”থামুন, থামুন।” সমীরণ দু’হাত তুলল। ”পতুদার বাড়িতে আমি যাব কেন?”
কথাটা শুনে ঘুনু অবাক হয়ে পাঁচ সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল, ”কেন কী রে? দু’বার যে ঘুরে গেছে। এরপর কি তোকে আর ছেড়ে রাখা যায়!”
”নাকুকে ধরে রাখবেন?” পিসির নির্বিকারত্ব এতক্ষণে ঘুচল। কথার মধ্যে প্রবেশ করলেন সন্দেহ—কুটিল চোখ নিয়ে।
”নিশ্চয়।”
”আমি বেঁচে থাকতে!” চাপা গর্জন আর পিসির উঠে দাঁড়ানো দেখে ঘুনু চেয়ারে তাঁর অবস্থান পালটে ইঞ্চিখানেক পিছোলেন। বাঁ হাতটা আপনা থেকেই বুশ শার্টের কলারের কাছে উঠে গেল।
”কেন? কী করেছে ও? যেখানে খুশি ও খেলবে, যার সঙ্গে খুশি ও যাবে। ও কি গাধা—গোরু যে, দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে যাবেন?”
”আহাহা আপনি এত চটছেন কেন, নাকুর তো দুটোই পা, ও কেন গাধা—গোরু হতে যাবে? আমরা ওই পা দুটোই চাইছি। অন্য কেউ এসে ওর পা ধরে যাতে টান না মারে সেজন্যই ওকে পতুর বাড়িতে সরাতে চাচ্ছি। আপনি অল্পেই রণচণ্ডী মূর্তি ধরেন। আজ সকালে আমার…” ঘুনু গলায় হাত বোলাতে শুরু করলেন। রেখা গুপ্ত অপ্রতিভ হয়ে আড়চোখে তিনজনের মুখ লক্ষ করে বুঝলেন সকালের কাজটা নিয়ে এরা বহুদিন তাঁর পেছনে লাগবে।
”ঘুনুদা, আপনি কি আমায় বাচ্চচা ছেলে ভেবেছেন? কেউ ধরে নিয়ে যাবে বললেই কি অমনই ধরা দিয়ে দেব। তা ছাড়া, আমি যাত্রীতে খেলব এ ধারণাটাই বা আপনাদের হল কী করে?” সমীরণ বিরক্তি লুকোবার চেষ্টা করল না।
”তোর জায়গায় তিনটে প্লেয়ার আনছে, সেটা তো জানিস? আমাদের বুকুকেও টোপ দিয়েছে। সারথি এখন ডেসপ্যারেট একটা—দুটো স্ট্রাইকার পাওয়ার জন্য। নইলে গত তিন বছর একটাও বড় ম্যাচে গোল করতে না পারা বুকুকে কিনা দু’লাখ অফার দেয়?” ঘুনু তাজ্জব বনেছেন বোঝাতে চোখ পিটপিট করলেন।
”তা হলে বুকু চলে যাক সারথিতে।” সমীরণ আলস্য ভাঙার জন্য দু’হাত তুলে দেহে মোচড় দিল। ”দু’লাখ পেলে যাওয়া উচিত।”
”পাগল হয়েছিস। সারথিতে গিয়েই যাত্রীকে গোল দেবে। ওকে যেতে দেওয়া চলবে না, দুই—পঁচিশে ও রাজি হয়েছে। আজকেই ওকে পতুর বাড়িতে জিম্মে করে দিয়ে এলাম। তুইও এবার চল।”
”বুকু অর্থাৎ কিশলয় দত্তকে দুই—পঁচিশ, যে গত তিন বছর ধরে বড় ম্যাচে গোল করতে পারেনি। আর সমীরণ গুপ্তকে এক লাখ ষাট হাজার! বাহ!” হিমাদ্রি দাদার হয়ে দরাদরির প্রথম ধাপে পা রাখল। ”আর দুলাল চক্রবর্তীর মতো বানপ্রস্থের সময় হওয়াকে কত অফার দিয়েছেন?”
