বটা বিশ্বাসের ভ্রূ কুঁচকে উঠেই স্বাভাবিক হয়ে গেল। ”এজন্য তোকে পিসিমার সঙ্গে কথা বলতে হবে?”
পুলকেশবাবু বলে উঠলেন, ”তা কী করে হয়।”
অভয় কুণ্ডু বললেন, ”টেলিফোনে কথা বলে নে।”
”না, এসব কথা টেলিফোনে হয় না। আমাকে বাড়ি যেতেই হবে।” সমীরণের দৃঢ়স্বর বুঝিয়ে দিল তার সিদ্ধান্তের নড়চড় হবে না।
”তা হলে পিসিমার সঙ্গে কথা বলে আয়। অভয়বাবু, বাপিকে ডাকুন একবার, সমীরণকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আবার সঙ্গে করেই নিয়ে আসুক।” বটা বিশ্বাসকে হঠাৎ ক্লান্ত দেখাল।
”আজ রাতে আর আসা সম্ভব নয়, কাল সকালে এসে আপনাকে জানাব।” সমীরণ উঠে দাঁড়াল।
”তা হলে বাপির ছেলেরা সারারাত তোর বাড়ির সামনে পাহারা দেবে। না, না। অন্য কিছু নয়। ওরা সারথিকে যেমন ভালবাসে তেমনই তোকেও। তোর জন্য ওরা প্রাণ দিতেও পিছপা হবে না, তেমনই প্রাণ নিতেও। তুই সারারাত নিশ্চিন্তে থাকবি।” বটা বিশ্বাস সোজা সমীরণের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন শীতল দৃষ্টিতে। সমীরণ চোখ সরিয়ে নিল না। নিরুচ্চচার একটা চ্যালেঞ্জ বিনিময় ঘটল।
অভয় কুণ্ডুর অ্যাম্বাসাডরের পেছনের সিটে সমীরণ আর বাপি, ড্রাইভারের পাশে নারান নামে একটি ছেলে। পেছনে একটা ট্যাক্সিতে আরও তিনজন।
সিগারেট বের করার ছলে বাপি বুশশার্ট তুলে প্যান্টে গোঁজা পিস্তলটা বের করে সিটে রাখল।
”ওটা দেখাবার দরকার নেই, যথাস্থানে রেখে দাও।”
”না না, তোমাকে দেখাচ্ছি না।” বাপি অপ্রতিভ হয়ে ওটা তুলে নেয়। ”তোমার জন্য তো নয়, নিজেদের সেফটির জন্য এটা রাখতে হয়।”
এর পর সারা পথটাই সমীরণ সিটে হেলান দিয়ে বাঁ হাত কপালের ওপর রেখে চোখ বুজে রইল।
বাপি আর নারান মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যে কথা বলেছিল কিন্তু সমীরণের কানে তার একটা শব্দও ঢোকেনি।
।। ৭ ।।
মোটর থেকে নেমেই সমীরণ ফটক খুলে ভেতরে এসে ডোর—বেলের বোতাম টিপল। সব জানলায় পরদা টানা, খাবার দালানে শুধু আলো। পেছনে তাকিয়ে দেখল ফটকের সামনে পাঁচজন দাঁড়িয়ে তাকে লক্ষ করছে। সময় দেখার জন্য বারান্দার কিনারে এসে রাস্তায় আলোয় বাঁ হাতটা তুলল। আটটা বেজে দুই।
রাস্তা নির্জন। এখন টিভি—তে সিনেমা দেখানো হচ্ছে তাই একেবারেই শুনশান। তাদের দু’পাশের বাড়িগুলোর জানলা বন্ধ মশাদের ঢোকা আটকাতে।
আবার সে বেল বাজাল। বাড়িতে কি কেউ নেই? দরজার পাল্লায় কান লাগিয়ে সাড়াশব্দ পাওয়ার চেষ্টা করল। পিসির ঘরে বসে সবাই টিভি দেখতে থাকলে, অন্তত হিন্দি সিনেমার নাচগান কি মারপিটের আওয়াজ তো ভেসে আসবে। তাও আসছে না। টিভি বন্ধ।
হঠাৎ দরজার পাল্লা খুলে গেল। সুনীলবরণ। বাবাকে দেখে সমীরণ হতভম্ব।
