”এটা প্রশংসা, না নিন্দে?”
কথাটায় কান দিল না ধাড়া। শুধু বলল, ”যেজন্য ফোন করা, তুই সারথিতেই থেকে যা, তোর দর আমি বাড়িয়ে দেব। যাত্রীতে আড়াই লাখ টাকার অফার পেয়েছিস বলে খবরের কাগজে রটিয়ে দেব। সারথি দু’লাখ অফার দিয়েছে শুনে তো বুকুকে তুলে নিয়ে গেছে পতু। তোকেও বটা তুলবে।”
সমীরণ আবার খিকখিক করে হাসি শুনল। সে দ্বিধাভরে বলল, ”দু’লাখ, আড়াই লাখ, এসব কি লোকে বিশ্বাস করবে?”
”করবে কেন, করেছে। আবার বলছি, যাত্রীতে এলে ঝামেলায় পড়বি, খেলতে পারবি না..খেলতে দেব না।”
ওধারে টেলিফোন রাখার আর ডোর—বেল বাজার শব্দ প্রায় একই সঙ্গে হল। বাজার নিয়ে রেখা গুপ্ত আর শ্যামলা ফিরল।
”দাদা তোর কী অসম্ভব লাক, কতদিন পর আজই কিনা বাজারে শুঁড় থেকে টেইল প্রায় ছ’ইঞ্চি লম্বা বাগদা উঠেছে! ‘এ’ ব্লকের সেই মেমসাহেব, হাউসকোর্ট পরে যিনি বাজার করেন, তিনি মাছওলার সামনে ঝুঁকে আঙুল দিয়ে বাগদার নাড়ি টিপে টিপে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছিলেন। আর পিসি, চল্লিশ হাত দূর থেকে ভিড়ের মধ্য দিয়ে…এককালে যে বাসকেট খেলত সেটা এবার বিশ্বাস হল।”
”মলা!” রান্নাঘর থেকে গম্ভীর স্বরে ডাক পড়ল।
”না পিসি সবটা আমি বলব না।” শ্যামলা চেঁচিয়ে আশ্বাস দিয়েই সমীরণের দিকে বড় বড় চোখ করে বলল, ”অসম্ভব একটা ড্রিবল করে ছুটল। তিন—চারজন ভদ্রলোক ধাক্কা খেয়ে কোনওক্রমে টাল সামলালেন বটে, কিন্তু মেমসাহেবকে নির্ঘাত রেড কার্ড দেখানোর মতো ফাউল পিসি করেছে। সোজা গিয়ে একটা সাইডপুশ, মেমসাহেব দড়াম, এক থাবায় চিংড়িগুলো ধরে পাল্লায় চাপিয়ে দিয়েই পিসি বলল, ”ওজন করো, সবগুলো নেব।” এক অ্যাকশনে সব ঘটে গেল। মাছওলা পিসিকে জানে। সে বিনা বাক্যবায়ে বাটখারা চাপিয়ে ডিক্লেয়ার করল, ”এক কিলো পঞ্চাশ গ্রাম, আশি টাকা আর চার টাকা, চুরাশি টাকা…দু’টাকা কম দেবেন, সমীরণদা কাল ফিরেছেন জানি। মেমসাহেব যখন উঠে দাঁড়ালেন তখন মাছগুলো আমার থলিতে এসে গেছে।”
”মলা।” আবার রান্নাঘর থেকে।
”এই যাই, আর একটু বাকি আছে পিসি। তারপরই বুঝলি দাদা, মেমসাহেব তো চিৎকার শুরু করলেন। মাছওলা তখন প্রায় ধমকেই তাকে বলল, ‘পেনাল্টি বক্সের মধ্যে বল পেয়ে কী করতে হয় সমীরণ গুপ্তর পিসিমা সেটা জানেন, আপনি অত লেট করলেন কেন? টাটকা বাগদা আর আপনি কিনা টেপাটেপি করছেন। ফাস্টাইম শট নেবেন তো!’ মেমসাহেব তো মাছওলার কথা কিছুই বুঝলেন না। আর পিসি তো হাতজোড় করে প্রচুর মাফটাপ চেয়ে প্রতিশ্রুতি দিল জীবনে আর কখনও মেমসাহেবকে ধাক্কা মারবে না, এমনকী জীবনে আর কখনও চিংড়ি মাছও কিনবে না বলতে যাচ্ছিল…”
”মলা, মিথ্যে কথা বোলো না।” রান্নাঘর থেকে প্রায় করুণ স্বর ভেসে এল।
”আহা, আমি তো বলেছি বলতে প্রায় যাচ্ছিলে, সত্যিই কি আর বলেছ? আমি যদি তখন ‘পিসি ওই দ্যাখো এঁচোড়’ না বলতাম তা হলে তো তুমি নির্ঘাত বলেই ফেলতে।”
এই সময় রান্নাঘরের দরজায় এসে রেখা গুপ্ত একটা চিংড়ি তুলে গদগদ স্বরে বললেন, ”কী রকম টাটকা বল, আর কত শস্তা, আশি টাকা মাত্র!”
