সমীরণের অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য কয়েকটি ছেলে মঞ্চের পাশে ভিড় করে এল। সে একে একে সই করে দিল। তার পাশে বসা নীলমণি গড়গড়ির দিকে ওরা ফিরেও তাকাল না। তার বলতে ইচ্ছা করছিল, ওঁর সইটাও তোমরা নাও। কেন জানি বলতে পারল না।
সমীরণ আর গড়গড়ি পাশাপাশি বসে খেলা দেখল, কেউ কারও সঙ্গে কথা বলল না। খেলা শেষ হতেই মঞ্চের সামনে ভিড় জমে গেল। পুরস্কার দেওয়া দেখতে তো বটেই, কাছের থেকে সমীরণকে দেখা আর তার ভাবভঙ্গি, কথাবার্তা লক্ষ করা এবং শোনার জন্যও এই ভিড়।
বারাসাতের তরুণ মিলন সঙ্ঘ দু’গোলে পাইকপাড়ার ফ্রেন্ডস ইউনিয়নকে হারিয়েছে। ঘেমে যাওয়া, শ্রান্ত দুটো টিম মঞ্চের সামনে মাটিতে বসে। সভাপতি বক্তৃতা দেওয়ার পর প্রধান অতিথি পুরস্কার হাতে তুলে দেবে আর তারপর দু—চার কথা বলবে। সমীরণ ইতিমধ্যেই নিলডাউনকে বলে দিয়েছে, বক্তৃতা দেওয়ার প্রতিভা তার নেই সুতরাং দিতে পারবে না।
”আপনারা একটু পিছিয়ে দাঁড়ান। পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান এখনই শুরু হবে। তার আগে আজকের এই ফাইনালের সভাপতি শ্রীনীলমণি গড়গড়ি ভাষণ দেবেন।
গড়গড়ি মাইকের সামনে দাঁড়ালেন। চশমার কাচ মুছলেন পাঞ্জাবির খোঁটায়। গলা খাঁকারি দিয়ে, মাথাটা নামিয়ে কয়েক সেকেন্ড ভেবে শুরু করলেন, ”উপস্থিত ভদ্রমণ্ডলী, পুত্রবৎ সমীরণ গুপ্ত, আজকের দুই দলের খেলোয়াড়রা। এই ফুটবল ফাইনাল অনুষ্ঠানে আমাকে সভাপতিত্ব করার জন্য যখন আমন্ত্রণ করা হয় তখন আমি, যাঁরা আমার কাছে গেছলেন আমন্ত্রণ জানাতে, তাঁদের বলেছিলাম, আমাকে কেন? আমি তো পুরনো দিনের একটা ফসিল। এখনকার ফুটবল, তার পরিবেশ, হালচাল সম্পর্কে কিছুই জানি না। আমার চিন্তা—ভাবনা অন্যরকম, কোনও যোগাযোগই নেই ময়দানের ফুটবলের সঙ্গে। আমি আপনাদের অনুষ্ঠানে গিয়ে যদি কিছু কথা বলি সেটা অন্যরকম শোনাবে। শুনে লোকে হাসবে। ওঁরা বললেন, আপনি যা বলবেন লোকে তা শুনবে, কেউ হাসবে না।
”না, হাসির কথা বলে আপনাদের হাসাবার জন্য আমি এখানে মাইকের সামনে দাঁড়াইনি। আমাদের ফুটবল যে জায়গায় পৌঁছেছে তাতে হাসির বদলে এখন কান্নার সময় এসে গেছে। তার কারণ আমাদের ফুটবল এখন মারা গেছে। তবে আমরা মৃতদেহটাকে না পুড়িয়ে বা কবর না দিয়ে নিজেদের স্বার্থে সেটা মমি করে রাখার চেষ্টা করছি। কিন্তু ঠিকমতো নিয়ম না জানায় মমিটাও ঠিকমতো করা হয়ে উঠছে না, ফলে দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে।