”কী ব্যাপার, আপনি? ওরা সব গেল কোথায়?” একবার পেছনে তাকিয়ে, ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে সমীরণ বলল। সব ঘর অন্ধকার, শুধু আলো জ্বলছে খাবার দালানে।
”কানু, মলা আর রেখা গেছে অনিরুদ্ধ ভটচাজ মশায়ের বাড়িতে। ভদ্রলোক সাইকেলের ধাক্কায় পা ভেঙেছেন বিকেলে। ওরা দেখতে গেছে।” সুনীলবরণ সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করলেন।
সমীরণ দ্রুত ভাবতে শুরু করল। এখন কী করা যায়। কার্যত সে এখন গৃহবন্দি। বাড়ি থেকে বেরোতে গেলেই ওরা তাকে জোর করে ভেতরে ঢুকিয়ে দেবে। সকালে ওদের পাহারাতেই বটা বিশ্বাসের খোঁয়াড়ে গিয়ে ঢুকতে হবে।
অসম্ভব।
যদি বলি সারথিতে খেলব না, তা হলে জোর করে আটকে রাখতেও পারে। কিন্তু বাইশের মধ্যেই তাকে কোঝিকোড় পৌঁছতে হবে, যেভাবেই হোক। ইন্ডিয়া টিমের জন্য ক্যাম্প তো টানা সারা বছর ধরে চলবে না, প্লেয়ারদের ছেড়ে দেবে। তখন কলকাতায় এসে খেলতেই হবে। সমীরণ দোটানায় পড়ল। খেললে হয় সারথিতে, নয় যাত্রীতে। দুটো ক্লাবের যেটাতেই সে খেলুক, আই এফ এ—তে নাম রেজিস্টার্ড করতেই হবে। সে শুনেছে ক্যাম্পের প্লেয়ারদের অন্য নিয়ম হয়েছে নির্দিষ্ট দিনের পরেও এটা করা যাবে।
সে ঘরে গিয়ে সন্তর্পণে জানলার পরদা সরিয়ে বাইরে তাকাল। একজনকে দেখতে পেল, রাস্তার ওধারে রঙের ব্যবসায়ী অমিয় চাটুজ্যের ফটকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। বাকি চারজনকে সে দেখতে পেল না। বোধ হয় ঘুরে বেড়াচ্ছে। একসঙ্গে সবাই জটলা করলে লোকে সন্দেহ করতে পারে ডাকাত বলে। তবে সমীরণ নিশ্চিত, এখানকার সব লোকই শিক্ষিত, অতএব ডাকাত ধরার চেষ্টা করবে না। সেজন্য একটু সাহস দরকার।
কিন্তু এভাবে কোনও ক্লাবে খেলার কথা এখন সে ভাবতে পারছে না। যদি সকালে ওদের সঙ্গে যেতে সে অস্বীকার করে? সমীরণ বুঝে উঠতে পারছে না, তা হলে কী ঘটনা তখন ঘটতে পারে। শুনেছে বছর ছয়েক আগে নাকি হেদায়েত আলিকে নিয়ে এইরকম একটা ব্যাপার ঘটেছিল। যাত্রীতে যেতে চেয়েছিল হেদায়েত, জুপিটার তাকে সুবোধ ধাড়ার পটলডাঙার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছল বোমা ফাটিয়ে। রাস্তার একটা লোক তাইতে মারাও যায়। ধাড়ার একতলাটা তছনছ করে দিয়েছিল।
যদি এরাও তাই করে। সমীরণের মাথার মধ্যে অসাড় হয়ে আসছে। অন্ধকার ঘরে খাটে বসে সে দু’হাতে মাথা চেপে ধরল। কেউ তাকে চাপা স্বরে এখন পরামর্শ দিল, ”পালিয়ে যা, এখান থেকে যেভাবেই হোক, পালিয়ে যা। আজ রাতেই।” বটা বিশ্বাসের কথাটা এখন ভীষণভাবে তার মনে পড়ল। ”তোর জন্য ওরা প্রাণ দিতেও পিছপা হবে না। তেমনই প্রাণ নিতেও।” কথাগুলোর মানে খুবই স্পষ্ট।