”সর্ষে বাটা আর কষে ঝাল দিয়ে…” সমীরণ টাকরায় জিভ লাগিয়ে একটা শব্দ করল। বহু…বহুদিন বাগদা খাইনি।”
”না, পিসি, নারকোল আর কিসমিস দিয়ে টক—মিষ্টি মালাইকারি।” শ্যামলা নাকিসুরে আবদার জানাল।
”দাঁড়া, দাঁড়া, এঁচোড় দিয়ে একখানা যা ডালনা…” রেখা গুপ্ত রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন।
”মলা শিগগিরি গিয়ে ধরে পড়, এঁচোড় ফেচোড় বন্ধ কর।”
”তুই গিয়ে বল।”
ভাইবোনের মধ্যে কথা নিয়ে যখন ঠেলাঠেলি চলছে তখন স্কুটার ফটফটিয়ে হিমাদ্রি বাড়ির সামনে থামল। জিলিপির ঠোঙাটা টেবিলে রেখে, ”তিরিশটা আছে, সবার ছ’টা ছ’টা, ইনক্লুডিং বাবা।” তারপরেই একটু উত্তেজিত স্বরে বলল, ”ট্যাক্সিটা থামিয়ে দুটো লোক, তারা—মা’র সামনে আমায় জিজ্ঞেস করল, সমীরণ গুপ্তর বাড়িটা কোথায়? দেখে মনে হল যাত্রী কি সারথির দলবদলের পার্টি, বললাম জানি না, ভেতরে গিয়ে খোঁজ করুন। ওরা সুশোভনেই ঢুকল, এক্ষুনি এসে পড়বে। বাইরে গিয়ে কথা বলবি।”
হিমাদ্রির কথা শেষ হওয়ার সঙ্গেই ডোরবেল বাজল। সমীরণ বাইরের বারান্দায় বেরিয়ে এল।
দু’জনেই সারথির। বটা বিশ্বাসের বিশ্বস্ত দিলীপ আর বাপি। প্রথমজন তার ব্যক্তিগত কাজগুলো করে, অন্যজন তার দেহরক্ষীর মতো সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে। সমীরণের সঙ্গে মৌখিক আলাপ ছাড়া ঘনিষ্ঠতা নেই।
”কী ব্যাপার, আপনারা?”
”বটাদা তোমায় একবার ডেকেছে।” দিলীপ জরুরি ভাব দেখিয়ে বলল, ”ট্যাক্সিটা দাঁড় করিয়ে রেখেছি।”
”কিন্তু আমি তো এখন যেতে পারব না। পিসিমা বাগদা চিংড়ি এনেছেন।” সমীরণের সহজ হালকা গলা।
”মানে!” দিলীপ বুঝতে পারল না।
”পিসিমা বাজার থেকে আমার জন্য বাগদা কিনে এনেছেন। এখন তার খোলা ছাড়াচ্ছেন তারপর রাঁধবেন। সেটা না খাওয়া পর্যন্ত আমি তো বাড়ি ছাড়তে পারব না।” সমীরণ হাসিমুখে বলল কিন্তু অন্য দু’জনের মুখে হাসি ফুটল না।
”বটাদা অপেক্ষা করছে তোমার জন্য।” দিলীপের গলায় ব্যস্ততা একটু বেশিই ফুটে উঠল।
”মাছফাছ এসে খাবে’খন, আগে বটাদার সঙ্গে কথা সেরে আসবে চলো।” বাপি কেউকেটা ভাব দেখিয়ে দু’পা এগিয়ে গেল সিঁড়ির দিকে।