ঘুনু মেজাজ হারালেন না। খোঁচাটাকে সরল হাসি দিয়ে ভোঁতা করে বললেন, ”মানছি দুলালের বানপ্রস্থের সময় হয়ে গেছে এখন ও পঁয়ত্রিশ মিনিটের প্লেয়ার। কিন্তু বড় ম্যাচে এখনও ওর জায়গায় খেলবার মতো লোক এদেশে নেই। এজন্যই ওকে নিতে হবে। বলেছি তো, ছেঁকে তুলে নেব এবার, টাকাপয়সা নিয়ে কোনও কার্পণ্য যাত্রী করবে না। তা হলে নাকু?” ঘুনু চেয়ার থেকে ওঠার মতো ভাব দেখালেন।
”তা হলে কী?” সমীরণ পা দুটো ছড়িয়ে চেয়ারে শরীর এলিয়ে জানিয়ে দিল, সে ব্যস্ত নয়।
”মামণির পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে, সামনেই পার্ট ওয়ান। পতুর গাড়ি নিয়েই এসেছি। ব্যাগে শার্ট—প্যান্টটা ভরে এবার বেরিয়ে পড়, পাজামা নিতে ভুলিসনি।” অত্যন্ত নিশ্চিন্তে কথাটা বলে, কী যেন ভাবতে ভাবতে প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে ঘুনু, নস্যির নতুন ডিবেটা বের করে ঢাকনায় কয়েকটা চাঁটি দিলেন। রেখা গুপ্তর চোখ নিবদ্ধ হল ডিবেটায়। শ্যামলা হাত দিয়ে মুখ চাপল। হিমাদ্রি হঠাৎ বিষম খেয়ে বেসিনের দিকে ছুটে গেল।
সমীরণ এসব লক্ষ করেনি। কারণ চোখ বন্ধ করে সে তখন ভাবছিল। ”ঘুনুদা, আমি যাত্রীতে যাব না।”
নীল আকাশ থেকে ঘুনুর মাথায় বাজ পড়লেও এত অবাক তাঁকে দেখাত না। ”যাবি না! আমি যে পতুকে দিব্যি গেলে বলে এসেছি, তোকে নিয়ে যাবই! আমার মাথাকাটা যাবে, লজ্জা রাখবার জায়গা থাকবে না…”
”থাক ঘুনুদা, এসব কথা বলে লাভ নেই। আমার সঙ্গে কথা না বলেই দিব্যি গেলে ফেলেছেন?” সমীরণ কঠিন গলায় ইঙ্গিত দিল বাজে কথা সে শুনতে চায় না।
”দাদাকে কি গা—গো ভেবেছেন?” শ্যামলা ফুট কাটল।
”গা—গো!” ঘুনু ঘাবড়ে গেলেন, ”তার মানে?”
”ও কিছু নয়।” সমীরণ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করল। ”মলার মাথায় পোকা আছে, সেগুলো মাঝে মাঝে নড়ে ওঠে।”
”আহহ।” নিশ্চিত বোধ করে ঘুনু নস্যির ডিবের ঢাকনাটা খুলে আঙুল ঢোকালেন। তাই দেখে রেখা গুপ্ত কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন, শ্যামলা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে তাঁকে চুপ থাকতে ইশারা করল।
”দ্যাখ নাকু এক—ষাটটা হল চুক্তি, আর গুঁড়ো পঞ্চাশ হাজার। তা হলে দু’লাখ দশ হাজার। গত দু’বছর ধরে তোর পেছনে লেগে রয়েছি, এবার আর…” টেবিলে হুমড়ি খেয়ে ঘুনু আঙুলের টিপে নস্যি সহ সমীরণের দিকে দু’হাত বাড়ালেন। ”সীতেশের গ্রুপের ছেলে বুকু । ওকে প্রোটেক্ট করার জন্য সীতেশই দু’বছর ধরে তোকে যাত্রীতে আনার ব্যাগড়া দিয়ে গেছে। এ—বছর পতু এসে ওকে কোণঠাসা করে দিয়েছে, তবে বুকুকেও পতু রাখতে চায়। তুই প্রথম দুটো ম্যাচে গোল কর, বুকু ফুকু ফুটে যাবে, সীতেশরাও ভেসে যাবে।”
”যাকে ফোটাতে চান, তার থেকে দাদা পনেরো হাজার কম নেবে কেন?” হিমাদ্রি জেরা করার ভঙ্গিতে বলল। ”সাতটা গোল তিন বছরে, এক—একটার দাম কত হবে বলে মনে হয়!”
