বাবা, পিসিমা, কানু, মলা এদের আহত রক্তাক্ত দেহ পলকের জন্য তার চোখে ভেসে উঠেই অদৃশ্য হল। সে ফিসফিসিয়ে নিজেকেই বলল, ”আমার জন্য এরা কেন বিপদে পড়বে? হতে পারে না, তা হয় না। এদের বাদ দিয়ে আমি কেউ নই, আমার কোনও অস্তিত্বই থাকবে না।”
সমীরণ খাট থেকে উঠে আবার পরদা সরিয়ে দেখল। একজনও নেই। ব্যাপার কী! ওরা কী চলে গেল? দোতলার ছাদে গিয়ে কি একবার দেখবে? এইসব যখন সে ভাবছে, তখন ধীর গতিতে কথা বলতে বলতে দু’জন বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে গেল। একজনকে সে চিনল, নারান।
ওরা তা হলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সারারাতই কি ওরা ঘুরবে? সমীরণ ভেবে কুলকিনারা পেল না। সে পায়চারি শুরু করল।
হঠাৎ ডোর—বেল বেজে উঠল। সমীরণ লাফ দিয়ে পরদা সরিয়ে তাকাল। রাস্তা ফাঁকা। টিভি—তে হিন্দি খবর পড়ার শব্দ আসছে। বারান্দায় একটা কোণ দেখা যায় কোনওক্রমে। তার মনে হল পিসিরা বোধ হয় ফিরল।
দ্বিতীয়বার বেল বাজার সঙ্গেই দরজা খুলল সমীরণ। পিসি, মলা আর কানু দাঁড়িয়ে। প্রথমেই সে তিনজনের পেছনে ফটকের দিকে তাকাল। মনে হল রাস্তায় কেউ একজন সরে গেল।
”আর বলিসনি, ভটচাযদার যা কাণ্ড! পায়ের ওপর দিয়ে সাইকেল রিকশার চাকা চলে গেছে।” রেখা গুপ্ত হাসি চাপতে চাপতে বললেন।
”এমন চেঁচাচ্ছেন যেন পা’টা দু’খণ্ড হয়ে গেছে।” শ্যামলা বলল।
”দাদা, তোর কথাবার্তার কতদূর? কত অফার দিল?” হিমাদ্রি জানতে চাইল।
”বোসো সবাই। বিপদ হয়েছে। রাস্তায় কি কাউকে ঘুরে বেড়াতে দেখলে?” সমীরণের চাপা স্বর আর উৎকণ্ঠিত মুখ দেখে তিনজনের মুখের ভাবও বদলে গেল।
”কেন কী বিপদ হয়েছে? রেখা গুপ্তর গলা অজানা ভয়ে কেঁপে গেল।
”রাস্তায় দুটো লোক দেখলাম আমাদের পেছন পেছন আসছিল। আর ওই মোড়ে কুকুরওলা বাড়ির কাছে একটা লোক ছিল। তা ছাড়া তো আর কাউকে দেখলাম না।” শ্যামলা মনে করার চেষ্টা করতে করতে বলল।
”ওই লোকগুলো গুণ্ডা, পাঁচজন রয়েছে, বটা বিশ্বাসের লোক ওরা, আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে।”
”অ্যাঁ, কেন?”
”আস্তে কথা বলো, পিসি।” শ্যামলা চাপা ধমক দিল।
”ওরা সারারাত আমার ওপর নজরদারি করবে। কাল সকালে আমাকে সঙ্গে করে আবার বটা বিশ্বাসের কাছে নিয়ে যাবে।”
”কেন?” হিমাদ্রি জানতে চাইল।
”আমাকে সারথিতেই খেলতে হবে। ওরা ছাড়বে না। পিসির সঙ্গে কথা বলে কাল সকালে জানাব এই কড়ারে বাড়ি এসেছি। ওরা সঙ্গে এসেছে। পাছে আমি পালিয়ে যাত্রীর ঘরে গিয়ে উঠি, তাই সেটা আটকাবার জন্য ওরা রয়েছে। একজনের কাছে পিস্তল আছে দেখেছি।” সমীরণ ধীর নিচু গলায় কথাগুলো বলল। কেউ কোনও কথা বলল না। ঘটনার আকস্মিকতায় এবং চমকে কথা বলার অবস্থা কারও নেই।
”এটা কি মগের মুল্লুক?” হিমাদ্রি গর্জে উঠল। ”আমার ইচ্ছেমতো কি কোথাও খেলতে পারব না। ঘাড় ধরে খেলাবে আর আমায় খেলতে হবে।”
সমীরণ ভাইয়ের মুখের দিকে শুধু নীরবে তাকিয়ে রইল। রেখা গুপ্ত ব্যাকুলভাবে বললেন, ”পুলিশে খবর দিলে হয় না?”
