”কী আবার হবে! পাড়ার ছেলে, জলে বাস করে কুমিরদের সঙ্গে… আগে চান কর, মা’কে বলছি, ভাতটাত করে দিতে।”
কথামতোই ওরা এসে সমীরণকে ঘুম থেকে তুলল। হাঁটলে মাঠটা মিনিট পাঁচেক দূরে, ওরা সাইকেল রিকশায় জোর করেই তুলল।
”এতবড় প্লেয়ার হেঁটে যাবে? তাই কখনও হয়। আমাদের নিন্দে হবে না?” সেই নিলডাউন একদম নতুন ভঙ্গিতে হাত জোড় করে বলল এবং উঠে সমীরণের পাশে বসল।
”আমি তো চিফ গেস্ট, আজকের সভাপতি কে?”
”নীলমণি গড়গড়ি, আপনি চেনেন? খুব বড় প্লেয়ার ছিলেন একসময়ে।”
”আলাপ হয়নি, নাম শুনেছি, উনি যখন খেলতেন তখন আমি জন্মাইনি।”
দূর থেকে লাউডস্পিকারে ভেসে আসছে ”নেতাজি স্পোর্টিং ক্লাবের পরিচালনায় সেভেন—এ—সাইড ফুটবল প্রতিযোগিতা, শহিদ বিপুল কুণ্ডু চ্যালেঞ্জ কাপ ও তিনকড়ি চ্যালেঞ্জ শিল্ডের ফাইনাল খেলা এখনই শুরু হতে যাচ্ছে। আজকের খেলায় সভাপতি অতীত দিনের প্রখ্যাত খেলোয়ার এবং কোচ নিলু গড়গড়ি … নীলমণি গড়গড়ি, আর প্রধান অতিথি….” একটু থেমে, ”সমীরণ গুপ্ত, যার কোনও পরিচয় দেওয়ার দরকার হবে বলে মনে করি না।”
”শুনলেন?”
”হুঁউ।”
আবার ভেসে এল, ”নির্দিষ্ট প্রধান অতিথি তুষার মৈত্রর শাশুড়ি মারা যাওয়ায় তিনি আজ সকালে বর্ধমান চলে গেছেন, এজন্য আমরা দুঃখিত।”
সমীরণ চোখ বড় করে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে নিলডাউনের দিকে তাকাল।
”এসব না বললে পাবলিক ম্যানেজ করা যায় না। ফুটবলারদের চরিত্র যে কী, দাদা আপনি কিছু মনে করবেন না, লোকে একদমই জানে না। আমরা ছোটখাটো ক্লাব করি, এইসব টুর্নামেন্ট থেকেই তো ফুটবলার বেরিয়ে আসে। কিন্তু আমাদের দিকে বড় বড় ক্লাব, বড় বড় ফুটবলার কোনও নজর দেয় না। পাড়ার লোক, দোকানদার এদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে টুর্নামেন্ট চালাই। দেনাও হয়। আস্তে আস্তে শোধ করি। আমাদের দোষ—ত্রুটি—অপরাধ আপনি মাফ করে দেবেন সমীরণদা।”
শুনতে শুনতে সমীরণের মাথা নীচের দিকে নেমে গেল। ফুটবলটা আসলে কারা বাঁচিয়ে রেখেছে তা সে বোঝে। এইরকম ছোট ছোট ক্লাব বাংলার সর্বত্র রয়েছে। তাদের পাড়াতে এমন একটা ক্লাব থেকেই তো সে খেলা শুরু করেছিল। যদি ক্লাবটা না থাকত, যদি বরেন মুখোটি তাকে ফুটবলের গোড়ার জিনিসগুলো না শেখাতেন তা হলে আজ সে এত খ্যাতি, এত টাকার মুখ কি দেখত?
