ঘুনু তাকালেন সমীরণের দিকে। ভাইয়ের প্রশ্নটা দাদার চোখেও। হতাশভাবে ঘাড় নেড়ে ঘুনু নস্যিটা নাকে ঢুকিয়ে হাত ঝাড়তে গিয়েই মুখ ফ্যাকাশে করে ফেললেন। পর্যায়ক্রমে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে বোকার মতো হেসে বললেন, ”দ্যাখো, কী ভুলো মন যে আমার। আবার আমি নস্যি নিতে শুরু করেছি। এটা যে আজই ত্যাগ করেছি সেটা আর মনেই নেই!”
”এই ডিবেটাও কি জানলা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেবেন?” খুব সাধারণ স্বরে শ্যামলা জানতে চাইল।
”নাহ।” ঘুনু মাথা নাড়ালেন। ”ফেলব না। থাক। বেইজ্জত হতে আর বাকি রইল না। তোমরা সবাই আমাকে ধাপ্পাবাজ, ভণ্ড, অ্যাক্টর বলে নিশ্চয় ধরে নিয়েছ। বোধ হয় আমি তাই। ক্লাব করে করে সোজাভাবে চলাটাই ভুলে গেছি।”
করুণ হয়ে উঠেছে ঘুনুর মুখ, কিন্তু ঝট করে নিজেকে সামলে নিয়ে মুখে সরল হাসি ছড়িয়ে বলে উঠলেন, ”যাকগে এসব, বরং তুই পতুর সঙ্গে একবার নিজেই মুখোমুখি কথা বল। এক একটা গোলের দাম কত সেটা ওই ধার্য করবে’খন। মনে হচ্ছে আজ আর তোকে নিয়ে যেতে পারব না, তা হলে কালকে চল।”
”আপনি আমাকে পতুদার ফোন নাম্বারটা দিন, কবে যাব সেটা ফোন করে জানিয়ে দেব।” সমীরণ আন্তরিক ভাবে বলল।
ঘুনুদাকে এগিয়ে দিতে ওরা সবাই বাইরের বারান্দায় এল। হঠাৎ তিনি রেখা গুপ্তর কানের কাছে মুখ এনে বললেন, ”মুন্নার বাড়িতে গেছলেন কি?”
”অ্যাঁ, মুন—না! কে—?” রেখা গুপ্ত থতমত হয়ে আমতা আমতা করছেন, ততক্ষণে ঘুনু মিত্তির মারুতির দরজায় হাত রেখেছেন।
”আহ, পিসি, তুমি মাটি করলে। মুন্না কে তা ভুলে গেলে এর মধ্যে?” চাপা ঝাঁঝ শ্যামলার গলায় এবং সেটা অপ্রতিভতার লজ্জা সহ।
”লাস্ট সেকেন্ডে পেছন থেকে এসে গোল করে দিয়ে গেল। নিশ্চয় সারাদিন ওত পেতে ধারে কাছে ছিল।” হিমাদ্রি ঠোঁট কামড়াল।
”নাকু, ভদ্দরলোকের কাছে যে আমি মিথ্যাবাদী হয়ে রইলাম।” রেখা গুপ্ত কাঁদো কাঁদো হয়ে সমীরণের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ”কী ভাবছেন উনি আমার সম্পর্কে, মলার সম্পর্কে!”
