ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল সমীরণের কান। মাথাটা একটু নিচু হয়ে গেল। নিলু গড়গড়ির কথার মধ্যে এখনও সে অন্যায্য কোনও বস্তু পায়নি। কিন্তু তার সামনে এসব কথা তোলা কেন? সে নিজে তো কখনও মর্যাদা হারাবার মতো কোনও কাজ করেনি! শুধু পাঁচ বছর আগে যখন সে প্রথম ময়দানে খেলতে নেমেছিল, যখন অনভিজ্ঞ কাঁচা ছিল তখন লাল কার্ড দেখেছিল রেফারিকে অপমান করে। পরের বছর ছোট ক্লাব থেকে বড় ক্লাবে, যা সব তরুণ ফুটবলারই চেষ্টা করে। তার পরের বছর অন্য ক্লাবে গেছে বেশি টাকার অফার পেয়ে। এতে অন্যায়টা কী? এ তো তার উন্নতিরই স্বীকৃতি।
কিন্তু তারপর তো সে আর ক্লাব বদলায়নি। টাকাকড়ি নিয়ে দরাদরি, প্যাঁচ কষে দর বাড়িয়ে নেওয়ার জন্য কাগজে আজেবাজে কথা বলা, গ্রুপবাজি করা এসব তো সে কখনও করেনি। ইন্ডিয়া ক্যাম্প থেকে বাংলার অনেকে ছাঁটাই হয়েছে নোভাচেকের কঠিন মাপকাঠিতে অযোগ্য বিবেচিত হওয়ায়। সে কিন্তু রয়ে গেছে। তাই নয়, দেশের ক্যাপ্টেনও হতে চলেছে। তার পক্ষে মর্যাদাহানিকর কাজ করা সম্ভবই নয়।
”এরাই সব মর্যাদাবান ব্যক্তি”, এই বলে নিলু গড়গড়ি শ্লেষ মাখানো কণ্ঠে একের পর এক উদাহরণ দিয়ে গেলেন, কোন ফুটবলার মাঠের মধ্যে রেফারির গায়ে থুথু দিয়েছে, রেফারির কান ধরেছে, রেফারিকে লাথি কিল চড় মেরেছে। কোন ফুটবলার এটাই আমার শেষ বছর, তারপর রিটায়ার করবে বলেও পরের বছর বলল ক্লাবের জনতা চাইছে তাই অবসর নেব না। কোন ফুটবলার খেলার কয়েক ঘণ্টা আগে বলেছে বাকি টাকা হাতে না পেলে পায়ে বল ছোঁবে না। গড়গড়ি বলে যাচ্ছেন আর সমীরণ আড়চোখে লক্ষ করল নানান বয়সি শ্রোতা, হাঁড়ি থেকে রসগোল্লা টপাটপ মুখে ফেলে চিবোবার মতো বক্তৃতাটা পরমানন্দে চিবোচ্ছে, চোখেমুখে গড়াচ্ছে মজা পাওয়ার রস।
বক্তৃতা শেষ হলে প্রচুর হাততালি পেয়ে চেয়ারে বসে গড়গড়ি পাশে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন, ”তুমি হয়তো অন্যদের মতো নও, কিন্তু পাপের ভাগ তোমাকে তো নিতেই হবে।”
জবাবে সমীরণ শুকনো হাসি ছাড়া আর কিছু দিতে পারল না, নিলু গড়গড়ি তা লক্ষ করলেন।
”এমন একটা সময় শিগগিরই আসবে যখন গাল দিতে গাধা—গোরু বলা হবে না, বলা হবে ফুটবলার। এক সময় ফার্স্ট ডিভিশন ফুটবল খেলেছি, একথা ভাবলে এখন আমি কষ্ট পাই। হয়তো তুমিও পাবে।” গড়গড়ি আলতোভাবে সমীরণের বাহু স্পর্শ করলেন, যেন আগাম সমবেদনা জানিয়ে।
সমীরণ কাপ, শিল্ড এবং অন্য প্রাইজগুলো হাতে হাতে তুলে দিল। দেওয়ার সময় সবার হাত ধরে ঝাঁকিয়ে হাসলও, কিন্তু কিছুই তার মনে ছাপ রাখছে না। সে কিছুই দেখছে না, কিছুই শুনছে না। তার ভেতরে কোথায় যেন একটা শর্ট সার্কিট ঘটে গিয়ে ইন্দ্রিয় নামক ডায়নামোটাকে বিগড়ে দিয়েছে।
