদমই সন্তুষ্ট হননি, সেটা তাঁর আচরণে প্রকাশিত হল। খপ করে তিনি পুলিশি কায়দায় দু’জনের জামার কলার ধরলেন।
”আমাকে ধোঁকা দেবে? তোমাদের উদ্দেশ্য আমি বুঝিনি ভেবেছ? এত বছর পুলিশে—” কথা অসমাপ্ত রেখে জি. সি. দত্ত হঠাৎই কণ্ঠস্বর বদলে, ”অ্যাই, অ্যাই কী হচ্ছে।” বলতে বলতে দু’হাতে লুঙ্গি চেপে ধরলেন। তারপরই ”য়্যা—আ—আ” ধরনের একটা শব্দ তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত মাথার ওপর ওঠালেন। লুঙ্গিটি তখন তাঁর পায়ের গোছে নেমে এল।
জি.সি. দত্ত কাতরকণ্ঠে কী যেন বললেন। বাপির গলা শোনা গেল, ”তুলে বেঁধে দে।”
একজন লুঙ্গিটা তুলে দত্তর কোমরে গ্রন্থিবদ্ধ করে দিল। সমীরণ এইবার দেখতে পেল বাপির হাতের পিস্তলটা। বাপি কিছু একটা বলল। দত্ত দু’হাত তোলা অবস্থাতেই ঘুরলেন। এই সময় দোতলার বারান্দাগুলো নিমেষে নির্জন হয়ে গেল, জানলার পাল্লাগুলো ফট ফট শব্দে বন্ধ হল। বাপি ঝুঁকে দত্তর কানে কিছু বলেই পিস্তলের নলটা দিয়ে খোঁচা দিল।
সঙ্গে সঙ্গে জি. সি. দত্ত দু’হাত তুলে বাড়িমুখো রওনা হলেন। একটা ব্যাপার সমীরণ বুঝতে পারছে, জি. সি. দত্ত পরোপকারী, আন্তরিক, দরাজ মানুষ, না হলে এইভাবে, ফোন পাওয়ামাত্রই বাড়ি থেকে বেরিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে ছুটে আসতেন না। কিন্তু পরিবর্তিত বাস্তবের সঙ্গে ওঁর তেমন কোনও যোগ নেই। উনি এখনও খোকাগুণ্ডার আমলেই রয়ে গেছেন, বাপিগুণ্ডাদের সম্মুখীন কখনও হননি।
ডান দিক থেকে দু’জন আসছে। সমীরণ মুখটা নামিয়ে নিল। তাদের বাড়ির সামনেই পাঁচজন দাঁড়াল। হাসাহাসি করল। একজন বলল, ”আরে, এখানে শিক্ষিত লোকেরা থাকে। কেউ ঝামেলা করবে না।”
আর—একজন বলল, ”বাপিদা খিদে পেয়েছে।”
”বাইরে বড় রাস্তায় দেখেছি তারামা না ফারামা নামে একটা দোকান রয়েছে, তোরা খেয়ে আয়। আচ্ছা, চল, আমিও যাচ্ছি, গোরা তুই তা হলে এখানে থাক। আবার কেউ হুজ্জত করতে এলে কিছু বলবি না, কাটিয়ে বেরিয়ে চলে আসবি।” বাপি গলা নামিয়ে কথা বলার দরকার আর বোধ করছে না। প্রতিটি কথা সমীরণ শুনতে পেল।
চারজন মন্থর গতিতে ভি আই পি রোডে মিষ্টির দোকানে খাওয়ার জন্য সুশোভন পল্লির প্রবেশপথের দিকে এগিয়ে গেল। সমীরণ ছাদ থেকে নীচে নামার সময় শুনতে পেল টেলিফোনে পিসি কথা বলছে।
”বলছেন কী দত্তবাবু?…আপনি দু’জনের ঘাড় ধরে…তা হলে ওদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই?…তা তো হবেই, আপনাকে আর চিনবে না।…হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলেন কী, খেলনা পিস্তল!…তাই বলুন, আচ্ছা আচ্ছা।”
টেলিফোন রেখে উদ্ভাসিত মুখে রেখা গুপ্ত কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন, সমীরণ তাঁকে থামিয়ে বলল, ”পিসি ঘুনু মিত্তির যে টেলিফোন নাম্বারটা দিয়ে গেল সেটা কোথায়? মলা, তুই টুকে রেখেছিস।”
”কেন, ঘুনু মিত্তির কী করবে?” রেখা গুপ্ত বিভ্রান্ত।
”এখন ওর বুদ্ধিটাই দরকার। বাপিদের মোকাবিলা ওকে ছাড়া সম্ভব নয়।” সমীরণ টেলিফোনের দিকে এগিয়ে গেল।
শ্যামলা ফোন নাম্বার লেখা কাগজটা দিতেই সমীরণ ডায়াল করল।
”হ্যালো, এটা কি পতিতপাবন ঘোষের বাড়ি?”
”হ্যাঁ, আপনি কে বলছেন?” সন্দিগ্ধ স্বরে প্রশ্ন এল।
”আমার নাম সমীরণ গুপ্ত, আমি ঘুনুদার সঙ্গে কথা বলতে চাই।”
ওধারে কিছুক্ষণ কথা বন্ধ। ফিসফিস করে কাকে তখন বলা হচ্ছে ”সমীরণ, সমীরণ গুপ্ত।”
”হ্যালো…।”
”ঘুনুদা তো এখানে নেই, বাড়িতে চলে গেছেন। আপনার কী দরকার বলুন।”
”ওঁর বাড়ির ফোন নাম্বারটা দিন, দরকারটা ওঁকেই বলব।”
নাম্বার লিখে নিয়ে ঘুনু মিত্তিরের বাড়িতে সমীরণ ফোন করল। ”হ্যালো” শুনেই সে বুঝতে পারল ঘুনুদা রিসিভার তুলেছেন।
”আমি নাকু বলছি।”
”বল। বটার ছেলেরা তো তোর বাড়িতে গেছে।” নিশ্চিন্তে চিবিয়ে চিবিয়ে ঘুনু বললেন।
”আমি সারথিতে থাকব না ঠিক করেছি। এখনই আমাকে বের করে নিয়ে যান।” কথাক’টি বলতে গিয়ে সমীরণের হাঁফ ধরল। টানটান হল হাতের পেশি। বুকের কাছে চিনচিন করে উঠল। তিন বছরের সম্পর্ক ছিঁড়ে ফেলতে কষ্ট তো হবেই। কিন্তু এখন দুঃখে মুহ্যমান হওয়ার সময় নেই।
ঘুনু কয়েক সেকেন্ড সময় নিলেন কথাগুলো মগজের ভেতর—দেশে চালানোর জন্য। চমকে উঠলেন না, উল্লসিত হলেন না, ধীর শান্ত গলায় বললেন, ”এখন তোর পজিশনটা কী?”
”বাড়িতে বন্দি। রাস্তায় পাঁচজন ঘোরাফেরা করছে। একজনের কাছে চেম্বার আছে।”
”অ। গোলমালের মধ্যে গিয়ে কোনও লাভ নেই। তুই যে—কোনওভাবেই হোক, আজ রাতেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবি? আমি গাড়ি নিয়ে থাকব কোথাও। এসব কাজে দেরি করতে নেই।”
”বেরোনো?” সমীরণ সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে বলল, ”ছাদ থেকে বাড়ির পেছনদিকে নেমে একটা মাঠ, ইলেকট্রিকের মাঠ।”
