”তাড়াতাড়ি চল, সুটকেসটা নিয়েই বাড়ি রওনা হব, অনেক কাজ আছে।” সমীরণ জোরে পা চালাল।
”সমীরণদা একটু বসবেন না, একটু মিষ্টি…”
”না, না, মিষ্টি আমি খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।’
”সমীরণদা, আপনার জন্য রিকশা…”
”দরকার নেই, হেঁটেই…”
”সমীরণদা, মালাটা অন্তত নিয়ে যান।”
”ওটা গড়গড়িদাকে দিয়ো।”
।। ৪ ।।
রাত্রের খাওয়া শেষ করে টেবিলেই ওরা গল্প শুরু করেছিল। প্রায় রাতেই ওরা চারজন কিছুক্ষণ বসে সারাদিনের ভালমন্দ অভিজ্ঞতার বা ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলে থাকে। আজ ঘুনু মিত্তির এবং নিলু গড়গড়ি প্রসঙ্গ ওঠে।
”ফুটবলারদের গাধা—গোরু বলল! তার মানে, নাকু তুই…” রেখা গুপ্তর অসহ্য বিস্ময় আরপ্রচণ্ড রাগ মিশে গিয়ে তাঁকে বাক্য শেষ করার সুযোগ দিল না।
সুযোগ নিল শ্যামলা। ”একটা গাধা—গোরু। সমীরণ গুপ্ত, নামের পাশে টাইটেল গা গো।” তারপর সমীরণের কানে কানে বলল, ”যেমন তুই বেগার শব্দটা তৈরি করেছিস।”
”ঠাট্টা নয় মলা, ঠাট্টা নয়।” হিমাদ্রির মুখ সিরিয়াস হয়ে উঠল। ”দাদা তো আর বাংলা কাগজগুলো বাঙ্গালোরে পড়ার সুযোগ পায়নি, পেলে বুঝতে পারত স্টার ফুটবলাররা এক—একটা সত্যিই গা গো। এই তো সারথির রণেন পাল আর দেবী মাইতিকে যাত্রীর পতু ঘোষ দু’লাখ আশি হাজার দর দিয়েছিল। ওরা বলে বটা বিশ্বাসের সঙ্গে কথা না বলে কিছু করবে না। ওরা এসে বটাকে বলল যাত্রী এই টাকা দেবে, আপনি দর না বাড়ালে যাত্রীতে চলে যাব। বটা তখন দুজনকে দু’লাখ ষাট করে দেবে বলল। আর দু’জনের গতবারের বকেয়া ছিল পঁচিশ হাজার করে, সেটাও মিটিয়ে দেবে বলল। ওরা মেনে নিয়ে অ্যাডভান্স নিল। তারপর কী করল জানো? দু’জনেই পতু ঘোষের কাছে গিয়ে বলল, আমাদের যদি তিন লাখ করে দেন তা হলে সারথির অ্যাডভান্স ফিরিয়ে দেব।”
”এইসব কথা কাগজে বেরিয়েছে, না কি তুই বানিয়ে বানিয়ে বলছিস কানু!” রেখা গুপ্ত অবাক হয়ে বললেন।
”পিসি, কাগজগুলো এখনও ঘরে রয়েছে তোমাকে সব দেখাতে পারি, লাইন—বাই—লাইন সত্যি। কিন্তু তোমাকে দেখাব না।”
”কেন?”
”তা হলে তুমি দাদাকে আর ফুটবল খেলতে দেবে না।”
”কেন দেব না? পরিশ্রম করে খেলা শিখেছে, বছরে এত গাদা গাদা ম্যাচ খেলছে রক্ত জল করে, সেজন্য টাকাকড়ি নেবে না? নিশ্চয় নেবে। মজুরি বাড়াও, মাইনে বাড়াও করে শ্লোগান দেবে, মিছিল করবে কুলিমজুর, কেরানিরা, তার বেলা দোষ হয় না, আর ফুটবলাররা দুটো টাকা বাড়াতে চাইলেই মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল! নাকু এবার যারা বেশি টাকা দেবে তুই সেখানেই খেলবি।”
