সমীরণ দরজা খটখটাল, একবার, দু’বার।
”কে—এ—এক—এ! ঘুমজড়ানো গলায় ভেতর থেকে একটা শব্দ ভেসে এল, আর ঠিক সেই সময়…
”সমীরণদা, আমাদের খুব বিপদ।”
কিছু বুঝে ওঠার আগেই সমীরণ দেখল তিনটি যুবক, কুড়ি থেকে পঁচিশের মধ্যে বয়স, গলির মধ্যে ছুটে এল। একজন গোলকিপারের মতো ডাইভ দিয়ে তার পায়ের দুটো গোছ আঁকড়ে ধরল। আর একজন নিলডাউন হয়ে করজোড়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তৃতীয়জন ফাঁকা জায়গা না পেয়ে ছুটে তার পেছনে এসে জড়িয়ে ধরল।
”একী, একী! হচ্ছে কী?” সমীরণ সুটকেস আঁকড়ে ধরে নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করতে লাগল। ছিনতাই করার নানান পদ্ধতির এটাও একটা বলে তার মনে হচ্ছে।
”আমরা ডুবে যাব, বিশ্বাস করুন আমরা গাড্ডায় পড়ে যাব, পাড়ায় মুখ দেখাতে পারব না আর।” নিলডাউন যুবক সকাতরে বলল।
পায়ের গোছ ধরা যুবক প্রায় ডুকরে উঠে বলল, ”আপনি, শুধু আপনিই আজ আমাদের বাঁচাতে পারেন।”
জাপটে ধরা তৃতীয়জন তাদের আশ্বাস দিয়ে বলল, ”পিন্টু কাঁদিস না, ভগবান আমাদের সহায় তাই সমীরণদাকে ঠিক সময়েই পাঠিয়ে দিয়েছেন।”
”হচ্ছে কী? অ্যাঁ, ছাড়ো, ছাড়ো বলছি।” সমীরণ কনুই দিয়ে কোঁতকা দিল জাপটে ধরাকে। টান মেরে ডান পা, বাঁ পা তুলে গোছ ছাড়িয়ে নিল।
”রাগ করবেন না সমীরণদা। আজ আমাদের ফুটবল ফাইনাল, আটদিন আগে তুষার মৈত্র রাজি হয় প্রধান অতিথি হতে। বলেছিল তিনটের সময় বাড়িতে গাড়ি নিয়ে যেতে। আমরা সকাল থেকে রিকশায় মাইক নিয়ে অ্যানাউন্স করে ঘুরেছি, হাতে লিখে পোস্টারও মেরেছি অন্তত গোটা কুড়ি। আজ সকাল দশটায় তুষার ফোন করে বলল আসতে পারবে না, তাকে নাকি দুপুরে বর্ধমানে শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে। সেখানে ওর শালাদের ক্লাবেরও ফুটবল ফাইনাল, ওকে চিফ গেস্ট হতে হবে তাই আমাদের এখানে আসতে পারবে না।”
তুষার মৈত্র শুধু যাত্রীরই সেরা নয়, ভারতেও একসময় ওর মতো স্টপার দু—তিনজন মাত্র ছিল। ভীষণ জনপ্রিয়। এগারো বছর ধরে ক্লাব বদলায়নি। ওর সঙ্গে সমীরণের বহুবার কলকাতার এবং বাইরের মাঠে লড়াই হয়েছে। ফলাফল প্রায় সমান—সমান। তবে গত দু’বছর ধরে সমীরণ লক্ষ করেছে পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি বয়সি তুষার আগের মতো আর ঝটতি ঘুরতে পারছে না, দ্রুতগতির ফরওয়ার্ডরা ওকে পেছনে ফেলে বেরিয়ে যাচ্ছে, স্পট জাম্পে ততটা আর শরীর উঠছে না। বহু জুনিয়র ছেলের কাছে শুনেছে, এখন জার্সি টেনে ধরে বা পেটে ঘুসি মেরে তাদের আটকায়, রেফারিরা ওর বিরুদ্ধে ফাউল দিতে ভয় পায়। যাত্রীর এক কর্তা সুবোধ ধাড়ার গ্রুপের প্লেয়ার বলেই সবাই তুষারকে জানে। সেক্রেটারি পতিতপাবন ওরফে পতু ঘোষের বিরোধী গোষ্ঠী হল ধাড়া গোষ্ঠী।
