সমীরণ শুনতে শুনতেই বুঝে গেল সুবোধ ধাড়া তাকে ভাংচি দিতে এইসব বলছে। তার মাথায় দুষ্টুমি খেলল। এইসব লোককে নিয়ে মজা করার সুযোগ চট করে তো পাওয়া যায় না।
”ধাড়াদা, কে যেন বলল, টাকাটা নাকি আপনিই…”
”কী বললি, কী বললি, আমি তোর টাকা মেরেছি? জীবনে আজ পর্যন্ত একটা পাই—পয়সাও কাউকে ঠকাইনি। নিশ্চয় ঘুনু বলেছে। আসলে তোর টাকাটা ঘুনুই সই করে তুলে নিয়েছিল। আমি নিজে ভাউচারে ওর সই দেখেছি।”
”তখন আমায় সেটা, এইরকম একটা ফোন করে জানাননি কেন? না ধাড়াদা, আমাকে এত ভালবাসেন অথচ এই খবরটা আমায় দেননি। যদি দিতেন তা হলে আমি হ্যাঁ বলতাম না।”
”হ্যাঁ মানে! হ্যাঁ ব্যাপারটা কী? ঘুনুকে হ্যাঁ বলেছিস নাকি?”
”বলব না? পৌনে তিন লাখ টাকার অফার পেলে কি না বলব?”
”পউউনে তিন!”
সমীরণ দশ সেকেন্ড কোনও শব্দ পেল না ওধার থেকে। হাসল সে। ওষুধ ধরেছে।
”ধাড়াদা হ্যালো, লাইন ঠিকই আছে, হ্যালো, ঘুনুদা বললেন, গত বছর বুকু যা ধেড়িয়েছে তাতে নাকি আমাকেই এখন সবাই চাইছে। মেম্বার নাকি বলেছে হিরো থেকে হিরোইন হয়ে গেছে বুকু দত্ত। এখন যাত্রায় নামুক। পতুদা নাকি বলেছেন ব্ল্যাঙ্ক চেকে সই করে দিচ্ছি, সমীরণকে এনে দাও। আচ্ছা দেখুন তো কী মুশকিলে পড়লাম। আমি যাত্রীতে গেলে এদিকে বটাদা বলেছেন আমাদের বাড়ির সামনে অনশন শুরু করবেন—আমরণ। কী করি বলুন তো?”
”ঘুনুকে হ্যাঁ বলেছিস মানে ফাইনাল কথা, নাকি ল্যাজে খেলাচ্ছিস?”
”ওহো ধাড়াদা, এখন কি ফাইনাল কথা বলে কোনও কথা আছে? সই করার আধঘণ্টা আগেও তো ডিগবাজি খেয়েছে কত তারকা!”
”এখন কিন্তু ওসব খাওয়ার পথ বন্ধ। অলরেডি বটা আর পতু তাঁদের খোঁয়াড়ে মাল ভরে ফেলেছে। বুকুও ঢুকে গেছে পতুর বাড়িতে। বাকি যারা রয়েছে তাদের একজন তুই, আশ্চর্য হচিছ, বটা এখনও কী বলে তোকে ছেড়ে রেখেছে! তোকে কি সারথির দরকার নেই? বিনু জন তো কাল এসে গেছে, কার্নাইল আজ আসছে, তা হলে কি তোকে আর সারথি রাখবে না?”
সমীরণ কয়েক সেকেন্ডের জন্য কাঠ হয়ে রইল বিনু আর কার্নাইলের খবরটা পেয়ে। তবু নিশ্চিত হওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করল, ”বিনু যতদূর জানি আসবে না আর কার্নাইলকে পঞ্জাব পুলিশ ছাড়বে না। তবে ইলেকশনে জেতার জন্য বটাদা রটাবে ওদের আনিয়ে ফেলেছে।”
একটা হালকা খিকখিক হাসি সমীরণের কানে ধাক্কা দিয়ে জানিয়ে দিল তার কথা নস্যাৎ হয়ে গেছে।
”তুই বড় ছেলেমানুষ সমীরণ। বিনুকে কাল আমিই আমার বন্ধুর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তুলে রেখেছি চন্দননগরে। বটাকে ইলেকশনটা জেতাতে হবে যাত্রীর স্বার্থেই তো। আলবুকার্ক সারথিতে আসছে আসছে এমন একটা রব তুলতে হবে। আরে খবরের কাগজ আমার মুঠোয়, রব তুলিয়ে দেব। কার্নাইলের জন্য বটার হয়ে আমি অনেক হেলপ ওকে করেছি।”
”কেন করেছেন? পতুদাকে ডোবাবার জন্য?”
