”মেম্বার চায় ট্রফি। ট্রফি পাইয়ে দিলে কোচ কার ছেলে কার নাতি এসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামাবে না।” সমীরণ বিরক্তি চেপে বলল।
এবার পুলকেশবাবু আসরে নামলেন। চাপা গলায়, খুবই গোপন কথা ফাঁস করে দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, ”বাংলার কোচ হয়ে হেমন্ত সন্তাোষ ট্রফি নিয়ে এল মাদ্রাজ থেকে, সে তো স্রেফ চুরি করেই, বাঁকা পথে। এখন এ আই এফ এফ সেক্রেটারি পদ্মনাভন তো মাদ্রাজেরই লোক। সে তো বলেইছে, বাংলাকে এর মাশুল গুনতে হবে। সেই হেমন্তকে সারথির কোচ করলে, তুমি কি ভেবেছ পদ্মনাভন খুব গদগদ হয়ে আমাদের সুনজরে দেখবে?”
”কার্নাইল, আলবু, বিনুর ক্লিয়ারেন্সে নো অবজেকশন লিখে দেবে?” অভয় কুণ্ডুর সংযোজন।
ঘরে ফিরে এলেন বটা বিশ্বাস। ওরা দু’জন জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। সমীরণকে একপলক দেখে নিয়ে বটা বিশ্বাস বললেন, ”না, তেমন কিছু নয়। ওখানে থাকতে একটু অসুবিধে হচ্ছে…কলকাতায় আসতে চায়। হ্যাঁ, ভাল কথা সমীরণ, ঘুনু তোকে যে অফার দিয়েছে, জানি, আমি জানি কত টাকা বলেছে, কিন্তু অত টাকা সারথি তোকে দিতে পারবে না।” বটা বিশ্বাস ব্যাঙ্কের চিঠিটা পাঞ্জাবির পকেট থেকে বের করে হাতে রেখে বললেন, ”গতবারের থেকে বিশ হাজার বেশি দেব।”
”তার মানে পুরো দেড় লাখ।” অভয় কুণ্ডুর সংযোজন।
সমীরণ তখন মেঝের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে। তার মাথায় ঘুরছে চন্দননগরের ফোন। বিনু জনই করেছে। ধাড়াদা বাজে কথার লোক নন। ওখানে বন্ধুর বাড়িতে তিনিই বিনুকে তুলে রেখেছেন।
”তোকে কবে ক্যাম্পে ফিরতে হবে?” বটা বিশ্বাস জানতে চাইলেন।
”বাইশের মধ্যে কোঝিকোড় ফিরতে হবে।”
”তা হলে তো আর মাত্র ক’টা দিন।” পুলকেশবাবু ক্যালেন্ডার খুঁজতে লাগলেন দেয়ালে।
”বটাদা, যাত্রী কিন্তু আমায় অনেক বেশি অফার দিয়েছে।”
”দিক না, দেবী আর রণেনকেও তো দু’লাখ আশি হাজার করে অফার দিয়েছে, ওরা তিন লাখ করে চেয়েছে। পতু ঘোষ ভাববার জন্য সময় নিয়েছে। আমি সময় টময় নিইনি। দু’জনকেই বলেছি দু’লাখ দশ হাজার, অ্যাডভান্স চল্লিশ হাজারের চেক এখুনি দেব। ওরা চেক নিয়ে গেছে।”
”চেক নিয়ে গেছে?” সমীরণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
”শুধুই কি নিয়ে গেছে, খবরের কাগজে স্টেটমেন্ট গিয়ে দেবী বলেছে, শত প্রলোভনেও দল ছাড়ছি না, ক্লাব এখন রক্তে মিশে গেছে। হ্যাঁ, ক্লাব যদি অবহেলা করত তা হলে একটা কথা ছিল। কিন্তু যেভাবে গুরুত্ব পাচ্ছি তাতে আমাদের ক্ষোভ থাকার কথা নয়। আমাদের অনুরোধেই সুখেনদাকে কোচ করা হয়, প্রতি ম্যাচে দল গড়ার সময় আমাদের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে, এবারেও ক্লাব নির্বাচনের ডামাডোলে কর্তারা ব্যস্ত কিন্তু আমাদের অনুরোধ মেনে চল্লিশ হাজার করে ধার চাইতেই বটাদা ধার দিয়ে দিলেন…”