”তুষারদা আসতে পারবে না তো আমি কী করব? বর্ধমান থেকে তাকে ধরে আনব?” সমীরণ ঝাঁঝালো চোখে তিনজনকে তার বিরক্তি জানিয়ে দিল।
”আপনি রাগ করবেন না সমীরণদা, আজ আমাদের উদ্ধার করে দিন।” বলতে বলতে আবার নিলডাউন।
”আমরা আপনার কেনা গোলাম হয়ে থাকব।” বলার সঙ্গে ডাইভও। কিন্তু সমীরণ সাইড স্টেপ করে পায়ের গোছ সরিয়ে নিতে পেরেছে।
তৃতীয়জন আর জাপটে না ধরে, বিগ্রহের সামনে ভক্ত যেভাবে জোড়হাতে দাঁড়ায় তেমনভাবে শুধু দাঁড়িয়ে রইল।
বাড়ির দরজা খুলে এই সময় বাসব বেরোল, পাজামার দড়ি বাঁধতে বাঁধতে জড়ানো স্বরে বলল, ”কী রে নাকু, ব্যাপার কী? এই অসময়ে? আয়।”
বাসব আবার বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়েছে, তখন নিলডাউন লাফিয়ে উঠে ”বাসুদা, বাসুদা”, বলে তার পিছু নিল।
”মরে যাব আমরা। আপনি বলুন সমীরণদাকে। মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য। দুটো টিমের সঙ্গে ইন্ট্রোডিউস আর প্রাইজ দেওয়া।”
”এ তো আচ্ছা ঝামেলায় পড়লাম রে! দুটো রাত ট্রেনে কাটিয়েছি বাঙ্গালোর থেকে হাওড়া পর্যন্ত। এখনও বাড়ি যাইনি, খাওয়া হয়নি, ভীষণ টায়ার্ড লাগছে, ঘুম পাচ্ছে—সমীরণ হতাশভাবে শুকনো স্বরে তার শারীরিক অবস্থার কথা জানিয়ে করুণ চোখে তাকাল বাসবের দিকে।
”দাদা, শুধু পাঁচটা মিনিট।”
”খেলার আগে ইন্ট্রোডাকশন, খেলার পর প্রাইজ দেওয়া—পাঁচ মিনিটে হয়? চালাকি করার আর লোক পাওনি?” সমীরণ তেরিয়া গলায় বলল।
”তুই এখনও খাসনি!” বাসব ব্যস্ত হয়ে পড়ল, ”এই শোন এখন তোরা ওকে ছেড়ে দে। আগে চান—খাওয়া করে নিক তারপর কথা বলিস।”
”বাসুদা আপনি ওকে…”
”আরে বাবা বলব, বলব। যাবে, যাবে। এখন তোরা ভাগ তো।” বাসব নিশ্চিন্ত স্বরে তিনজনকে আশ্বাস দিল।
সমীরণ দাঁতে দাঁত ঘষে বাল্যবন্ধুর দিকে তাকানো ছাড়া আর কী করবে ভেবে পেল না।
”অ্যাই চল, বাসুদা যখন ভার নিয়েছে আর কিছু ভাবতে হবে না। সমীরণদা আপনি এখন রেস্ট নিন। একটু ঘুমিয়েও নিন। আমরা ঠিক সময়ে এসে তুলে নিয়ে যাব। এই রানা তুই এখানে থাক।” নিলডাউনের হাবভাব, গলার স্বর মুহূর্তে কড়া, রুক্ষ হয়ে উঠল। এই ”থাক”—এর অর্থ বুঝতে সমীরণের অসুবিধা হল না। পাহারায় থাক, যেন না পালায়।
”যাত্রীর প্লেয়ার পেলাম না তো কী হয়েছে, সারথির এত নামী একজনকে তো পেয়েছি! সমীরণদা আমাদের এলাকায় দু’দলের সাপোর্টারই আছে।” জাপটে ধরার ভাবভঙ্গিতে স্বস্তি এবং সাফল্য দুটোই টানটান।
”পিন্টু, মাইক নিয়ে বেরো।”
ওরা চলে যেতেই সমীরণ বলল, ”বাসু, এটা কী হল?”
