সমীরণের ভ্রূ কুঁচকে উঠল। স্থির দৃষ্টিতে দিলীপের দিকে তাকিয়ে থেকে কাটা—কাটা স্বরে বলল, ”পিসিমার রান্না না খেয়ে, কোথাও আমি যাব না। এটা আমার কাছে আপাতত সবথেকে জরুরি ব্যাপার। বিকেলের দিকে বটাদার সঙ্গে দেখা করব, উনি তখন কোথায় থাকবেন?”
ওরা দু’জন একটু অবাক ও কিছুটা বিভ্রান্তি নিয়ে সমীরণের কথা শুনল। বটাদা ডাকছে শুনে আঁকপাক করে দেখা করার জন্য ছুটল না, এমন অদ্ভুত ব্যাপার তারা দেখেনি। কিন্তু সমীরণকে ওরা চেনে। কঠিন গলা ও চাহনি থেকে ওরা বুঝে গেছে এখন একে নিয়ে যাওয়া যাবে না।
”যাত্রী থেকে কেউ এসেছিল?” দিলীপ নরম স্বরে জানতে চাইল।
”হ্যাঁ। ঘুনু মিত্তির।” সমীরণ জানে সব খবরই এরা পায়।
”অফার দিয়েছে?” দিলীপের নিচু গলা।
”হ্যাঁ, তবে আমি কোনও কথা দিইনি।”
দুজনেই যেন আশ্বস্ত হল। ওরা জানে সমীরণ ছলচাতুরি করে কথা বলে না।
”বিকেলে বটাদা শোভাবাজারে অভয় কুণ্ডুর বাড়িতে থাকবে, তুমি বাড়িটা চেনো?”
অভয় কুণ্ডু একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিন বছর আগে অনেকের সঙ্গে সে অভয় কুণ্ডুর মেয়ের বিয়েতে নিমন্ত্রণ খেতে গিয়েছিল। বাড়িটা যে ঠিক কোথায়, তার মনে নেই। তবে মাঝারি একটা রাস্তা থেকে গলির মধ্যে, খুব পুরনো বাড়ি, মোটা দেয়াল, উঁচু সিলিং, শ্বেত পাথরের মেঝের হলঘর, সদর দরজার পাল্লা দুটো খুব ভারী, এইটুকুই মনে আছে।
”জায়গাটা জানি, বাড়িটা মনে নেই।”
”তা হলে ঠিক ছ’টায় শোভাবাজার মোড়ে বাপি অপেক্ষা করবে। তুমি ট্যাক্সি ওখানে থামাবে, ও নিয়ে যাবে অভয়দার বাড়িতে। ঠিক ছ’টায়, পাক্কা?”
”হ্যাঁ যাব।” সমীরণ মাথা হেলাল।
।। ৬ ।।
সমীরণ পৌঁছেছিল দশ মিনিট দেরিতে। খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে কঠোর নিয়ম মানলেও, সর্ষে—কাঁচালঙ্কা মাখানো বাগদাকে যথোচিত মর্যাদা দেওয়ার জন্য এবং মালাইকারিকে অবজ্ঞা করে রুচিহীনতার কবলে না পড়তে চাওয়ায় সে তার খাওয়ার বিধিনিষেধকে আজ শিকেয় তুলে দেয়। অবশ্য শুধু আজকের জন্যই। মনে মনে শুধু বলেছিল, ‘হাজার হোক আমি তো বাঙালিই রে বাবা!’ মাছের সঙ্গে ভাতও আনুপাতিক হারে বেশি খেয়ে ফেলায় সমীরণকে একটি ভাতঘুমের সাহায্যও নিতে হয় হাঁসফাঁসানিকে সুস্থির করতে। অতঃপর দশ মিনিট বিলম্বকে সে দেরি মানতে চাইল না। অবশ্য ট্যাক্সিতে উঠে বাপি শুধু একবারই বলেছিল। ”আমি সেই সাড়ে পাঁচটা থেকে দাঁড়িয়ে।”
ট্যাক্সিটা শোভাবাজার মোড় থেকে পশ্চিমে গঙ্গার দিকের রাস্তা ধরে এগোল। সমীরণ হাটখোলা পোস্ট অফিসটা দেখে মনে করতে পারল এই পথেই সে গিয়েছিল নেমন্তন্ন খেতে। আর একটু এগিয়ে বাপির নির্দেশমতো ট্যাক্সি ডান দিয়ে একটি রাস্তায় ঢুকল। তারপর বাঁ দিকে একটা কানাগলির মুখে দাঁড়াল।
সামনেই চায়ের দোকান। সাত—আটটি যুবক রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে টেবিলের ওপর বোর্ড রেখে ক্যারম খেলছিল। ট্যাক্সি থামতেই তিনজন এগিয়ে এল। বিগলিত সম্ভ্রম মুখে মাখানো।