”কিচ্ছু ভাবছে না, এসব ধড়িবাজ লোককে আমি চিনি। এরা সত্যি মিথ্যের ধার ধারে না।” সমীরণ আশ্বস্ত করার জন্য বলল।
”কিন্তু আমি তো ধরি। আমিও তো ধড়িবাজ হলাম। উহহহ, এবার নরক যন্ত্রণা শুরু হবে। নাকু তুই আমায় উদ্ধার কর…তুই বরং ওর ক্লাবেই এবার যা, তাহলে আমি খানিকটা শান্তি পাব।” বলেই রেখা গুপ্ত দ্রুত নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন। ঘরের আলো নিভিয়ে খাটে বসে কান ধরে বিড়বিড় শুরু করলেন, ”মিথ্যা বলা মহাপাপ, নরকে গমন…মিথ্যা বলা মহাপাপ…।”
ডাইনিংয়ে তখন হিমাদ্রি বলছে, ”গ্রেট লেডির অর্ডার, অমান্য করলে কিন্তু ভি আই পি রোডে নিশ্চিত নিলডাউন।”
।। ৫ ।।
”কে, সমীরণ নাকি, আমি ধাড়াদা, সুবোধ ধাড়া বলছি।”
টেলিফোন বাজার শব্দে সমীরণের ঘুম ভেঙে গেছল। খাবার দালান থেকে রেখা গুপ্তর ঘরে যাওয়ার সরু গলিটার মধ্যে দেয়ালে আঁটা র্যাকে টেলিফোন। সে ভেবেছিল মলা বা কানু ফোন ধরবে। ক্রমাগত বেজে যাওয়ায় বিছানা থেকে তাকে উঠতেই হল। আজ রবিবার বেগিং বন্ধ। পিসি আর মলা তা হলে বাজারে গেছে। কানুও বাড়িতে নেই।
”বলুন।” সমীরণ এক চোখ বুজে ঘড়ি দেখল। সওয়া ছ’টা।
”ঘুম ভাঙালাম নাকি?”
”সারারাত লোডশেডিং, এই সকালের দিকে ঘুমটা এসেছিল।” হাই তোলার শব্দ যে ফোন মারফত পাঠিয়ে দিল।
”এহেহেহে, তা হলে তো অন্যায় হয়ে গেল। তুই তা হলে এখন ঘুমো, আমি বরং পরে ফোন করব।”
”ঘুম আর আসবে না, বলুন, কী বলবেন।” বিরক্তি চেপে অমায়িক গলায় সে বলল।
”বলব আর কী, ক্লাবে যা চলছে। এরা, মানে ঘুনুরা, আর কোচ খুঁজে পেল না, শেষে কিনা অজয় তালুকদারকে! কী যোগ্যতা আছে ওর? কোনওদিন কোনও বড় টিমকে কোচ করল না, দুটো ছোট টিমকে কোচ করে ‘বি’ গ্রুপে তাদের নামিয়ে দেওয়া ছাড়া যার আর কোনও সাকসেস নেই, কোচিংয়ের ডিগ্রি ডিপ্লোমা নেই, ফুটবল সেন্স নেই, ঝালচচ্চচড়ি অম্বল রাঁধার বাইরে আর কিছু সে রাঁধতে জানে না তাকে কিনা ফাইভ স্টার হোটেলের চিফ শ্যেফ করে দিল!… হ্যালো, হ্যালো, শুনতে পাচ্ছিস?”
”পাচ্ছি। আপনি বলে যান। কিন্তু এই সক্কালবেলায় এসব কথা আমায় শোনাচ্ছেন কেন? আমি তো যাত্রীর প্লেয়ার নই।”
”ঘুনু তোর বাড়িতে কাল গেছল তোকে তুলে আনতে। পারেনি। আমি জানতুম পারবে না। তোর মতো প্লেয়ারের মানমর্যাদা, ইন্ডিয়ার ক্যাপ্টেন হতে যাচ্ছিস, এখন যারা কমিটিতে এসেছে তারা কি দিতে পারবে? ভেবেছে টাকা ছড়ালেই সমীরণ গুপ্ত ছুটে আসবে, তা কি কখনও হয়! হাঘরে ছেলেদের মতো টাকার জন্য আজ এ ক্লাব কাল সে ক্লাব, এসব তো তোর পক্ষে সম্ভব নয়। কী ফ্যামিলির ছেলে তুই, আমি তো তা জানি। …হ্যালো, ক’দিন ধরে লাইনটা খারাপ, হ্যালো…”
‘আমি ঠিকই শুনতে পাচ্ছি, বলুন।”
”ঘুনু কেমন লোক তা তো তুই ভালই জানিস। ক্লাস এইট পর্যন্ত তো বিদ্যে, আগে নারান সেনের গাড়ির দরজা খুলে দিত, এখন পতুর গাড়িতে চেপে প্লেয়ার ক্যাচ করে বেড়াচ্ছে। নারানদার আমলে সেক্রেটারির ঘরে না ডাকলে ঘুনু ঢুকতে পারত না। আর এখন ও পতুর চেয়ারেও মাঝে মাঝে বসে। ক্লাবের ডিগনিটি বোধটাই নষ্ট হয়ে গেল এদের জন্য। তোর দশ হাজার টাকা তো আজও পেলি না।”