সমীরণ হাসল। মাথা নামিয়ে কয়েক সেকেন্ড ভেবে নিয়ে মন্থর ভারী গলায় বলল, ”নিলু গড়গড়ির কথাগুলোর মধ্যে অনেক সত্যি জিনিস আছে পিসি। ফুটবলাররা নিজেদের মর্যাদা নিজেরাই খুইয়েছে নানানভাবে। দর বাড়াবার জন্য এই যে একবার পতু একবার বটা আবার পতু, এতে কয়েক হাজার টাকা হয়তো বাড়ানো যাবে কিন্তু ক্লাবের সমর্থকরা কি এদের মানুষ হিসাবে উঁচুতে স্থান দেবে না কি ওরা নিজেরাই নিজেদের সৎ মানুষ ভাববে? ভেবে দ্যাখো পিসি, দেশে এখন অন্যান্য খেলার সঙ্গে তুলনায় ফুটবলের স্থান কোথায়? শুধু বাংলাতেই ফুটবল নিয়ে নাচানাচি হয়। এখানে রাস্তায় হাঁটলে বহু মানুষই তাকায়, ছেলেরা অটোগ্রাফ চায়। কাজকর্ম, দরকার নিয়ে কোথাও গেলে আগে সেটা করে দেয়। কিন্তু বাংলার বাইরে ফুটবলারদের এখন আর কোনও খাতির নেই কেননা ইন্টারন্যাশনাল লেভেলে আমাদের কোনও পারফরমেন্সই নেই। আছে ক্রিকেটের, ওরা বিশ্বকাপও জিতেছে। তাই ক্রিকেটারদের পেছনে সবাই ছোটে। আমি নিজে বড় বড় শহরে, কেরল বাদে সব জায়গায়, এটা লক্ষ করেছি। কেন এমন হবে?” সমীরণ তার মর্মবেদনা কণ্ঠস্বরে প্রকাশ করল।
”কিন্তু সেজন্য ফুটবলাররা দায়ী হবে কেন?” হিমাদ্রি তর্ক চালাবার একটা রাস্তা পেয়ে যুক্তির সাইকেলে উঠে পড়ল। ”ভারত ইন্টারন্যাশনাল পর্যায়ে খেলতেই যায় না, না গেলে ফুটবলাররা তৈরি হবে কী করে? ক্রিকেটে যেসব লোক বোর্ডে যায় তারা বেটার ক্লাস অব পিপল, আর ফুটবলে পতু, বটা, ঘুনু এই তো সব নাম! নামেই বোঝা যায় কী ক্লাসের লোক!” হিমাদ্রি ঠোঁট বাঁকাল।
”কানু, তুই ভুলে যাচ্ছিস, বিরাশির এশিয়ান গেমস দিল্লিতে হয়েছিল। তাইতে আমাদের ফুটবল টিম তৈরি করার জন্য বহুবার বাইরে খেলতে দল পাঠানো হয়েছিল ইন্টারন্যাশনাল টুর্নামেন্টে। তখনই আমাদের দেশে নেহরু কাপও শুরু হয়। ভারত এই কাপে এখন পর্যন্ত চৌত্রিশটা ম্যাচ খেলে জিতেছে মাত্র একটা। ইডেনে যুগোশ্লাভিয়াকে হারিয়েছিল সেই বিরাশিতে। গোল দিয়েছে মোট সতেরোটা, খেয়েছে চৌষট্টিটা। নিজের দেশের মাটিতে এত বছর ধরে ইন্টারন্যাশনাল খেলছি, দেশের লোকের সামনে। এতে আলাদা বাড়তি একটা প্রেরণাও প্লেয়ারদের পাওয়ার কথা। দেশের সম্মান দেশের মর্যাদা রক্ষার জন্য, বাড়াবার জন্য প্রাণ বিসর্জন দেওয়াই তখন একমাত্র কাজ হয়ে ওঠে।”
সমীরণ কথা থামিয়ে তিনজনের মুখের দিকে তাকাল। পিসি ও মলা গম্ভীর হয়ে গেছে। কানুর সাইকেলের চাকা থেকে হাওয়া বেরিয়ে যাচ্ছে।
”প্রত্যেকবারই ভারত সবার শেষে। ক্যাম্পে নোভাচেক একদিন বলল, স্যাম, আমাকে সমীরণ বলে না, তোমাদের দেশে কি ফুটবল খেলা হয়? কেমন ফুটবল খেলা হয়? হেলথ নেই, স্পিড, স্ট্রেংথ, স্ট্যামিনা নেই। কিন্তু বেসিক স্কিলগুলো? এখনও পাস ধরতে পারে না, শুটিং পাওয়ার জিরো, কারেক্ট বল দিতে জানে না, এয়ারে ভেরি পুওর, কখন কোথায় থাকতে হবে সেই জ্ঞানটাও নেই। তোমাদের স্কুল লেভেলে কিছুই শেখবার ব্যবস্থা নেই। অজ্ঞ আনস্কিলড, খারাপ স্বাস্থ্য নিয়ে বেশি বয়সে ক্লাব ফুটবলে আসে। সেখানেও কিছু উন্নতির সুযোগ পায় না। খারাপ স্বাস্থ্য নিয়ে সারা বছরই অবিরাম খেলে খেলে এত ক্লান্ত হয়ে থাকে যে, স্কিল বাড়াবার জন্য খাটার ইচ্ছে আর থাকে না। তারপর ইন্টারন্যাশনাল লেভেলে ওরা যখন আসে, আর তখন কী ফুটবল যে খেলে, সেটা তো খেলার ফলই বলে দিচ্ছে।