”সমীরণদা, আপনি কিছু বলুন, অন্তত দুটো কথা। ছোট ছোট ছেলেরা আপনার মুখ থেকে দুটো কথা শোনার জন্য খুব আশা করে আছে।”
ক্লান্ত দৃষ্টিতে সমীরণ সামনের ভিড়ের দিকে তাকাল। যা বলব এরা কি বিশ্বাস করবে? নিলু গড়গড়ির কথাগুলো কানে নেওয়ার পর এদের শোনাবার মতো কোনও কথাই সে খুঁজে পাচ্ছে না।
”সমীরণদা…”
সে মাইকের সামনে উঠে এল। কোনও ভনিতা না করেই শুরু করল, ”গড়গড়িদা আমার পিতৃতুল্য, তাঁর বক্তব্য আমি মাথা পেতে গ্রহণ করলাম। আমাদের দু’জনের খেলার সময়ের মধ্যে অন্তত চল্লিশ বছরের ফারাক, এর মধ্যে ময়দানে প্রচুর পরিবর্তন ঘটে গেছে। সেটা ভালর না মন্দের দিকে গেছে তা ভবিষ্যৎকালই বিচার করবে। যদি মন্দের দিকে গিয়ে থাকে তা হলে আমাদের জ্যেষ্ঠরা তা যেতে দিলেন কেন? দূরে দাঁড়িয়ে না থেকে তাঁরা বাধা দিতে পারতেন।
”খারাপ লোকেরা এখন ক্লাব চালাতে আসছেন, কিন্তু তাঁরা ক্লাবের কর্তা হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন কী করে? আমাদের ফুটবল সেট—আপটা কারা গড়েছেন? নিশ্চয়ই এখনকার ফুটবলাররা নয়। আমরা পেশাদারের মতো টাকা নিই, কিন্তু ফাঁকি মারি এই সেট—আপের গলদের সুযোগ নিয়ে। ফুটবলকে মেরে ফেলা ফুটবলারদের একার ক্ষমতায় সম্ভব নয়, কলকাতার ফুটবলে মৃত্যুর বীজাণু বহুকাল আগেই ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর সেটা করেছেন আমাদের পূর্বসূরিরা। হ্যাঁ, ফুটবলকে মমি করে রাখতে চাওয়া হচ্ছে কিন্তু সেই কাজটা তো বয়স্ক লোকেরাই করছেন।” সমীরণ লক্ষ করল ভিড়ের নজর মাঝে মাঝেই নিলু গড়গড়ির দিকে সরে যাচ্ছে। সেই নজরে মজার ঝিলিক নেই।
”টাকার প্রতি লোভ নেই, টাকার প্রয়োজন নেই এমন কেউ যদি এখানে থাকেন, অনুগ্রহ করে এগিয়ে আসবেন কি?”
সমীরণ কথা বন্ধ করল। ভিড় থেকে একটা গুঞ্জন উঠেই নীরবতা নেমে এল। সে ধীরে ধীরে মাথাটাকে দু’বার ঘুরিয়ে দুপাশে তাকাল। অর্থবহ একট নৈঃশব্দ্য তৈরি হল।
”এখনকার ফুটবলাররা আপনাদের মতো ঘরেরই ছেলে। তাদেরও টাকার প্রয়োজন আছে। আপনাদের নমস্কার জানিয়ে আমার নিবেদন শেষ করলাম।”
সমীরণ চেয়ারে ফিরে না গিয়ে মঞ্চের সিঁড়ির দিকে এগোল। ছোট ছোট ছেলেদের জন্য কোনও কথাই বলা হল না। এজন্য মনটা ভার লাগছে বটে আবার কিছুটা হালকাও বোধ করল নিলু গড়গড়ির থমথমে মুখটা দেখে।
”তুই পরশুই আমার রিহার্সালে হাজির হবি।” উচ্ছ্বসিত বাসব ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল। ”দাঁড়িয়ে শুনছিলাম তোর বক্তৃতা। কী গলা, কী ডেলিভারি, কী ড্রামাটিক পঅজ,কী পিচ কন্ট্রোল, কী…” বাসবের দমবন্ধ হয়ে এল।