রিকশা মাঠের ধারে পৌঁছে গেছে। তক্তপোশের ওপর মঞ্চটা সাদা কাপড়ে ঢাকা। একটা টেবিলে একটি কাপ ও একটি শিল্ড আর ছোট দুটি কাপ। পিতলের ফুলদানিতে রজনীগন্ধার গোছা। জমিতে রাখা একটা টেবিলে পুরস্কার সামগ্রী—শস্তার কিটব্যাগ ও তোয়ালে।
”সমীরণ গুপ্ত এসে গেছেন। খেলা এখনই আরম্ভ হবে। প্রতিযোগী দল দুটিকে অনুরোধ করা হচ্ছে প্রধান অতিথি সমীরণ গুপ্তর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য তারা যেন এবার সেন্টার লাইনের কাছে সার দিয়ে দাঁড়ায়। রেফারি, লাইন্সম্যান, আপনারাও দাঁড়াবেন।”
সভাপতি ও প্রধান অতিথিকে মালা দেওয়া হল। সমীরণের মনে হচ্ছে সে যেন ইলেকট্রিক মাঠে রয়েছে। চারদিকে বাড়ি, অসমান ঘাসহীন জমি, মাঠ ঘিরে বালক, মাঝবয়সি, এমনকী বৃদ্ধরাও ঠেলাঠেলি করছে সাইড লাইনের ধারে। ছাদে, বারান্দায়, গাছেও মানুষ। এদের বেশিরভাগই কলকাতার ময়দানে কখনও খেলা দেখেনি, যদিও এখান থেকে বাসে ময়দান যাওয়া যায়। ছোট মাঠে, আজীবন এই ফুটবল দেখেই খুশি থাকবে কত লোক! তার নাম শুনেছে, কাগজে ছবি দেখেছে, হয়তো টিভিতেও খেলা দেখেছে, কিন্তু তাকে সামনাসামনি এই প্রথম দেখছে। এরা কী ভাবছে তার সম্পর্কে?
টিম দুটোর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য মাঠের মাঝে যেতে যেতে সমীরণ মাথা ঘুরিয়ে দর্শকদের দিকে তাকাল। হাততালি পড়ছে।
তার জন্যই কি? সে খেলতে নামছে না, তবু এই উচ্ছ্বসিত হওয়া কেন? এখানে তো শুধুই সারথির সাপোর্টার নেই, যাত্রীরও আছে। তারাও তো তাকে হাততালি দিল!
এইভাবে আমিও দাঁড়াতাম। সার দিয়ে দাঁড়ানো প্লেয়ারদের সঙ্গে হাতে হাত দিয়ে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে সরে যাওয়ার সময় সমীরণের মনে হল এদের মধ্যে কেউ একজন সে নিজেও। কোনজন সে? সবাইকেই তার একাকার লাগছে। ওরা এক পা বেরিয়ে এসে সামান্য ঝুঁকে নিজের নাম বলে যাচ্ছে—হোসেনুর আলম, অরূপ মুখার্জি, রামকুমার সাউ, প্রশান্ত বর্মন…সমীরণ গুপ্ত, সমীরণ গুপ্ত, সমীরণ গুপ্ত…।
পরিচয় পর্ব শেষ হওয়ার পর গ্রুপ ফোটো তোলা হল। মঞ্চে ফিরে আসার সময় সমীরণ দর্শকদের উদ্দেশ্যে নমস্কার জানাতেই আবার হাততালি পড়ল।
নিলু গড়গড়ি মঞ্চেই থেকে গেছেন। দুটো টিমের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য মাঠের মধ্যে যেতে অস্বীকার করে বলেছিলেন, ”আমি কে? ওরা কি আমায় চেনে, না জানে? আমার নামও বোধ হয় শোনেনি। আমি যখন খেলেছি তখন ওদের বাবারা খেলা দেখতে যেত। এখন এই বাচ্চচাদের হিরো তো সমীরণরা। ওরা আমার সঙ্গে শেকহ্যান্ড করে মোটেই ধন্য বোধ করবে না। সমীরণ, তুমিই যাও।”
সমীরণ বুঝে গেছল, নিলু গড়গড়ির শরীর যেমন শুকনো কাঠের মতো, কথাগুলো ঠিক তেমনই হওয়ার একমাত্র কারণ, আশাভঙ্গ। পুরনো যুগের এইরকম ফুটবলার সে কিছু দেখেছে। এখনকার ফুটবলারদের এঁরা সহ্য করতে পারেন না, বিশেষত এত পাবলিসিটি, এত টাকা পাওয়াটাকে। ওঁরা খেলার জন্যই খেলেছেন, সেজন্য অনেক কষ্ট স্বীকার করেছেন, অনেক কিছু হারিয়েছেন, পেয়েছেন শুধু প্রশংসা। এখন আর কি তা মনে রেখেছে?