মৃদুমন্থর কণ্ঠ পুলকেশবাবুর কথা কেড়ে নিয়ে অভয় কুণ্ডু উচ্চগ্রামে বেগসঞ্চার করে যোগ করলেন, ”এত গুরুত্ব এত ভালবাসা আর কোথায় পাব, টাকাটাই তো জীবনের সব নয়, লক্ষ লক্ষ সারথি সমর্থকের ভালবাসার দাম কি টাকায় হয়?” অভয় কুণ্ডু নিজেকেই প্রায় হাততালি দিয়ে ফেলছিলেন। সেটা না করে, বটা বিশ্বাসের দিকে আপ্লুত চোখে শুধু তাকালেন।
শুনতে শুনতে নিলু গড়গড়ির বক্তৃতা সমীরণের মনে পড়ছিল। কলকাতার ফুটবল মরে গিয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। গড়গড়ি বলেছিলেন, গত বছর কাগজে পড়ি একজন বড় প্লেয়ার ক্লাবে থেকে যাবে বলে অ্যাডভান্স নিয়ে বলেছিল এই ক্লাবের তাঁবু তার কাছে মন্দিরের মতো কিন্তু তিনদিন পরই সেই ফুটবলার আর এক ক্লাবের এক কর্তার ফ্ল্যাটে গিয়ে টাকাপয়সা নিয়ে দরাদরি করছে। এটাই হল দুর্গন্ধ।
সমীরণের গা গুলিয়ে উঠল। গত বছরের ওই ফুটবলারটি আর কেউ নয়, দেবী। তার মনে হল, পুরনো এই বাড়ির হলঘরটা যেন একটা মর্গ, শবাগার। এই লোকগুলো এক একটা ডোম। এখান থেকে বেরিয়ে না গেলে সে বমি করে ফেলবে।
”যাত্রীকে গিয়ে কিন্তু তুই খেলতে পারবি না। বিরাট ঝগড়া, গোলমাল, কামড়াকামড়ি চলছে, সারা বছরই চলবে। তোর খেলা ও—ক্লাবে গেলে শেষ হয়ে যাবে। টাকা কম দেবে সারথি, তোর দামের থেকে অনেক কম। এখানে কিন্তু নিজের খেলাটা খেলতে পারবি।” বটা বিশ্বাস তীক্ষ্ন চোখে তাকিয়ে রইলেন। সমীরণ মাথা নিচু করে দ্রুত ভেবে চলেছে। বটা বিশ্বাস ধরে নিলেন, এই নীরবতার অর্থ, সম্মতি।
”ওপরের তিনটে ঘরে এখন রয়েছে প্রফুল্ল, মানিক, অরবিন্দ আর সতু। তুই প্রফুল্লের ঘরে চলে যা। প্রথম দিন এখান থেকেই সই করতে যাবি। তোকেও অ্যাডভান্স দিচ্ছি চল্লিশ হাজার।”
সমীরণ শুনতে শুনতে থ’ হয়ে গেল। এখানে বন্দি হয়ে থাকতে হবে। ব্যাপারটাই তো লজ্জার, অপমানেরও। সে কি গাধা না গোরু? তাকে বিশ্বাস করে এরা ছেড়ে রাখতে চায় না।
”এখানে বাপির ছেলেরা রয়েছে। যাত্রী কোনওরকম হাঙ্গামা হুজ্জুত করতে আসবে না, তাহলেই চেম্বার বেরোবে এটা ওরা জানে। তোফা খাবিদাবি, ঘুমোবি, ভিডিও—র সিনেমা দেখবি, পঞ্চাশটা হিন্দি—ইংরেজি মারপিটের ফিল্মের ক্যাসেট রয়েছে, কত দেখবি দেখ না। একদমই বোর লাগবে না।” গৃহকর্তা অভয় কুণ্ডু দরাজ স্বরে আতিথ্য গ্রহণের আহ্বান জানালেন।
”বটাদা, পিসিমার সঙ্গে কথা না বলে এখন আমি কথা দিতে পারব না।”
