”কাল এসেছিস অথচ খবর দিসনি। ফোনেও তো জানাতে পারতিস।” সস্নেহ অনুযোগ করলেন বটা বিশ্বাস। নিজের পাশে বসানোর জন্য সোফায় চাপড় দিতে দিতে বললেন, ”বোস, বোস।”
”কাল বাড়ি ফিরলামই তো রাত্রে। খুব টায়ার্ড ছিলাম।” সমীরণ বসার আগেই সতর্কভাবে বলল। বটা বিশ্বাস সব খবরই রাখে সুতরাং আড়াল দিয়ে কথা না বলাই ভাল।
”টায়ার্ড তো হওয়ারই কথা। স্টেশন থেকে দুলালের ব্যাঙ্ক, তারপর দমদমে প্রধান অতিথি, ধকল তো কম নয়।” বটা বিশ্বাস মিটিমিটি হাসছেন।
লোকটার কাছে এইসব খবরও পৌঁছে গেছে। আশ্চর্য বোধ করছে, এটা কোনওভাবেই যাতে মুখে ফুটে না ওঠে সমীরণ সেই চেষ্টায় সফল হল। মুখটা ব্যাজার করে বলল, ”তার ওপর রাতে আবার ঘুনুদার ঘ্যানঘ্যানানি শুরু হল।”
বটা বিশ্বাস বিস্ময় প্রকাশ করলেন না ঘুনু নামটা শুনে। ঘুনু প্রসঙ্গ না তুলে খুবই স্বাভাবিক গলায় বললেন, ”এ—বছর সারথিতেই তো থাকবি?”
প্রশ্ন বা উৎকণ্ঠা নয়, বটা বিশ্বাসের বলার ভঙ্গিটা যেন একটা বিবৃতি শুরু করার মতো। ”প্রচুর দেনা রয়ে গেছে গত বছরের। এই দ্যাখ, ব্যাঙ্ক তাগিদ দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। কীভাবে যে এবার টিম করব ভেবে পাচ্ছি না।”
”সুদে—আসলে এগারো লাখ ব্যাঙ্ক এখন পাবে।” শুকনো গলায় বটা বিশ্বাসের পাশে বসা সহসচিব অপূর্ব মজুমদার বললেন।
সমীরণ এই ধরনের কথা গত বছরও দলবদলের আগে শুনেছে। তখন ধারের অঙ্কটা ছিল আট লাখ। এখন যে কাগজটা দেখাল সেটা সত্যিই ব্যাঙ্কের চিঠি কি না তাতে সন্দেহ হলেও সে চুপ করে রইল।
”তুই তো ঘরের ছেলে, যা দেব তাই নিবি সোনামুখ করে। কিন্তু সবাই তো তা নয়।”
”সবাই তো সমীরণ গুপ্ত নয়।” অন্য সোফায় বসা অভয় কুণ্ডু নিজেকে তাড়াতাড়ি জুড়ে দিলেন বটা বিশ্বাসের সঙ্গে।
”তুই ছিলিস না, কী অসুবিধেয় যে পড়েছিলাম। কাকে কাকে নেব, কাকে কাকে ছেড়ে দেব, এই নিয়ে কথা বলার লোকই পাচ্ছিলাম না। নির্মলকে জিজ্ঞেস করলাম, সে বিপ্লব বোস, গৌতম চ্যাটার্জিকে যাত্রী থেকে নিতে বলল। বোঝ, ও দুটো কি প্লেয়ার। একটার তো ডান পা বলে কিছু নেই, শুধু পারে লম্বা লম্বা দৌড়। আর অন্যটা ফুলবাবু, সাজিয়ে গুজিয়ে পায়ে বল পৌঁছে দিলে তবেই তিনি নড়বেন। মডার্ন ফুটবল এইসব প্লেয়ার দিয়ে খেলা যায়?”
