ক্ষিতীশ ঘাড় নাড়ল।
ভেলো বলল, ”স্ট্রেংথই নেই, আদ্দেকের পর আর টানতে পারছিল না। ওকে এখন খুব খাওয়াতে হবে। তাই না ক্ষিদ্দা?”
”আমরা এখন চলি।”
ক্ষিতীশ পিছনে মুখ ঘুরিয়ে দেখল দূরে কোনি দাঁড়িয়ে। ফ্রক পরে। কাঁধে প্লাসটিকের ব্যাগ।
”আমার খুবই ইচ্ছে, ও সাঁতার শিখুক, বড় হোক, নাম করুক।” তারপর ইতস্ততঃ করে কমল বলল, ”আর, যতটুকু পারি টেনেটুনে চালিয়ে খরচ করার চেষ্টা করব।”
ওদিকে প্রাইজ দেওয়া হচ্ছে। নাম ডাকা এবং হাততালির শব্দ লাউডস্পীকারে ভেসে আসছে।
”মেয়েদের মধ্যে প্রথম…”
ক্ষিতীশ তাকিয়ে ভাইবোনের দিকে। প্রাইজ না নিয়ে চলে যাছে উল্টোদিকের পথ ধরে। ভাঙ্গা রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে গলে রাস্তায় পড়বে। কমল গলে বেরিয়েছে। কোনি কাত হয়ে মাথা নিচু করে। ঝটকা দিয়ে সে এবার ফিরে দাঁড়াল।
”…বালিগঞ্জ সুইমিং ক্লাবের হিয়া মিত্র। টাইম—পঁয়ত্রিশ মিনিট আঠারো সেকেন্ড।”
কোনি মাথা নামিয়ে রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে গেল।
”তোমার কি মাথা খারাপ হল নাকি ক্ষিদ্দা!”
”কি করে বুঝলি।”
”ওই পিলসুজমার্কা সিড়িঙ্গে, কেষ্ট তুলসীর মত রঙ, খেতে পরতে পায় না, ওকে তুমি সাঁতার শেখাবে, আবার দায়িত্ব নেবে?”
”হ্যাঁ, তা না হলে কি শেখানো যায়?”
”দায়িত্ব কথাটার মানে?”
”মানে, খাওয়া—পরার দায়িত্ব, মানসিক গড়ন, যেটা সব থেকে ইম্পর্ট্যান্ট, তাই গড়ে তোলার দায়িত্ব, রেগুলার ট্রেনিং করানোর দায়িত্ব, এইসব আর কি।”
”তা হলে তো ওকে বাড়িতে এনে রাখতে হয়।”
”দরকার হলে রাখতে হবে। এককালে গুরুগৃহে থেকেই তো শিষ্যরা শিখতো। সিস্টেমটা খুব ভালো।”
”সিস্টেমের মধ্যে বৌদির কথাটা মনে রেখেছো তো!”
ক্ষিতীশ রেগে উঠে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। থেমে, কান পাতল, লাউডস্পীকারে।
”কনকচাঁপা পাল, আন—অ্যাটাচড। কনকচাঁপা পাল।” তারপর মৃদু ফিসফিস শোনা গেল, ”বোধহয় চলে গেছে। থাক রেখে দাও।”
ক্ষিতীশ দেখল, সবুজ ফিয়াটের ধারে লাজুক মুখে হিয়া দাঁড়িয়ে। আনন্দ ফেটে পড়েছে ওর দুই গালের টোলে। এক মহিলা বাক্সটা তুলে মেডেলটা দেখছে আর হাসছে। প্রণবেন্দু ওদের সঙ্গেই দাঁড়িয়ে। সুপুরুষ, সুবেশ এক ভদ্রলোককে সে কি একটা বোঝাবার জন্য হাত পাড়ি দিয়ে বাটারফ্লাই স্ট্রোকের ভঙ্গি করল।
”সামনের বছর দেখা যাবে।” নিজেকে উদ্দেশ করে আপন মনে ক্ষিতীশ বলল।
”কিছু বলছ ক্ষিদ্দা?”