”দুর্গন্ধ কী? আপনারা জানেন দু’বছর আগে ময়দানেই একটা খেলা গড়াপেটা করে হচ্ছে বুঝতে পেরে দর্শকরা—সাপোর্টাররা হাঙ্গামা বাঁধায়, টেন্টে আগুন ধরাতে যায়, প্লেয়ারদের মারে, ক্লাবকর্তাদের মারে। এটাই হল দুর্গন্ধ। গত বছর কাগজে পড়ি একজন বড় প্লেয়ার দলবদলের আগে ক্লাবে থেকে যাবে বলে অ্যাডভ্যান্স নিয়েছে, নেওয়ার সময় বলেছে, এই ক্লাবের তাঁবু তার কাছে মন্দিরের মতো। পড়ে কী ভাল যে লাগল! এই অবিশ্বাস, দুর্নীতি আর অবক্ষয়ের যুগে, ম্যানেজ আর গড়াপেটার যুগে একজনও অন্তত ফুটবলকে ঈশ্বর উপাসনার মতো ব্যাপার মনে করে। টাকাকড়িটা, তার কাছে বড় কথা নয়। কিন্তু তিনদিন পর কাগজেই দেখলাম সেই ফুটবলার আর এক বড় ক্লাবের এক কর্তার ফ্ল্যাটে গিয়ে টাকাপয়সা নিয়ে দরাদরি করছে। এটাও হল দুর্গন্ধ।
”ফুটবলকে মেরে ফেলল কারা? প্রাণবন্ত ছিল আমাদের সময়ের ময়দান, এখন তা শ্মশান। ঘুরে বেড়াচ্ছে শেয়াল—কুকুর, যাদের বলা হয় ক্লাব কর্মকর্তা। এখন বিখ্যাত হওয়ার শর্টকাট রাস্তা হল বড় ক্লাবের অফিসিয়াল হওয়া। ট্যাঁকের জোর থাকলে ভাল, না থাকলেও ক্ষতি নেই। এক পয়সাও ইনভেস্ট না করে লাখ টাকার পাবলিসিটি পাওয়া যায়। অফিসিয়াল হতে পারলে তখন যা বলবেন কাগজে বড়—বড় করে ছাপা হয়ে যাবে, লোকের কাছে পরিচিতি পেয়ে যাবেন। ক্লাব ভাঙিয়ে কানেকশান বাড়ানো যাবে, তাই দিয়ে ব্যাঙ্ক লোন নিয়ে অনেক কর্তার দুনম্বরি কারবার চলছে বলেও কাগজে পড়েছি। এইসব প্রচারলোভী, ময়দানে না এলে লোকে যাদের কোনওদিনই চিনত না, এইসব ক্ষমতালোভী, যারা ফুটবলকে ভালবাসে না, সততা, নিষ্ঠা, পরিশ্রমের কোনও দাম যাদের কাছে নেই, তারা মনে করে যেহেতু তাদের টাকা আছে তাই ময়দানটাকে ইচ্ছে করলেই কিনে নিতে পারে, ফুটবলারদের যারা কুকুর—বেড়ালের মতো মনে করে, তাদের মুখের সামনে টাকার থলি ধরে তু তু করে টেন্টে নিয়ে আসে। এই টাকার লোভই আমাদের ফুটবলের সর্বনাশ করেছে।”
নিলু গড়গড়ি হঠাৎ থামলেন। অনর্গল বাক্যস্রোতে শ্রোতারা ভেসে যাচ্ছিল। তাদের পাড়ে ভিড়িয়ে দিতেই বোধ হয় তিনি বক্তৃতা বন্ধ করে মুখ ফিরিয়ে সমীরণের দিকে তাকালেন। শ্রোতারাও তাকাল। সমীরণ বিব্রত বোধ করল।
”সমীরণ আমার ছেলের বয়সি। এখনকার ফুটবলারদের সম্পর্কে কিছু বললে সেটা নিশ্চয় ওর গায়ে লাগবে তাই আগেই মার্জনা চেয়ে রাখছি। কুকুর—বেড়াল পর্যায়ে আজকের ফুটবলারদের নেমে আসার জন্য কিন্তু তারা নিজেরাই দায়ী। এরা বলে ক্লাব গুরুত্ব দিচ্ছে, মর্যাদা দিচ্ছে, তাই রয়ে গেলাম বা গুরুত্ব—মর্যাদা দিচ্ছে না বলে ক্লাব ছাড়লাম, কিন্তু লক্ষ লক্ষ ফুটবলপ্রেমী মানুষ কাগজে যা এদের সম্পর্কে পড়ছে তাতে তো মনে হয় এক মিলিগ্রাম মর্যাদাবোধও এদের নেই। দলবদলের সময় তো এসে গেছে, আর চার—পাঁচদিন পরই সই করা শুরু হবে। কাগজেই আপনারা পড়ছেন কত নাটক হচ্ছে, ফুটবলাররা ডায়লগ ঝাড়ছে। কিন্তু সইটা করার আগে কত রকম ডিগবাজি যে খাবে, শুধু সেটাই এখন লক্ষ করার।”