বটা বিশ্বাসের মুখে ”মডার্ন ফুটবল” কথাটা শুনে সমীরণ হাসি চাপল।
”মডার্ন ফুটবলে সারাক্ষণই তো দৌড়াদৌড়ি করতে হবে,” অভয়ের সংযোজন।
সোফায় বসা চতুর্থজনের দিকে মাথা হেলিয়ে বটা বিশ্বাস বললেন, ”পুলকেশবাবু ছোট টিমের চারটে ছেলের নাম দিয়েছেন। ওদের অ্যাডভান্স করা হয়ে গেছে।”
”বাইরে থেকে কাকে পাচ্ছেন, কার্নাইলের ট্রান্সফার নিয়ে নাকি প্রব্লেম হচ্ছে?” সমীরণ জানতে চাইল। দল গড়ার ব্যাপারে গত তিন বছরে কখনও তার মতামত বা পরামর্শ কেউ নেয়নি। এইবার তাকে খাতির দেখাবার এই ভানটায় তার ভেতরটা কাঠ হয়ে উঠল।
”কার্নাইলের কেসটা একটু কমপ্লিকেটেড। এ আই এফ এফ জানিয়েছে, কার্নাইল ওর অফিস থেকে লোন নিয়েছে, টাকা শোধ না করা অবধি রিলিজ অর্ডার দেবে না। সরকারি অফিস তো, তাই ফ্যাচাং আছে। আলবুকার্কের এগেনস্টে রয়েছে সন্তাোষ ট্রফির খেলায় রেফারির ম্যাচ রিপোর্ট। আর বিনু জন ইন্টার স্টেট ট্রান্সফার চেয়েছে বাংলা আর মহারাষ্ট্রে। এটা তো হয় না। দুটো স্টেটে খেলতে চাইলে পারমিশন দেবে কী করে?” বটা বিশ্বাস অসহায়ভাবে সবার মুখের দিকে একবার করে তাকালেন। সবাই মাথা নেড়ে তাদের অসহায়তাও বুঝিয়ে দিল।
সমীরণ খটকায় পড়ে গেল। সুবোধ ধাড়া যে বললেন বিনু এসে গেছে? কিন্তু উনি তো বাজে কথা বলার লোক নন। ঠিক এই সময়ই বছর—বারোর একটি ছেলে ভেতর থেকে হলঘরের দরজায় এসে বলল, ”বাবা, চন্দননগর থেকে একজন ফোন করেছে।”
অভয় কুণ্ডু প্রায় লাফ দিয়ে উঠে পড়লেন। হাত তুলে তাকে নিরস্ত করে বটা বিশ্বাস সোফা থেকে উঠলেন। ”ব্যস্ত হতে হবে না, আমিই ধরছি।”
বটা বিশ্বাস ফোন ধরতে গেলেন। ঘরে সবাই চুপ করে বসে রইলেন। নীরবতা অস্বস্তিকর লাগায় সমীরণ অভয় কুণ্ডুকে বলল, ”সুখেনদা থাকছেন তো?”
সুখেন কর সারথির কোচ। বুদ্ধিমান, পরিশ্রমী, দরদি। কথা কম বলেন এবং ডিসিপ্লিন সম্পর্কে নোভাচেকের মতোই কঠোর। গত বছর মাঠে এসেও, শরীর ভাল নেই বলে ট্রেনিংয়ে না নামায় দুলাল চক্রবর্তীকে সাতদিন ট্রেনিং করতে দেননি সুখেন কর। তাই নিয়ে জোট বেঁটে দুলালের নেতৃত্বে কয়েকজন বয়স্ক ফুটবলার ছোটখাটো একটা বিদ্রোহ করে ফেলেছিল। বটা বিশ্বাসের মধ্যস্থতায় বিদ্রোহ প্রশমিত হয়।
”নিশ্চয়। সুখেন কর ছাড়া আর কারও কথা আমরা ভাবছিই না। তবে নির্মাল্যরা চাইছে হেমন্ত গাঙ্গুলিকে। আরে, যার কোনও কোচিং ডিগ্রি—ডিপ্লোমা নেই সে কিনা সারথির মতো ক্লাবে কোচ হবে।” অভয় কুণ্ডু আকাশ থেকে পড়তে শুরু করলেন।
সমীরণের মনে পড়ল, সুবোধ ধাড়াও ঠিক একই ভাবে অজয় তালুকদারকে যাত্রীর কোচ করার বিপক্ষে এই যুক্তিটাই দিয়েছিলেন। একই মানসিকতা দুটো ক্লাবে। ডিগ্রি—ডিপ্লোমার প্রতি এত ভক্তি, মডার্ন ফুটবলের জন্য এত ব্যাকুলতা অথচ ক্লাব চালাতে লক্ষ লক্ষ টাকা দেনা না করে এরা থাকতে পারে না।
”অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে কি হায়ার সেকেন্ডারি ফেল—মারা কোনও ছাত্রের পড়ার সুযোগ পাওয়া উচিত? যদি পায় বুঝে নিতে হবে, সে সুযোগ পাচ্ছে খুঁটির জোরে, নিয়মবহির্ভূতভাবে। হেমন্ত সম্পর্কে আমার কোনও অ্যালার্জি নেই। কিন্তু আমাদের তো সারথির স্বার্থের কথাটাই ভাবতে হবে। ও যখন যাত্রীতে খেলত তুই তখন গড়ের মাঠ চোখে দেখিসনি। তখন সারথিকে একটা ম্যাচে দু’গোল দিয়েছিল। আমাদের মেম্বার গ্যালারির দিকে কী অশ্লীল অসভ্য অঙ্গভঙ্গি যে হেমন্ত সেদিন করেছিল তা আজ পনেরো—ষোলো বছর পরও চোখে ভাসছে। ওর পরিচয় তো যাত্রীর ছেলে হিসাবেই, সারথির মেম্বাররা ওকে মোটেই মেনে নেবে না।”