”সমীরণদা এসে গেছে রে…আসুন সমীরণদা।” একজন দরজা খুলে ধরল।
একজন ঝুঁকে হাত বাড়াল নামায় সাহায্য করতে। সমীরণ নামার সময় একমুখ হাসল কিন্তু হাতটা ধরল না।
”সমীরণদা, লিগটাই হল আসল জিনিস, এবার কিন্তু ওটা চাই। শিল্ড, কাপফাপ হোক বা না—হোক, আপনাকে কিন্তু…”
”আরে, একা কি কেউ লিগ জেতাতে পারে। এগারোজনের খেলা, এতদিন ধরে এতগুলো ম্যাচ, টিম কি সবদিন সমানভাবে খেলতে পারে?” বিব্রতভাবে কিন্তু হাসিমুখে সমীরণ বলল। এই ধরনের কথার সামনে বহুবার তাকে পড়তে হয়েছে। বেশি কথাবার্তায় যেতে নেই। মুখে হাসি মাখিয়ে, ”অবশ্যই চেষ্টা করব”, এবং ”এবার নিশ্চয় লিগ জিতব” ধরনের কথা বলে সে পাগল—সমর্থকদের হাত থেকে বেরিয়ে এসেছে।
”না, সমীরণদা, এ—কথা বললে হবে না, টিম আমাদের এবার খুব ভাল, বিনু জন তো…’ আচমকা বাপির ধমক খেয়ে ছেলেটি থতমত হয়ে কথা শেষ করতে পারল না।
”কোথায় কী তার ঠিক নেই, বিনু জন নিয়ে হেদিয়ে মরছে। সমীরণ গুপ্ত থাকতে আর কাকে দরকার?” বাপি উত্তেজিত চোখে কটমটিয়ে তাকাতেই ছেলেটি গুটিয়ে গেল। সমীরণের পিঠে মৃদু ঠেলা দিয়ে বাপি বলল, ”চলো চলো, এইসব কিসসু যারা বোঝে না জানে না, এদের সঙ্গে…”
সেই পুরনো বড় বাড়িটাই। দোতলায় ওঠার সিঁড়ির কাছে বিরাট একটা অ্যালসেশিয়ান দেয়ালের কড়ার সঙ্গে শিকল দিয়ে বাঁধা। উপুড় হয়ে, চোখ বোজানো। পায়ের শব্দে একটা চোখ খুলে শুধু তাকাল। ওঠার সময় সমীরণের মনে পড়ল সুবোধ ধাড়ার কথাটা, ”বিনুকে কাল আমিই আমার বন্ধুর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তুলে রেখেছি চন্দননগরে।” আর এই ছেলেটা সবে যখন বলছিল, ”বিনু জন তো,” ঠিক তখনই বাপি খিঁচিয়ে উঠে ওর মুখ বন্ধ করে দিল।
বিনুকে আনিয়ে বটা বিশ্বাস তার ওপর চাপ তৈরি করে রাখতে চায়। তারপর আলবুকার্ক, তারপর কার্নাইলও আসবে। একটা বিষাক্ত আবহাওয়া তৈরি করে বটা বিশ্বাস তার দমবন্ধ করে দেবে। পারস্পরিক দোষারোপ শুরু হবে, খবরের কাগজে বেরোবে কে কার বিরুদ্ধে কী বলল আর তার জবাবে আর—একজন কী বলল। মেজাজ নষ্ট হবে, খেলায় স্ফূর্তি আসবে না। সাপোর্টাররা অকথ্য ভাষায় গাল দেবে।
হলঘরে দুটো সোফায় চারজন লোক বসে। সমীরণ চারজনকেই চেনে। ক্লাবটা এখন এরাই চালায়। বটা বিশ্বাস হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে একটা টাইপ করা কাগজ পড়ছিলেন। বয়স দেখে মনে হয় চল্লিশ—পঁয়তাল্লিশের মধ্যে, আসলে পঞ্চান্ন। গোলাকার মুখ, পাঞ্জাবির নীচে পেটের কাছে ফুলে রয়েছে চর্বি, গায়ের রং খুবই ফরসা, ডান হাতের আঙুলে পলা ও পোখরাজ বসানো দুটি আংটি। লোকটি সৌম্যদর্শন, কথা বলেন ধীরে। হাতের কাগজটা রেখে চোখ থেকে চশমাটা নামিয়ে সমীরণের দিকে তাকালেন। ধীরে ধীরে মুখ ভরে গেল অনাবিল হাসিতে।