”পুলিশ কী করবে?” সমীরণ বলল।
”ওদের অ্যারেস্ট করবে।”
”কোন অপরাধে?”
”তোকে জোর করে ধরে নিয়ে যেতে এসেছে বলে।”
”প্রমাণ কই যে, ধরে নিয়ে যেতে এসেছে? পুলিশ শুধু তো অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে অ্যারেস্ট করতে পারে না।” সমীরণকে হতাশ দেখাল। ”তা ছাড়া ওরা তোমাদের ওপরও হামলা করতে পারে। আমি যদি এখন পালিয়ে যেতে পারতাম—।”
”আচ্ছা পিসি, তোমাদের জি.সি.দত্ত তো পুলিশ অফিসার ছিলেন, ওঁকে বলে দেখলে হয় না?” শ্যামলা বলল।
”তিনি কী করবেন?” হিমাদ্রি কিঞ্চিৎ তাচ্ছিল্যভরে জানতে চাইল।
”উনি তো বলেন খোকাগুণ্ডা না কাকে যেন পিস্তল সমেত ধরে ফেলেছিলেন। তা এখানেও তো পিস্তল নিয়ে একজন রয়েছে, তাকে এসে ধরুন না, আর দাদাও বাড়ি থেকে সেই ফাঁকে বেরিয়ে যাবে।” শ্যামলা খুব সহজ একটা সমাধান পেশ করে প্রতিক্রিয়া লক্ষ করতে লাগল।
”এই রাতে বেরিয়ে কোথায় যাবে?” হিমাদ্রি বিশদ হতে চাইল।
”কোথাও একটা, এখানেই কারও বাড়িতে।” আমতা আমতা করে শ্যামলা বলল।
”তারপর?” সমীরণ জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
”মলা ঠিকই বলেছে, দত্তবাবু ধরুন বা না—ধরুন, ওদের ভয় তো দেখাতে পারবেন।” বলার সঙ্গে সঙ্গেই রেখা গুপ্ত ফোনের কাছে উঠে গেলেন।
”পিসি তুমি এদের চেনো না।” সমীরণ উঠে এল। ”এদের ভয় দেখানো দত্তবাবুর কর্ম নয়।”
রেখা গুপ্ত ততক্ষণে ডায়ালে পঞ্চাশ সংখ্যাটি ঘুরিয়ে ফেলেছেন। সমীরণ হালছাড়া ভাবে ঘরে এসে পরদা সরিয়ে বাইরে তাকাল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ওদের কাউকে দেখতে পেল না। তার বদলে স্বামী—স্ত্রী আর একটা বাচ্চচা ছেলেকে হেঁটে যেতে দেখল। ছাদে গিয়ে পাঁচিলের আড়াল থেকে কাউকে দেখা যায় যদি, এই ভেবে সে সিঁড়ির দিকে এগোল। পিসির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সে শুনল—”তা হলে আর বলছি কী, দারুণ গুপ্তা, আপনি যেমনটি পছন্দ করেন ঠিক সেইরকম।”
”পিসি বলো পিস্তলও আছে।” শ্যামলার ব্যগ্র স্বর।
”না, ওসব বললে দত্তবাবু খেপে যেতে পারেন।” রিসিভারে হাতচাপা দিয়ে মুখ ফিরিয়ে পিসিকে বলতে শুনল সমীরণ, সিঁড়িতে ঘোরার সময়।
সুনীলবরণের ঘরের দরজায় পরদা ঝুলছে। সামান্য ফাঁক, তার মধ্যে দিয়ে একনজরে সমীরণ দেখতে পেল টেবিলে ঝুঁকে বাবা কিছু লিখছেন। মোটা দু’খানা বই খোলা রয়েছে। সন্তর্পণে দরজা পার হয়ে গুঁড়ি মেরে সে চোখ দুটি শুধু পাঁচিলের কিনারে রাখল।