”হ্যাঁ।” দাঁতে দাঁত ঘষার শব্দ ফোনের মধ্য দিয়ে সমীরণের কানে সুড়সুড়ি দিল। সুবোধ ধাড়া হঠাৎ যেন খেপে উঠল বলে মনে হচ্ছে। ”আর শুনে রাখ, যাত্রীতে তুই যদি আসিস তা হলে তোকেও ডুবতে হবে।”
সমীরণের ইন্দ্রিয়গুলো সজাগ হয়ে উঠল কথাটা শুনে। সতর্ক হয়ে সে বলল, ”পতুদাকে ডোবাতে আপনি কিন্তু যাত্রীরই ক্ষতি করবেন।”
”করব, ক্লাবের জন্য করব। একটা প্ল্যান নেই, পরিকল্পনা নেই, দু’হাতে টাকা ছড়িয়ে শুধু প্লেয়ার ধরছে। এসব ঘুনুর মাথা থেকেই বেরিয়েছে। যত টাকা খরচ হবে ততই ওর হিস্যের টাকাও বাড়বে। এত প্লেয়ার নিয়ে শেষে বিপদে পড়তে হবে। ভাব তুই, লেফট ব্যাকই চারজন, মিডফিল্ড ন’জন। এইভাবেই রিক্রুট হচ্ছে, অ্যাডভান্স দেওয়া হচ্ছে। পাগল না হলে এমন কাজ কেউ করে? অজয় বলেছে সমীরণকে আনো। ওর ফার্স্ট চয়েস তুই। যদি তুই ফেল করিস তা হলেই বুকু টিমে জায়গা পাবে। এইভাবে কি টিম তৈরি হয়? তুই ফেল করলে তবেই বুকু টিমে আসবে। যাত্রী কি অজয়ের বাপের ক্লাব?”
”ধাড়াদা আপনি তো ক্লাবের শুভাকাঙ্ক্ষী, বুকুরও গডফাদার। শুনেছি ক্লাব লিগ না পেলে একমাস হবিষ্যি করেন, জুতো পরেন না। তা হলে গত বছর সারথির সঙ্গে লিগ ম্যাচের মাঝখানে বুকুর মায়ের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে বলে টেলিফোন করে হঠাৎ ওকে মাঠ থেকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন কেন? বুকু তখন তো বেশ ভালই খেলছিল। হয়তো বহুদিন পর গোলও পেয়ে যেত। নিজের ওপর কনফিডেন্সটা ফিরে পাওয়ার জন্য গোল পাওয়া ওর খুবই দরকার ছিল। সেদিন আপনি একই সঙ্গে বুকুর আর ক্লাবের ক্ষতি করেছেন।”
সমীরণ ধীরস্বরে, মেপে মেপে কথাগুলো বলল মাথা নামিয়ে চোখ বন্ধ করে। একজন ভাল ফুটবলারের সর্বনাশ হওয়া দেখতে তার কষ্ট হয়। ফুটবলার হিসাবে বুকুকে সে সমীহ করত। কিন্তু এখন আর করে না। ক্লাবের রাজনীতিতে ধাড়া গ্রুপের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে বুকু নিজের ক্ষতি নিজেই করেছে। এইসব দেখে আর শুনে সারথিতে গোষ্ঠী—ঝগড়া থেকে সমীরণ শত হাত দূরে নিজেকে সরিয়ে রেখেছে।
”সমীরণ তুই বুদ্ধিমান, শিক্ষিত। নোংরামিতে থাকিস না বলে ময়দানে তোর সুনাম আছে। একটা গরিব ঘরের ছেলে, তিন পুরুষ যা পেত না তাই পেয়ে গেছে সাত—আট বছরে। কম করে লাখ দশেক যাত্রী থেকে আর হাজার তিনেক মাসে মাসে ব্যাঙ্কের চাকরি থেকে। দু’বছর আগেই লক্ষ করেছি বুকুর ভেতর থেকে খেলার ইচ্ছেটা ফুরিয়ে গেছে। ও আর কোনওদিন খেলায় ফিরতে পারবে না এটা আমি জেনে গেছি বলেই মাঠ থেকে বের করে নেওয়ার জন্য মায়ের হার্ট অ্যাটাকের টেলিফোনটা করিয়েছিলুম। ওর এজন্য কোনও ক্ষতিই হয়নি। কিন্তু আমি যা ঘটাতে চেয়েছিলুম সেটা হয়েছিল। ম্যাচ হেরে গ্যালারিতে আগুন জ্বলেছিল। হয়তো সেদিন বুকু একটা গোল করে ফেলত কিন্তু সেলফ কনফিডেন্স ও ফিরে পেত না। তা পেতে হলে খেলাকেই ধ্যানজ্ঞান করতে হয়। বুকু আর তা পারবে না বলেই ওকে আমি নিজের কাজে লাগাচ্ছি। আর ও এটা জানে, এখন ওভারটাইম খেটে উপরি আয় করার কাজ যতদিন পারে ওকে করে যেতে হবে। কিন্তু তুই অ্যামবিশাস, ফুটবলে বড় হতে চাস, তুই ডেঞ্জারাস।”