ক্ষিতীশ জবাব দিল না।
”শেখাবে যে, জল কোথায়? জুপিটারে তুমি আর ট্রেনার নও। তাহলে মেয়েটাকে কোথায় নামিয়ে শেখাবে? অন্য ক্লাবে তোমায় যেতেই হবে।”
”না, আমি জুপিটারেই ওকে শেখাব। দেখি কে আমায় আটকায়। তার আগে আমাকে রোজগারে নামতে হবে রে ভেলো। এখন আমার টাকা চাই। বিষ্টু ধরের সঙ্গে দেখা করা দরকার।”
।। ৬ ।।
ওরা তখন খেতে বসেছে।
হঠাৎ দরজায় ক্ষিতীশকে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
”তোমাকে দরকার, একটু বাইরে এসো।”
কোনিকে লক্ষ করে কথাগুলো বলে, সে দরজা থেকে সরে গেল। ওইটুকু সময়ের মধ্যেই সে দেখে নিয়েছে কয়েকটা কাঁচা লঙ্কা, কাঁচা পেঁয়াজ, ফ্যান এবং সম্ভবত তার মধ্যে কিছু ভাত আছে আর তেঁতুল। পাঁচটি প্রাণী কলাই আর অ্যালুমিনিয়ামের থালা নিয়ে বসে। ঘরে একটা তক্তপোশ। তোষক নেই, শুধু চিটচিটে ছোট একটা বালিশ। দেয়ালে টাঙানো দড়িতে কিছু ময়লা জামা—প্যান্ট। খোলার চালের এই ঘরে একটি মাত্র জানলা, যার নিচেই থকথকে পাঁকে ভরা নর্দমা।
কোনি কৌতূহলী চোখে বেরিয়ে এল।
”এই ফর্মটায় সই করে দাও, আর আজ বিকেলে আমার সঙ্গে জুপিটার ক্লাবে যাবে।”
ফর্মটা হাতে নিয়ে কোনি যেন কেমন এক ফাঁপরে পড়ল। ”কলম আছে আপনার কাছে?”
ক্ষিতীশের কাছে নেই
”পেন্সিলে লিখলে হবে?”
”না, কালিতে সই করতে হবে।”
কোনি ছুটে গিয়ে কোথা থেকে কলম যোগাড় করে আনল। ক্ষিতীশের দেখিয়ে দেওয়া জায়গায় কলম বাগিয়ে সে জানতে চাইল, ‘ইংরিজিতে না বাঙলায়?”
”যা খুশি।”
ধরে ধরে, বিড়বিড়িয়ে বানান করে কোনি ইংরাজীতেই সই করল। সেটা দেখে ক্ষিতীশ বলল, ”কোন ক্লাশে পড়ো?”
”ফাইভে।”
”স্কুলে যাও?”
”নাম কেটে দিয়েছে।”
”আজ ঠিক চারটের সময় কমলদিঘির পশ্চিম দিকের বড়গেটের মুখে দাঁড়িয়ে থাকবে। তোয়ালে, কস্ট্যুম সব নিয়ে যাবে।”
”তোয়ালে নেই।”
”আমি নিয়ে যাব। তুমি ঠিক সময়ে আসবে।”
ঠিক সময়েই কোনি হাজির ছিল। ক্ষিতীশ ওকে নিয়ে ক্লাবে ঢুকল। অফিস ঘরে হরিচরণ আর প্রফুল্ল বসাক। ক্ষিতীশ ফর্মটা প্রফুল্লের হাতে দিল। সেটা পড়ে প্রফুল্ল বলল, ”সুইমার?”
”হ্যাঁ।”
”ট্রায়াল দিতে হবে।”
”তার মানে!” ক্ষিতীশ বিরক্ত হয়েই বলল, ”আমি বলছি তাতে হবে না?”
”তা কি করে হয়! ক্লাবের একটা নিয়ম আছে তো। ট্রেনার যদি বলে তবেই সুইমার। যে—সে, যাকে—তাকে এনে সুইমার বলবে আর জলে নেমে যদি ডুবে যায় তখন আমরাই তো হাঙ্গামায় পড়ব।”
প্রফুল্ল কথাগুলো বলতে বলতে হরিচরণের দিকে তাকাল। জানলার বাইরে তাকিয়ে হরিচরণ তখন মুচকি হাসছে।
”যে সে! আমি তাহলে যে সে?” ক্ষিতীশ বিড়বিড় করল থমথমে স্বরে। কোনি অবাক হয়ে দেখছে, দলে দলে ছেলেরা কস্ট্যুম পরে ক্লাব থেকে বেরোচ্ছে। তিন—চারটি মেয়েও আছে তার মধ্যে। বাইরে হৈ চৈ জলের ধারে ‘নভিস’ ছেলেদের।
