”শুনতে শুনতে লজ্জায় মাথা নুয়ে আসে। তারপর রাগও হয়।” সমীরণ হঠাৎ সোজা হয়ে বসে রাগী দাঁতচাপা স্বরে বলল, ”ইচ্ছে করে লণ্ডভণ্ড করে দিই কলকাতার ফুটবলকে। শুধু ট্রফি জেতা, লিগ জেতা ছাড়া আর কিছু এরা ভাবে না। সারা পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে, এমনকী পাশের এই বাংলাদেশও আমাদের ফেলে এগিয়ে গেছে আর আমরা এখানে ট্যাকটিকস আর স্ট্র্যাটেজি ভেঁজে বড় বড় বুলি কপচাচিছ। বাইরে থেকে প্লেয়ার ধরতে লাখ লাখ টাকা খরচ করছে এই দুটো ক্লাব। ভাবতে পারো বিনু জন, আলবুকার্ক, কার্নাইল এরা কিনা প্লেয়ারের জাত? অথচ এরাই এখন ময়দানের আরাধ্য দেবতা। এদের আনার চেষ্টা হচেছ আমাকে কোণঠাসা করার জন্য।”
”সে কী রে!” পিসি আঁতকে উঠলেন। ”কোণঠাসা তো ওরাই হবে তোর কাছে।”
”তোকে কি সারথির আর দরকার নেই?” হিমাদ্রি ভ্রূ তুলে জানতে চাইল। ”তোকে যাত্রীতে যাওয়ার সুযোগ দিলে ইলেকশনে বটার কী অবস্থা হবে?”
”কথাটা দরকার বা অদরকারের নয়, টাকা দিয়ে আমায় অবশ্যই ধরে রাখবে। বটা বিশ্বাস যতই আমায় অপছন্দ করুক, সে জানে আমি যা সার্ভিস ক্লাবকে দেব, আর কেউ সারা বছর ধরে তা দিতে পারবে না। এটা সারথির জনতাও জানে। কিন্তু বটা বিশ্বাস ওর নিজের ক্লাবের কয়েকটা প্লেয়ার দিয়ে মাঠে আমায় সারা বছর খাস্তা করার চেষ্টা করবেই। ম্যাচ গড়বড় হলেই ওর পোষা ছেলেরা টেন্টে ইট ছুড়ে আগুন ধরিয়ে ঝামেলা পাকাবে আর দোষটা আমার ঘাড়ে ফেলবে। অবশ্য ওর গোষ্ঠীতে যদি ভিড়ি তা হলে কিছুই হবে না।”
”তুই তো বাঙ্গালোর চলে যাবি, তোকে তো তা হলে আর খেলতে হচ্ছে না।” শ্যামলা বলল, ঝামেলা এড়াবার একটা রাস্তা বাতলে।
”আরে, চলে যাওয়াটা কি চিরকালের জন্য? ক্যাম্প থেকে ছেড়ে দেবে, তখন এসে খেলব। আবার ডাকবে, চলে যাব। আমাকে বাইশ তারিখের মধ্যে কোঝিকোড় পৌঁছতেই হবে। নাগজির খেলা শেষ হলে নোভাচেক যদি মনে করে তা হলে ধরে রাখতে পারে একসঙ্গে ট্রেনিংয়ের জন্য। আবার লিগে খেলার জন্য ছেড়েও দিতে পারে। সবই ওর ইচ্ছের ওপর।”
”তোকে তো সারথি কন্ট্র্যাক্ট করতে বলবে।” হিমাদ্রি জানতে চাইল না, একটা স্বতঃসিদ্ধ ঘটনা যেন বিবৃত করল। ”যাত্রীও তোকে চাইছে, বেশি টাকা দেবে বলেছে। দু’পক্ষের দরটা আগে শুনে নে।”
”দরটর শুনে কাজ নেই। নাকু, তুই আগে ভাল করে খেলাটা তৈরি কর। ওই চেক সাহেবের কাছ থেকে যত্ন করে সব শিখে নে। সম্মান বাড়া দেশের, দেখবি তাতে তোরও সম্মান বাড়বে।” পিসির কথাগুলো দৃঢ়স্বরে বলা এবং তাইতে বাকি তিনজন অস্বস্তিতে পড়ল।
”পিসি, দাদা তো দেশের সম্মান নিয়ে ভাবছেই, কিন্তু টাকাটাই বা ছাড়বে কেন?” শ্যামলা বাস্তবের কাছাকাছি পিসিকে ধরে রাখার চেষ্টা করল। ”এই তো একটু আগে বললে, রক্তজল করে খেলে সেজন্য টাকাকড়ি নিশ্চয় নেবে, যারাই বেশি টাকা দেবে…”
”মলা তুই ভুল করছিস।” হিমাদ্রি থামিয়ে দিল। ”পিসি বলতে চায় টাকা তো নেবেই কিন্তু দেশের মর্যাদাও বাড়াতে হবে, তাই তো?”
”হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই—ই”, পিসি সমাধানটা পেয়ে গিয়ে হাঁপ ছাড়লেন। আর ঠিক তখনই বাড়ির সামনে মোটরগাড়ির দাঁড়িয়ে যাওয়ার মতো শব্দ ভেসে এল।
”এখন আবার কে!” সমীরণ ওয়ালঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ”এই সাড়ে দশটায়!”
হিমাদ্রি জানলার কাছে উঠে গেল। শ্যামলা ফটকের আলোটা জ্বেলে দিল।
সবুজ মারুতির দরজা খুলে নামছে ঘুনু মিত্তির। রাস্তায় পা রেখেই বাড়ির জানলার দিকে ইশারা করে আলো নিভিয়ে দিতে বলল।
”ঘুনুটা আবার এসেছে, মলা আলো নিভিয়ে দে।’ হিমাদ্রি রিলে করল জানলা থেকে। দরজা খুলতে খুলতে সে বলল, ”এত রাতে যে, কী ব্যাপার?”
”এত রাত আর কোথায়, মাত্র তো সাড়ে দশ। কলকাতায় এখনও ট্রাম—বাস চলছে, খাবারের দোকান খোলা রয়েছে। তোমাদের অবশ্য একটু বেশি রাতই। যারা ফুটবলার ক্যাচ করে বেড়ায় তাদের কাছে দুপুর একটা রাত একটা সমানই ব্যাপার।” ঘুনু সমীরণকে দেখে খুবই হৃষ্টমনে ডাইনিংয়ের চেয়ারে বসে পড়ল। ”হুঁ হুঁ বাবা, একটু রাত না করলে কি বাড়িতে যাওয়া যায়?”
”আর একটু দেরি করলে দাদাকে আর পেতেন না।’ হিমাদ্রি গম্ভীর গলায় বলল। ঘুনু চমকে উঠলেন, ”কেন, কেন?”
”সারথির লোক দু’বার এসে খোঁজ করে গেছে। হয়তো রাতেও আসবে। তাই দাদা রাতে বাড়িতে থাকবে না।” হিমাদ্রির থেকেও শ্যামলা আর একটু গম্ভীর গলায় বলল।
”সারথির লোক!” ঘুনু বিরক্তি, ভয়, উদ্বেগ মিশিয়ে তাকালেন। ”বঙ্কু? নির্মল? নাম বলেছে?”
”বলেনি। এইভাবে যখন—তখন ঘনঘন ডিস্টার্বেন্স হলে…আমার পার্টওয়ান পরীক্ষার আর দু’ মাসও বাকি নেই—” শ্যামলা ঈষৎ অনুযোগ কণ্ঠে এবং চাহনিতে ফুটিয়ে তুলল।
”ঠিক, ঠিক, ডিস্টার্বড মাইন্ডে পড়াশোনা, পরীক্ষার প্রিপারেশন হয় না, ফুটবল তো খেলাই যায় না। নাকু, গুছিয়ে নে। দুটো শার্ট, একটা প্যান্ট, একটা পাজামা হলেই হবে।”
”দুটো শার্ট, দুটো প্যান্ট গুছিয়ে নে, তার মানে?”
সমীরণের আকাশ থেকে পড়ার মতো অবস্থা। এমনটি তার আজই হয়েছিল যখন বাসবের গলিতে ওরা তিনজন আচমকা ছুটে এসে তাকে ধরেছিল।
”মানে হল, পতুর বাড়িতে এখনই তোকে নিয়ে যাব।”
”নিয়ে যাবে মানে?”
”ওখানে থাকবি, ওখান থেকে সই করতে যাবি, সই করেই সোজা দমদমে গিয়ে প্লেনে উঠবি। কোথাকার টিকিট কাটব বল? মাদ্রাজ, বাঙ্গালোর, না হায়দরাবাদের? মাদ্রাজেরই কেটে রাখি, ওখান থেকে সাউথের সব ফ্লাইটগুলোই পাবি।”
